চট্টগ্রাম শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬

সুয়েজ থেকে হরমুজ: মুদ্রা, স্বর্ণ এবং বিশ্বব্যবস্থার নীরব রূপান্তর

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

২১ মার্চ, ২০২৬ | ৭:৩২ অপরাহ্ণ

বিশ্ব ইতিহাসে কিছু সংকট যুদ্ধ দিয়ে নয়, মুদ্রা দিয়ে শেষ হয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট সেই সত্য প্রমাণ করেছিল। আজ হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা আবারও সেই প্রশ্ন তুলছে—পরবর্তী পতন কোন মুদ্রার?

সুয়েজ সংকটের কেন্দ্রে ছিল সুয়েজ খাল —একটি জলপথ, যা ইউরোপের অর্থনীতির প্রাণ। যখন জামাল আবদেল নাসের এটি জাতীয়করণ করেন, ব্রিটেন ও ফ্রান্স সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজয় ঘটে অর্থনীতির মঞ্চে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ব্রিটেন পিছু হটে। এর মধ্য দিয়েই পাউন্ড স্টার্লিং-এর পতন এবং ইউএস ডলারের উত্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আজকের হরমুজ সংকট একই সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক। এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে অস্থিরতা মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ। তবে সুয়েজের মতো সরাসরি যুদ্ধ নয়—এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ছায়া-সংঘাত, যেখানে অর্থনৈতিক প্রভাবই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

এই প্রেক্ষাপটে ডলারের আধিপত্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বহু দশক ধরে “পেট্রো-ডলার” ব্যবস্থা বিশ্ব বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু এখন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা, চীনের বিকল্প আর্থিক কাঠামো এবং বিভিন্ন দেশের ডলার নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ব্রিকস (BRICS)। এটি আর কেবল একটি অর্থনৈতিক জোট নয়; এটি একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা। সদস্য দেশগুলো ইতোমধ্যেই নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াচ্ছে এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে নতুন পথ খুঁজছে।

এখানেই নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট—স্বর্ণ ও রৌপ্যের দিকে প্রত্যাবর্তন। বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণ কিনছে। কারণ, ডলারসহ ফিয়াট মুদ্রা রাজনৈতিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞায় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কিন্তু স্বর্ণ কোনো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়; এটি এক ধরনের “চূড়ান্ত নিরাপত্তা সম্পদ”। রৌপ্যও ক্রমে সহায়ক বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইতিহাসে দেখা যায়, আস্থার সংকট তৈরি হলেই বিশ্ব স্বর্ণের দিকে ফিরে যায়। সুয়েজের পর ডলার সেই আস্থার স্থান দখল করেছিল। কিন্তু আজকের বিশ্বে কোনো একক বিকল্প নেই। ফলে স্বর্ণ একটি নিরপেক্ষ আশ্রয় হিসেবে পুনরায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

হরমুজ সংকট এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। যদি জ্বালানি বাণিজ্য আংশিকভাবে ডলার থেকে সরে যায়, তবে দেশগুলো তাদের রিজার্ভ বৈচিত্র্য করতে বাধ্য হবে। সেখানে স্বর্ণ ও রৌপ্য শুধু বিনিয়োগ নয়—কৌশলগত নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই বাস্তবতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজের ওপর নির্ভরশীল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এখনো ডলারের প্রাধান্য রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলের অস্থিরতা সরাসরি আমাদের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতায় রিজার্ভ ব্যবস্থায় স্বর্ণের ভূমিকা বাড়ানো এবং বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্যের পথ খোঁজা সময়োপযোগী কৌশল হতে পারে।

ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট। সুয়েজ দেখিয়েছিল, সামরিক শক্তি একা যথেষ্ট নয়। হরমুজ হয়তো দেখাবে, অর্থনৈতিক আধিপত্যও স্থায়ী নয় যদি তা আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে না থাকে।
সুয়েজ ছিল এক যুগের সমাপ্তি—সাম্রাজ্য ও পাউন্ডের পতন।

হরমুজ হতে পারে আরেক যুগের সূচনা—ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের ক্ষয়, বহুমাত্রিক মুদ্রা ব্যবস্থার উত্থান, এবং স্বর্ণের পুনরাগমন।
শেষ পর্যন্ত, প্রশ্নটি আর শুধু কে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করে তা নয়—প্রশ্নটি হলো, সংকটের সময় বিশ্ব কোন মুদ্রা এবং কোন সম্পদকে শেষ ভরসা হিসেবে বেছে নেবে।

পূর্বকোণ/আরআর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট