চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৫ মার্চ, ২০২৬

সর্বশেষ:

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পথেই কি হাঁটছেন ট্রাম্প?

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পথেই কি হাঁটছেন ট্রাম্প?

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী

৫ মার্চ, ২০২৬ | ৪:০৬ অপরাহ্ণ

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে প্রভাবিত করেছিলেন- এই ধারণাটি এখন আর নিছক অনুমানভিত্তিক মন্তব্য নয়। ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের মধ্যে যে অভূতপূর্ব নীতিগত সামঞ্জস্য দেখা গেছে, তা একদিকে কৌশলগত পুনর্বিন্যাস ঘটিয়েছে, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছে ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিন্দা ও বিতর্ক।

 

কৌশলগত অভিসরণ : ডোনাল্ড ট্রাম্প’র প্রথম মেয়াদে নেওয়া একাধিক সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি মিল খুঁজে পায়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তেলআবিব থেকে দূতাবাস সরিয়ে নেয়। এই পদক্ষেপটি দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় মার্কিন নীতির বিপরীত ছিল এবং জাতিসংঘের একাধিক প্রস্তাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে পূর্ব জেরুজালেমকে অধিকৃত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব একশন’ (জেসিপিওএ) থেকে সরে দাঁড়ায়- যা ইরান পরমাণু চুক্তি নামে পরিচিত এবং ওবামা প্রশাসনের সময় স্বাক্ষরিত হয়েছিল। নেতানিয়াহু শুরু থেকেই এ চুক্তির কড়া সমালোচক ছিলেন এবং এটিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাহারের ফলে ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়- যা ইসরায়েল স্বাগত জানালেও ইউরোপীয় মিত্র ও চীন সমালোচনা করে।

 

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে ১৯৬৭ সালে দখলকৃত গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দেয়। এই সিদ্ধান্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৪৯৭ নম্বর প্রস্তাবের পরিপন্থী, যেখানে ইসরায়েলের সংযুক্তিকে ‘অবৈধ ও বাতিল’ ঘোষণা করা হয়েছিল। এটিও ছিল নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অন্যতম বিষয়।

 

আব্রাহাম চুক্তি ও আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস : সমর্থকদের মতে, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি কূটনৈতিক সাফল্যও বয়ে আনে। আব্রাহাম একর্ডস-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন-সহ কয়েকটি আরব রাষ্ট্র সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। নেতানিয়াহু এসব চুক্তিকে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে তুলে ধরেন। তবে সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিন ইস্যু- যা দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক শান্তির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন-প্রায় উপেক্ষিতই থেকে যায়। এই চুক্তিগুলো নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করে, কারণ তিনি দেখাতে সক্ষম হন যে ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডগত ছাড় না দিয়েও ইসরায়েল কূটনৈতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারে।

 

নিন্দা ও মেরুকরণ : তবে এসব নীতিগত পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০১৭ সালে জেরুজালেম স্বীকৃতির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১২৮টি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিপক্ষে ভোট দেয়। ফ্রান্স ও জার্মানী-সহ ইউরোপীয় শক্তিগুলো ১৯৬৭-পূর্ব সীমান্তের ভিত্তিতে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, নিঃশর্ত মার্কিন সমর্থন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বসতি অনুমোদনের হার আগের সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়ে সিরিয়া, লেবানন ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রক্সি সংঘাতে রূপ নেয়। সমালোচকদের মতে, কূটনৈতিক বিকল্প খোলা না রেখে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দেয়।

 

রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ : নেতানিয়াহু এককভাবে ট্রাম্পের নীতি নির্ধারণ করেছেন- এমন দাবি সরলীকৃত হবে। ট্রাম্পের ইভানজেলিক্যাল ভোটব্যাংক, রিপাবলিকান দলের আদর্শিক অবস্থান এবং প্রশাসনের বিস্তৃত ইরানবিরোধী কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জ্যারেড কুশনার ও মাইক পম্পেওর মতো উপদেষ্টারাও প্রো-ইসরায়েল পুনর্বিন্যাসের জোরালো সমর্থক ছিলেন। তবু দুই নেতার ব্যক্তিগত রসায়ন উপেক্ষা করা যায় না। ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎকারী প্রথম বিদেশি নেতা ছিলেন নেতানিয়াহু। যৌথ সংবাদ সম্মেলন, নির্বাচনী সমর্থন এবং প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি-সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত এজেন্ডার ধারণা শক্তিশালী হয়।

 

বিস্তৃত প্রভাব : দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। একদিকে ইসরায়েল আরববিশ্বের একটি অংশের সঙ্গে কূটনৈতিক স্বাভাবিকতা অর্জন করেছে; অন্যদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং আঞ্চলিক মেরুকরণ গভীর হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশ, যারা জ্বালানি আমদানি ও প্রবাসী আয়ের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

সবশেষে বলা যায়, ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সমীকরণ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা থেকে সরিয়ে এক স্পষ্ট কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ দিয়েছে। ইতিহাস এটিকে দূরদর্শী পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখবে নাকি পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করবে- তা নির্ভর করবে আগামী দশকে অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিপথের ওপর। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই অংশীদারিত্ব কূটনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে এবং সমসাময়িক ভূরাজনীতিতে মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায়ে পরিণত করেছে।

 

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক পূর্বকোণ

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট