চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

সর্বশেষ:

একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

অনলাইন ডেস্ক

২২ মার্চ, ২০২৬ | ৩:১১ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো হত্যাযজ্ঞকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।

 

গত শুক্রবার (২০ মার্চ) মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে গত শুক্রবার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। প্রস্তাবে তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। প্রস্তাবটি বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

 

প্রস্তাবে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

 

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা তখন পূর্ববঙ্গ নামে পরিচিত ছিল।

 

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মূলত পাঞ্জাবি পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়ে গঠিত ছিল। তারা দেশের সম্পদ ও উন্নয়নের সব প্রচেষ্টা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত করেছিলেন।

 

নথিপত্রে প্রমাণিত যে পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রবল বাঙালি-বিদ্বেষ বিদ্যমান ছিল এবং তারা বাঙালিদের নিচু জাতের মানুষ মনে করতেন।

 

১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ইশতেহার নিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

 

তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সরকার গঠনের আলোচনা ব্যর্থ হয়।

 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাবন্দী করে এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত “উগ্র ইসলামপন্থী” দলগুলোর সহায়তায়’ পূর্ব পাকিস্তানে অপারেশন সার্চলাইট নামে দমন অভিযান শুরু করে। অভিযানের আওতায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।

 

এ নৃশংসতায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান থাকলেও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এ সংখ্যা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ পর্যন্ত।

 

দুই লাখের বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এবং সামাজিক গ্লানির কারণে তাদের প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত কখনো জানা যাবে না ও ভুক্তভোগীদের নাম স্মরণ করা হবে না।

 

১৯৭১ সালের ১৩ জুন দ্য সানডে টাইমস-এ ‘জেনোসাইড’ শিরোনামের এক কলামে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, ‘২৫ মার্চ সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী যখন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তাদের অনেকের কাছেই হত্যার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম ছিল।’

 

২৮ মার্চ ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ শিরোনামে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থনে অ–বাঙালি মুসলমানরা পরিকল্পিতভাবে গরিব মানুষের বসতিগুলোতে হামলা চালাচ্ছেন এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছেন।’

 

৬ এপ্রিল কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওই সংঘাতের বিষয়ে মার্কিন সরকারের নীরবতার বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠান। এটি ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত।

 

ঢাকা কনস্যুলেট জেনারেলের ২০ জন মার্কিন কূটনীতিকের সই করা ওই বার্তায় বলা হয়, ‘দুর্ভাগ্যবশত যেখানে জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দ প্রযোজ্য, সেই “আওয়ামী” সংঘাতকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে গণ্য করে আমরা নৈতিকভাবেও হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সাধারণ মার্কিনরা এ নিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন’ এবং ব্লাড নিজেও এ আপত্তির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।

 

৮ এপ্রিল কনসাল জেনারেল ব্লাড আরেকটি টেলিগ্রাম পাঠান। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘হিন্দুদের ওপর যে নগ্ন, পরিকল্পিত ও ব্যাপক দমন–পীড়ন চালানো হচ্ছে, তার ক্ষেত্রে “গণহত্যা” শব্দটি পুরোপুরি প্রযোজ্য…’।

 

শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুতদের সমস্যা তদন্তে গঠিত সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটির উপকমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর এডওয়ার্ড এম কেনেডি ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর কমিটির কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে সুপরিকল্পিত সন্ত্রাস ও গণহত্যা শুরু করেছে, তার চেয়ে স্পষ্ট ও নথিবদ্ধ প্রমাণ আর কিছু হতে পারে না। মার্কিন সরকারের কাছে পাঠানো মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, সাংবাদিকদের অসংখ্য চাক্ষুষ বিবরণ, বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন এবং উপকমিটির কাছে থাকা অতিরিক্ত তথ্যপ্রমাণ পূর্ববঙ্গে চলমান এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সাক্ষ্য দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের জমি ও দোকানপাট লুট এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কোনো জায়গায় তাঁদের শরীরে হলুদ রঙের “এইচ” চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনা ইসলামাবাদের জারি করা সামরিক আইনের অধীন সরকারিভাবে অনুমোদন, আদেশ ও কার্যকর করা হয়েছে।’

 

১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইভেন্টস ইন ইস্ট পাকিস্তান’ শীর্ষক এক আইনি গবেষণায় ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্ট-এর সচিবালয় উল্লেখ করেছে, ‘এমন অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, হিন্দুদের হত্যা এবং ঘরবাড়ি ও গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে শুধু হিন্দু হওয়ার কারণে।’

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন