চট্টগ্রাম রবিবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

মার্ক টালি। ছবি: সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই

অনলাইন ডেস্ক

২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ | ৭:২৪ অপরাহ্ণ

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু বিবিসির বিখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই। রবিবার (২৫ জানুয়ারি) ভারতের নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মার্ক টালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে মার্ক টালি বিবিসির দিল্লি ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা এবং নৃশংসতার খবর তিনি সারা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তখন আকাশবাণী ও বিবিসির খবর ছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রধান ভরসা। বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’য় ভূষিত করে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে বিবিসির শ্রোতাদের কাছে যিনি ছিলেন ‘ভারতের কণ্ঠস্বর’। বিবিসির হয়ে কয়েক দশক ধরে ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংবাদ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরেছেন তিনি।

বিবিসি নিউজ ও কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের অন্তর্বর্তীকালীন সিইও জনাথন মুনরো এক বিবৃতিতে বলেন, স্যার মার্ক টালির প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তিনি ভারতকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করেছিলেন এবং দেশটির প্রাণচাঞ্চল্য ও বৈচিত্র্যকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন।

১৯৩৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্ম নেওয়া মার্ক টালি জীবনের তিন-চতুর্থাংশ সময়ই কাটিয়েছেন ভারতে। যদিও ৯ বছর বয়সে শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাজ্যে যান এবং কেমব্রিজে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়াশোনা করেন। যাজক হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১৯৬৫ সালে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে ভারতের দিল্লিতে বিবিসির কার্যালয়ে যোগ দেন তিনি। দ্রুতই তিনি একজন দক্ষ প্রতিবেদক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। হিন্দিতে অনর্গল কথা বলতে পারার বিরল দক্ষতার কারণে ভারতীয়দের কাছে তিনি ‘টালি সাহেব’ নামে পরিচিত ও সমাদৃত ছিলেন।

১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করলে মার্ক টালিকে মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে ভারত থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে ১৮ মাস পর তিনি আবারও ফিরে আসেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি, স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান এবং শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের মতো বড় বড় ঘটনাগুলো কাভার করেছেন।

১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় চরম হিন্দুত্ববাদীদের তোপের মুখে পড়েছিলেন তিনি। সে সময় উগ্র জনতা তাকে একটি ঘরে আটকে রেখেছিল এবং ‘মার্ক টালির মৃত্যু চাই’ বলে স্লোগান দিয়েছিল। পরে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান। এই ঘটনাকে তিনি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য বড় আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি মার্ক টালি ভারতের দারিদ্র্য ও ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তর কাজ করেছেন। বিবিসির করপোরেট সংস্কৃতির সমালোচনা করে ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটি থেকে পদত্যাগ করেন, যদিও পরে রেডিও ফোর-এর মাধ্যমে আবারও বিবিসির সঙ্গে যুক্ত হন।

সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে। ২০০২ সালে ব্রিটেন তাকে দেয় ‘নাইটহুড’ উপাধি। তিনি ভারতের ‘ওভারসিজ সিটিজেনশিপ’ গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজেকে ভারত ও ব্রিটেন উভয় দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। শেষ বয়সে তিনি দিল্লিতে তার সঙ্গী গিলিয়ান রাইটের সঙ্গে সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং ভারতের ওপর অসংখ্য বই লিখেছেন। সূত্র: বংলা ট্রিবিউন

পূর্বকোণ/পারভেজ

শেয়ার করুন