চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সর্বশেষ:

মতামত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষ : হারারির সতর্কবার্তা ও আমাদের ভবিষ্যৎ

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। মোবাইল ফোনের ভয়েস এসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এমনকি সংবাদ লেখাতেও এআই সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রযাত্রা আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরছে-এআই কী মানুষের সহায়ক হবে, নাকি একসময় মানুষের সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলবে?

 

বিশ্বখ্যাত চিন্তাবিদ ইউভাল নোয়া হারারি এই প্রশ্নটিকেই বারবার সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, মানব ইতিহাসে এই প্রথম এমন একটি শক্তি জন্ম নিচ্ছে, যা নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং ভবিষ্যতে মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হতে পারে।

 

হারারি বলেন, আগে প্রযুক্তি ছিল মানুষের হাতিয়ার। কিন্তু এআই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে এটি নিজেই ‘কর্তৃত্বশীল’ হয়ে উঠতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ইতোমধ্যে ঠিক করে দিচ্ছে আমরা কী দেখব, কী পড়ব এবং অনেক ক্ষেত্রে কী বিশ্বাস করব। আমরা ভাবি সিদ্ধান্তটি আমাদের, কিন্তু পর্দার আড়ালে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে একটি অ্যালগরিদম।

 

এখানেই হারারির মূল সতর্কতা। যদি মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ এআইয়ের সঙ্গে সমান্তরালে বিকশিত না হয়, তবে প্রযুক্তি অল্প কিছু করপোরেশন বা রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার উৎসে পরিণত হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে ‘ডেটা সরবরাহকারী’ হয়ে পড়বে মাত্র।

 

তবে হারারি পুরোপুরি হতাশাবাদী নন। তিনি মনে করেন, এআই মানুষের শত্রু নয়-যদি মানুষই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে। এআই চিকিৎসায় রোগ নির্ণয় সহজ করতে পারে, শিক্ষায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। প্রশ্ন হলো-এই ক্ষমতা কার স্বার্থে ব্যবহৃত হবে?

 

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি এআইকে শুধু প্রযুক্তি হিসেবে দেখি, তাহলে পিছিয়ে পড়ব। কিন্তু যদি এটিকে নীতিনির্ধারণ, শিক্ষা সংস্কার ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করি, তাহলে এআই আমাদের জন্য সুযোগও তৈরি করতে পারে।

 

হারারির ভাষায়, ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ‘এআই কতটা বুদ্ধিমান হবে’ তার ওপর নয়, বরং ‘মানুষ কতটা দায়িত্বশীল থাকবে’ তার ওপর। তাই এআই যুগে সবচেয়ে জরুরি বিনিয়োগ হলো-মানুষের বিবেক, সমালোচনামূলক চিন্তা ও নৈতিক শিক্ষা।

 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, প্রশ্নটি মানুষের। আমরা কি এআইকে আমাদের সহযাত্রী বানাব নাকি নিঃশব্দে আমাদের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে দেব, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এখনই।

শেয়ার করুন