চট্টগ্রাম বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

আবারও মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের আহ্বান : অনৈক্যের মূল কারণ ও বাস্তবতা

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১৮ মার্চ, ২০২৬ | ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আবহে আবারও শোনা যাচ্ছে ‘মুসলিম বিশ্বের ঐক্য’-এর আহ্বান। গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার সময় যেমন এই আহ্বান জোরালো ছিল, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও একই সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই আহ্বান বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না কেন? কেন মুসলিম বিশ্ব রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, যদিও ধর্মীয়ভাবে এক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আবেগ নয়, বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে।

 

প্রথমত, আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রই প্রধান শক্তি—ধর্ম নয়। ইসলাম ‘উম্মাহ’র ঐক্যের কথা বললেও আজকের মুসলিম দেশগুলো মূলত জাতিরাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হয়। প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে যখন গাজায় রক্ত ঝরে বা ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা বাড়ে, তখন প্রতিক্রিয়া নির্ধারিত হয় ধর্মীয় সংহতির ভিত্তিতে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের হিসাব কষে।

 

দ্বিতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের ভেতরের বিভাজনের সবচেয়ে গভীর শিকড় সুন্নি-শিয়া দ্বন্দ্বে। সপ্তম শতকের রাজনৈতিক বিরোধ থেকে শুরু হওয়া এই বিভাজন আজ বহু দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। সৌদি আরব ও ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইয়েমেন, সিরিয়া কিংবা ইরাকের সংঘাত— সবখানেই এই বিভাজনের প্রতিফলন দেখা যায়। ফলে একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গড়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

তৃতীয়ত, ভূরাজনীতি ধর্মকে ছাপিয়ে গেছে। আজকের বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য, সামরিক জোট এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতা রাষ্ট্রগুলোর আচরণ নির্ধারণ করে। অনেক মুসলিম দেশ নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, আবার কেউ কেউ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবিলায় ইসরায়েলের সঙ্গে নীরব সমঝোতায় যায়। ফলে প্রকাশ্যে ঐক্যের আহ্বান থাকলেও অন্তরালে চলে ভিন্ন হিসাব।

 

চতুর্থত, উপনিবেশিক ইতিহাস মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক কাঠামোকে স্থায়ীভাবে ভেঙে দিয়েছে। অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর কৃত্রিম সীমান্ত টেনে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়, তা স্থানীয় জনগণের সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এর ফলে ‘উম্মাহ’র চেয়ে ‘জাতীয় পরিচয়’ শক্তিশালী হয়ে ওঠে— আমি আগে সৌদি, মিশরীয় বা তুর্কি; পরে মুসলিম।

 

পঞ্চমত, নেতৃত্বের অভাবও বড় কারণ। মুসলিম বিশ্বের এমন কোনো একক নেতৃত্ব নেই, যা সকল দেশকে এক প্ল্যাটফর্মে কার্যকরভাবে আনতে পারে। অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি)-এর মতো সংস্থা থাকলেও এর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা সীমিত। ফলে সম্মেলন ও বিবৃতির মধ্যেই অধিকাংশ উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকে।

 

ষষ্ঠত, বহিরাগত শক্তির প্রভাব পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা চীনের মতো শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তবে এটিও সত্য যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন না থাকলে বাইরের শক্তির পক্ষে এত গভীর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হতো না।

 

সবশেষে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সাধারণ মানুষের অনুভূতি ও রাষ্ট্রের নীতির মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলমানরা গাজা বা ফিলিস্তিন ইস্যুতে আবেগগতভাবে একত্রিত হলেও রাষ্ট্রগুলো সিদ্ধান্ত নেয় কৌশলগত বাস্তবতা বিবেচনায়। এই ব্যবধান থেকেই ‘ঐক্য নেই’-এর ধারণা আরও তীব্র হয়।

 

তাহলে কি ইসলাম তার অনুসারীদের ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ? উত্তরটি সরল নয়, তবে স্পষ্ট— এটি ইসলামের ব্যর্থতা নয়; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। ধর্মীয়ভাবে মুসলমানদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও আধ্যাত্মিক বন্ধন এখনও দৃঢ়। কিন্তু রাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্ষমতার রাজনীতি সেই বন্ধনকে কার্যকর রাজনৈতিক ঐক্যে রূপ দিতে বাধা দিচ্ছে।

 

আজকের মুসলিম বিশ্ব এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে—একদিকে বিশ্বাসের ঐক্য, অন্যদিকে রাজনীতির বিভাজন। যতদিন না এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হবে, ততদিন ‘ঐক্যের আহ্বান’ শোনা যাবে, কিন্তু তার বাস্তব প্রতিফলন সীমিতই থাকবে।

 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ধর্মের নয়, নেতৃত্বের; আদর্শের নয়, প্রয়োগের। মুসলিম বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— কীভাবে বিশ্বাসের ঐক্যকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া যায়। অন্যথায়, ঐক্যের আহ্বান ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি স্লোগান হয়েই থেকে যাবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট