চট্টগ্রাম শনিবার, ০৭ মার্চ, ২০২৬

সর্বশেষ:

নেপালের নির্বাচনে জেন-জি ঝড়, প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন র‍্যাপার বালেন্দ্র শাহ?

মুহাম্মাদ মোরশেদ আলম

৭ মার্চ, ২০২৬ | ৪:০৪ অপরাহ্ণ

হিমালয়কন্যা খ্যাত নেপালের সাধারণ নির্বাচনে জেন-জি ঝড়ে নাটকীয় রাজনৈতিক পালাবদল হতে চলেছে। বড় চমক নিয়ে আসছেন র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দেশটির নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, তার নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পথে রয়েছে। শনিবারের ভোট গণনা শেষে দেখা গেছে, গত বছর ছাত্র আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে রয়েছে আরএসপি। নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে অনেক পিছিয়ে এবং ইউএমএল তৃতীয় স্থানে রয়েছে।বালেন্দ্রর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে নেপালের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউএমএল’র কে পি শর্মা অলিও রয়েছেন। গত বছর জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের প্রবল আন্দোলনের মুখে অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহের আগেই নাও আসতে পারে। পাহাড়ি দেশ নেপালে ভোট গণনা ঐতিহ্যগতভাবে ধীরগতির, এবং দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে ব্যালট আনার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়, ফলে চূড়ান্ত ফল জানতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে। ২০২২ সালের নির্বাচনে চূড়ান্ত ফল পেতে দুই সপ্তাহ লেগেছিল।
কমিশনের মুখপাত্র নারায়ণ প্রসাদ ভট্টরাই বলেছেন, ‘প্রবণতা দেখে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি অনেক জায়গায় এগিয়ে আছে এবং বেশ কয়েকটি আসনে জয়লাভ করেছে।’ যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে প্রবীণ মার্ক্সবাদী নেতা কেপি শর্মা ওলিকে হারিয়ে কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র থেকে নেপালের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত-বিরোধী বালেন্দ্র শাহের উত্থান দেশটির সাম্প্রতিক রাজনীতির অন্যতম নাটকীয় ঘটনা হতে যাচ্ছে। শুক্রবার থেকেই কাঠমান্ডুর রাস্তায় বালেন্দ্র শাহের সমর্থকেরা বিজয় উৎসব শুরু করেছেন। এটি পুরোনো নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তারুণ্যের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শনিবার সকাল পর্যন্ত নির্বাচনের ১৬৫টি আসনের মধ্যে মাত্র ২৪টির ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে আরএসপি ১৮টি এবং নেপালি কংগ্রেস ৫টি আসনে জয়ী হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির দল সিপিএন-ইউএমএল মাত্র ১টি আসনে জয় পেয়েছে। তবে বাকি ৯৯টি আসনে আরএসপি এগিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (পিআর) ১১০টি আসনের ভোট গণনায়ও বালেন্দ্র শাহের দল অর্ধেকের বেশি ভোট নিশ্চিত করেছে। নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র জানান, নির্বাচনের ফল সোমবারের মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। তবে আনুপাতিক ভোটের হিসাব শেষ করে পূর্ণাঙ্গ ফল ঘোষণা করতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। প্রায় ৬৫টি দল নির্বাচনে যোগ দিলেও লড়াই মূলত চারটি দলের মধ্যে। এই দলগুলি হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল (ইউএমএল), আর এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহাল ওরফে প্রচণ্ডর নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি, গগনকুমার থাপার নেপালি কংগ্রেস এবং বালেন্দ্র শাহ–র রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি।
দুর্নীতি থেকে মুক্তি, কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছ রাজনীতির দাবিতে Generation Z বা জেন-জি’র আন্দোলনে সরকার পতনের ৬ মাস পর গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে বড় কোনো সহিংসতা ছাড়া শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ হয়। এতে ৬০ শতাংশ ভোটার তাদের অধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে নির্বাচন কমিশনের উদ্ধৃতি দিয়ে জানায় কাঠমান্ডু পোস্ট।
নেপালের পার্লামেন্টের দুই কক্ষের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে নির্বাচনে অংশ নিতে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার নিবন্ধিত রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ প্রথমবারের ভোটার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মোট ১৬৫টি আসন এফপিটিপি পদ্ধতিতে এবং বাকি ১১০টি আসন পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হয় বৃহস্পতিবার। এফপিটিপি-র জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় করেন ৩৪০৬ জন প্রার্থী। পিআর-এর জন্য ছিলেন ৩১৩৫ জন। নেপালের সংবিধান অনুযায়ী ভোটাররা সংসদের ২৭৫ জন সদস্য নির্বাচন করেন। এই ২৭৫ আসনের মধ্যে ১৬৫ জন নির্বাচিত হবেন ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি ভোট পাবেন, তিনি সেই আসনে বিজয়ী হবেন। বাকি ১১০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (প্রোপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতিতে। এ ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক দল মোট কত শতাংশ ভোট পেয়েছে, তার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হবে।

 

শুক্রবার থেকে উল্লাস শুরু করেছেন বালেন্দ্র শাহর সমর্থকরা।

নেপালের সংবিধান প্রণেতাদের ব্যাখ্যা ছিল, দু’টি পদ্ধতি রাখার উদ্দেশ্য হল, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এবং সমাজে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রাখা। এ ব্যবস্থায় কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষে একক ভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন হয়। ফলে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা বাড়ে। তবে প্রাথমিক গণনায় ইঙ্গিত যে, বলেন্দ্রর দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সরকার গঠন করতে চলেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল. মাত্র চার বছর আগে ২০২২ সালে গঠিত হয় আরএসপি ৷ সে বছর নির্বাচনে বলেন্দ্র শাহর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি মাত্র চতুর্থ স্থানে ছিল। কিন্তু এবার প্রাথমিক ফলাফলেই স্পষ্ট, নেপালের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
কে এই বালেন্দ্র শাহ : কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ জেন জি আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে নজরে আসেন। এক সময় তিনি ছিলেন পেশায় গায়ক ও ব়্যাপ আর্টিস্ট। তার গানের বড় অংশজুড়ে ছিল যুবসমাজের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও হতাশার গল্প। বলেন্দ্র শাহের প্রথম পরিচিতি ব়্যাপার হিসেবে। বারবার নিজেকে আদর্শগতভাবে ভারত-বিরোধী বলে প্রচার করেছেন। হিমালয়ন হোয়াইট হাউস ইন্টারন্যাশনাল কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাশ করেন বালেন্দ্র শাহ। তারপর কর্ণাটকের ভিটিইউ থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করছেন। টেলিভিশন উপস্থাপকও ছিলেন। তারপর তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। গত ডিসেম্বরেই নামী টিভি উপস্থাপক তথা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রবি লামিছানের নেতৃত্বে আরএসপিতে যোগ দেন। ২০২২ সালে নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর মেয়র হিসেবেও নির্বাচিত হন বলেন্দ্র শাহ। ওলি সরকারের পতনের পর বলেন্দ্রকেই অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী করতে চাইছিল জেন-জি বিক্ষোভকারীদের একাংশ। তবে শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হন নেপাল সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কী। তবে অভ্যুত্থানের সময় যাবতীয় অশান্তি সত্ত্বেও নেপালের রাজনীতির অন্যতম ‘স্থায়ী মুখ’ হিসাবে রয়ে গেছেন খড়্গ প্রসাদ শর্মা ওলি। ভারতের সীমান্তবর্তী পূর্ব নেপালের ‘ঝাপা-৫’ আসমটি কেপি শর্মার শক্ত ঘাঁটি। সেই আসনেই এবার কেপি শর্মা ওলিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিপুল ভোটে এগিয়ে রয়েছেন বালেন্দ্র শাহ। এর আগে একমাত্র ২০০৮ সালের নির্বাচন বাদ দিলে ঝাপা-৫ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে এক টানা জয়ী হয়েছেন কে পি শর্মা ওলি।
চীন ও ভারতের মাঝে চিড়েচ্যাপ্টা অবস্থায় থাকা দেশটির ৩ কোটি মানুষ কয়েক দশক ধরেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় জর্জরিত। ১৯৯০ সালে রাজতন্ত্রের পতনের পর থেকে দেশটিতে ৩২ বার সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেশটির কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ক্রমে পঙ্গু হয়ে আসছে, বেকারত্ব তরতর করে বাড়ছে, ব্যাপক দুর্নীতি এসব সমস্যাকে আরো প্রকট করছে। এসব ঘিরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অসন্তোষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিস্ফোরিত হয়; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর দেয়া নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, বাধে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, যার জেরে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে হয়।

লেখক : মুহাম্মাদ মোরশেদ আলম, যুক্তরাষ্ট্রেপ্রবাসী সাংবাদিক

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট