
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়াকে একটি ‘যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত করিডোরে’ পুনর্গঠনের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা ওয়াশিংটন বলছে, তা কোনো অলঙ্কারধর্মী কূটনৈতিক ভাষা নয়। ২০২৬ সালের শুরুতে যা ঘটছে, তা আসলে সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের এক সুসমন্বিত ধারাবাহিকতা—যার লক্ষ্য পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে ইরান হয়ে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এক ভূরাজনৈতিক রেখাকে পুনর্গঠন করা।
সমষ্টিগতভাবে দেখলে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এখন একটি ‘গ্র্যান্ড রিয়ালাইনমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে—যার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ শক্তিকাঠামো ভেঙে দেওয়া, সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা এবং অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ : কেন্দ্রীয় অক্ষ অপসারণ
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং ইসরায়েলের ‘অপারেশন লায়ন’স রোর’-এর যৌথ সূচনা এ অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এসব সমন্বিত হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো ও শীর্ষ নেতৃত্ব লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
আলী খামেনির নির্মূল ইরানের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ কাঠামো’-তে এক গভীর কৌশলগত ভাঙন সৃষ্টি করেছে। বহু দশক ধরে লেবানন থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব শুধু অস্ত্র বা অর্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল না; এটি ছিল কেন্দ্রীভূত ধর্মীয় বৈধতা ও মতাদর্শিক ঐক্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেই মেরুদণ্ড এখন ভেঙে গেছে।
কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই অভিযান কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; বরং আঞ্চলিক সশস্ত্র অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর পৃষ্ঠপোষকতার মূল কাঠামো ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা। ওয়াশিংটনের হিসাব অনুযায়ী, এর মাধ্যমে একটি শূন্যতা তৈরি হবে— যা তারা নিজেদের অনুকূলে পুনর্বিন্যাস করতে চায়।
পাকিস্তান-আফগানিস্তান ফ্রন্ট : একটি গৌণ নিয়ন্ত্রণ বলয়
প্রায় একই সময়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান কর্তৃপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ‘খোলামেলা যুদ্ধে’ রূপ নেয়। কাবুল ও কান্দাহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানের বিমান হামলা এ সংঘাতকে সীমান্ত-সংঘর্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় মাত্রায় নিয়ে যায়। ডুরাল্ড রেখা বরাবর দীর্ঘদিনের অস্থিরতা এখন একটি কৌশলগত মোড় নিয়েছে। পাকিস্তান পূর্বের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে এসে সরাসরি সামরিক অবস্থান গ্রহণ করেছে।
এই পরিস্থিতি বৃহত্তর মার্কিন কৌশলের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে— একটি অস্থিতিশীল শক্তিকে নিজ সীমান্তে ব্যস্ত রাখছে, ইরানের পূর্ব প্রান্তে একটি বাফার-ডাইনামিক সৃষ্টি করছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে বার্তা দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে। অর্থাৎ, পূর্ব ফ্রন্টে অনিশ্চয়তা হ্রাস পাচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন বৃহত্তর করিডোর নির্মাণের প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
গাজা সমঝোতা : শাসন কাঠামোর পুনর্বিন্যাস
যদিও এটি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র নয়, তবুও গাজা-সংক্রান্ত উন্নয়ন একই কৌশলগত কাঠামোর অংশ। ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ দফা শান্তি উদ্যোগের লক্ষ্য হামাসকে প্রান্তিক করে একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক মডেল প্রতিষ্ঠা করা।
তেহরানের সমর্থন দুর্বল হওয়ায় ওয়াশিংটন এই মুহূর্তকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখছে—দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে একটি নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় রূপান্তর করার চেষ্টা করছে। যদি সফল হয়, তবে গাজা প্রক্সি সংঘর্ষের ক্ষেত্র থেকে সরে এসে একটি ব্যবস্থাপিত অর্থনৈতিক অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে— যা বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক কাঠামোর সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
বৈশ্বিক শুল্কনীতি : অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার হাতিয়ার
সামরিক ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক স্তর এই স্থাপত্যকে পূর্ণতা দেয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক কেবল বাণিজ্যিক নীতি নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার। যারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সমন্বয় করবে, তারা পেতে পারে ছাড় বা বিশেষ সুবিধা। আর যারা দূরত্ব বজায় রাখবে, তাদের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশ আরও কঠিন হবে।এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য নীতি হয়ে উঠছে কৌশলগত প্রয়োগের মাধ্যম। সরবরাহ শৃঙ্খলা এখন রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ যেন বাণিজ্যের মাধ্যমে করিডোর নির্মাণ।
করিডোর কাঠামো : সমন্বিত কৌশল
সমগ্র চিত্রটি একত্রে বিশ্লেষণ করলে একটি সুসংহত কৌশল স্পষ্ট হয় যে- ইরানের ওপর সামরিক চাপ একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে দুর্বল করছে। পাকিস্তান-আফগানিস্তান ফ্রন্ট পূর্ব প্রান্তকে নিয়ন্ত্রিত রাখছে। গাজায় রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব নিশ্চিত করছে। শুল্কনীতি অর্থনৈতিক আনুগত্য আরোপ করছে। আলাদাভাবে দেখলে ঘটনাগুলো প্রতিক্রিয়াশীল মনে হতে পারে। কিন্তু একত্রে এগুলো একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ—যার লক্ষ্য পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে ইরান হয়ে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-প্রভাবিত এক ধারাবাহিক ভূরাজনৈতিক অক্ষ নির্মাণ।
এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি বলপ্রয়োগে প্রতিষ্ঠিত এক ভঙ্গুর ভারসাম্য সৃষ্টি করবে— তা সময়ই বলবে। ইতিহাস বলে, জোরপূর্বক সমন্বয়ে নির্মিত করিডোরের বিরুদ্ধে সমান শক্তির প্রতিক্রিয়াও জন্ম নিতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে- ২০২৬ শুধু সংঘাতের বছর নয়; এটি ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের বছর— যেখানে সামরিক শক্তি, কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং অর্থনৈতিক চাপ একীভূত হয়ে এক নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছে।