চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৮ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভেনেজুয়েলার তেল: গণতন্ত্রের মুখোশে ভূ-রাজনীতির নগ্ন সত্য

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৭ জানুয়ারি, ২০২৬ | ২:৫৩ অপরাহ্ণ

বিশ্ব রাজনীতিতে তেল কখনোই কেবল জ্বালানি নয়; এটি ক্ষমতা, প্রভাব ও আধিপত্যের সবচেয়ে কার্যকর প্রতীক। ভেনেজুয়েলা—বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুদের অধিকারী দেশ—আজ এই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ। সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণধর্মী ভিডিও ভেনেজুয়েলার তেলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ নতুন করে সামনে এনেছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই, নাকি শক্তির পুনর্বিন্যাসের সুপরিকল্পিত কৌশল?

 

ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক বিপর্যয় কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি PDVSA–এর কাঠামোগত অবক্ষয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নতা দেশটিকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। অথচ এই বিপর্যয়ের কেন্দ্রে রয়েছে সেই সম্পদই— তেল। যা একসময় ভেনেজুয়েলাকে লাতিন আমেরিকার অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ তত্ত্ব দিয়ে এই সংকট ব্যাখ্যা করা সহজ, কিন্তু তা পুরো সত্য নয়।

 

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাষ্যে ভেনেজুয়েলা মানেই স্বৈরশাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রহীনতা। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। একই ধরনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বহু রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র, তবে শর্ত একটাই- ‘তারা ওয়াশিংটনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।’ ফলে ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আদর্শের নয়; প্রশ্নটি নিয়ন্ত্রণের।

 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন উৎসের সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর চাপ এবং চীনের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি প্রভাব—এই তিন বাস্তবতা মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল ওয়াশিংটনের কাছে একটি অমূল্য কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। তাই নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা কঠোর করার প্রশ্নে ‘নৈতিকতার চেয়ে বাস্তব রাজনীতি’ই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

 

নিষেধাজ্ঞাকে প্রায়ই ‘শান্তিপূর্ণ চাপ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে এর প্রধান ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির সংকটে জর্জরিত জনগণের দুর্ভোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে খুব সহজেই ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ হয়ে যায়। ভিডিওটি স্পষ্ট করে দেখায়, নিষেধাজ্ঞা সরকার পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না; বরং রাষ্ট্রকে ভঙ্গুর করে তোলে এবং বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপকে সহজ করে।

 

ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এর প্রভাব শুধু কারাকাসে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ওপেক (OPEC)-এর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বদলাবে, বৈশ্বিক তেলের দামে চাপ সৃষ্টি হবে এবং লাতিন আমেরিকায় চীন ও রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এটি একক কোনো দেশের সংকট নয়; এটি বিশ্বশক্তির দাবার বোর্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ চাল।

 

ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। প্রাকৃতিক সম্পদ আশীর্বাদও হতে পারে, আবার অভিশাপও— যদি রাষ্ট্র তার ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশসহ যেসব দেশ জ্বালানি, সমুদ্রসম্পদ বা কৌশলগত অবস্থানের অধিকারী, তাদের জন্য এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

 

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়— বিশ্ব রাজনীতিতে কি নৈতিকতার সত্যিই কোনো স্থান আছে? ভেনেজুয়েলার তেল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখনো শক্তির ভাষায় পরিচালিত। গণতন্ত্র সেখানে প্রায়ই একটি মুখোশমাত্র, আর তেল—চূড়ান্ত বাস্তবতা।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট