চট্টগ্রাম রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

মতামত

ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিকল্পের পথে হাঁটছে পশ্চিমা বিশ্ব

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বৈশ্বিক কূটনীতিতে তিনটি সফর বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে— ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইনের ভারত সফর, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কানের চীন সফর এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ারের বেইজিং সফর। আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে রুটিন দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ মনে হলেও, গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়— এগুলো একই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। একসঙ্গে এসব সফর একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী বার্তা দিচ্ছে: পশ্চিমা বিশ্ব এখন একক মেরুকেন্দ্রিক কৌশল থেকে সরে এসে ভারসাম্য ও বিকল্পের পথে হাঁটছে।

 

প্রথমেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভারত সফরের তাৎপর্য বিবেচনা করা জরুরি। ইউরোপ বর্তমানে দ্বিমুখী চাপে রয়েছে— একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখা, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামাল দেওয়া। ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ইউরোপকে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, অতিনির্ভরতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ইউরোপের কাছে একটি কৌশলগত ‘তৃতীয় স্তম্ভ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে— চীনের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র, দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা বাজার এবং এমন একটি শক্তি, যা এখনো কোনো একক পরাশক্তির ছায়ায় সম্পূর্ণভাবে ঢুকে পড়েনি। ইইউর বার্তা তাই দ্ব্যর্থহীন: চীন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্নতা নয়, আবার চীনের ওপর অতিনির্ভরতাও নয়।

 

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো কানাডার প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের একটি হওয়া সত্ত্বেও এই সফর প্রমাণ করে, আধুনিক কূটনীতিতে মিত্রতা আর অন্ধ আনুগত্যের সমার্থক নয়। ডাভোসে মার্ক কার্নির বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন এখানেই স্পষ্ট— মধ্যম শক্তির দেশগুলো যদি নিজেদের স্বার্থে আলাদা কৌশল তৈরি না করে, তবে তারা পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতায় পিষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। চীনের সঙ্গে সংলাপের অর্থ নীতি বিসর্জন নয়; বরং নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্পেস সংরক্ষণ করা।

 

তৃতীয়ত, যুক্তরাজ্যের চীন সফর ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনের বাস্তব অবস্থানকে নগ্নভাবে তুলে ধরে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার আর আগের মতো সহজ নয়, আবার যুক্তরাষ্ট্র একাই সব অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে পারবে— এমন বিশ্বাসও এখন দুর্বল। ফলে লন্ডনের কৌশল হলো আদর্শগত সতর্কতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক বাস্তববাদে এগোনো। যুক্তরাজ্য বুঝেছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার বিলাসিতা তাদের নেই।

শেয়ার করুন