চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

এআই এর চেয়ে বেশি কিছু

সিন্থেটিক বায়োলজি মানব-প্রকৃতি পরিবর্তনের ক্ষমতা রাখে!

ওয়াহিদ জামান

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ

আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এখনকার অন্যতম আলোচ্য বিষয়। এবং এ বিষয়ে এ পত্রিকায় আমি বেশ ক’বার লিখেছি। সে যাই হোক, ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রæত অগ্রগতির পাশাপাশি প্রায় একইহারে অগ্রগতি হয়েছে ‘হিউম্যান জেনেটিক্স’ (মানব জিনতত্ত¡) বিষয়ক গবেষণারও। এক্ষেত্রে আমাদের কেবল সতর্ক দৃষ্টি রাখলেই চলবেনা, এক্ষেত্রে কি ঘটছে তা বুঝতে হবে এবং এ বিষয়ে নিজেকে বরাবর ‘আপ টু ডেট’ রাখতে হবে। কেননা এতে শঙ্কিত হবার মতো অনেক কিছুই রয়েছে।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন সম্পর্কে আমরা প্রায় সবাই কমবেশি অবগত আছি। ভ্যাকসিনের প্রয়োজনীয়তা বা ফলপ্রসুতা বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য যা-ই থাকুক না কেন, এটা অনস্বীকার্য যে, ২০২০ সালে রেকর্ড সময়ে ফাইজার (Pfizer) এবং মডার্না এমআরএনএ (Moderna mRNA) ভ্যাকসিনের আবিষ্কার এবং এর ব্যাপক উৎপাদন চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে নজিরবিহীন ছিল। এক্ষেত্রে যা কম জানা যায় তা হল- এই ভ্যাকসিনগুলি বহু বছরের মৌলিক গবেষণার ফলাফল ছিল এবং কোভিডের স্মৃতি ¤øান হয়ে আসার সাথে সাথে অন্যান্য ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণা অনেক বেগবান হয়েছে। এসব গবেষণার ফলাফল যেমন আমাদের জন্য অনেক সুখবর দিচ্ছে তেমনি বেড়ে গেছে এসবের অপব্যবহারের ঝুঁকির সম্ভাবনাও।

ডিপ মাইন্ড (এখন গুগলের মালিকানাধীন) এবং ইনফ্লেকশন এআই-এর সহ প্রতিষ্ঠাতা মুস্তাফা সুলেমানের ভাষায় একে আমি ‘সিন্থেটিক বায়োলজি’ হিসাবে উল্লেখ করছি। এজন্যে আমি সুলেমানের বই ‘দ্য কামিং ওয়েভ’ পড়তে বলবো সবাইকে। সুলেমান এতে ‘আজ এবং আগামীর প্রযুক্তির প্রভাব’ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।

জেনারেটিভ এআই (যেমন চ্যাট জিপিটি) ডিজিটাইজিং যুক্তির (বুদ্ধিমত্তা) প্রতিনিধিত্ব করে। গত এক দশকে জিন সম্পাদনার পুরো ক্ষেত্রটি একটি বিশাল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। সহজ কথায়, জেনেটিক কোড হল আমাদের মানব কোষে বিদ্যমান অণুতে এনকোড করা নির্দেশাবলীর একটি সেট। আমরা যে মানুষ এটি তার জৈবিক বিবরণ। এই জেনেটিক কোডের একটি মূল উপাদান রয়েছে যার নাম ডিএনএ এবং অন্যটি আরএনএ। এই কোড ম্যাপ করার ক্ষমতা অর্জন সা¤প্রতিক ঘটনা। আমাদের মানব জেনেটিক কোডের একটি সম্পূর্ণ ম্যাপিং সম্পন্ন হয়েছে ২০০৩-এ। এবং এটা করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। তারপর থেকে এ বিষয়ে মৌলিক গবেষণাটি বেশ বেগবান হয়। তারই ফলশ্রæতিতে আজ কেউ চাইলেই মাত্র ১ হাজার ডলারের কম খরচে একজনের ব্যক্তিগত ডিএনএর একটি মানচিত্র তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ, আমাদের ব্যক্তিগত জেনেটিক কোড ম্যাপ করার মূল্য গত ২০ বছরে এক মিলিয়ন-গুণ কমে গেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির এই হার মুরস ল’-কেও হার মানিয়েছে। এই ল’ অনুযায়ী প্রতি বছর কম্পিউটার চিপের গতি দ্বিগুণ হওয়ার কথা।

মানুষের জেনেটিক কোড পড়ার আমাদের ক্ষমতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই জেনেটিক কোডটি সম্পাদনা (পরিবর্তন) করার ক্ষমতাটি আমরা নতুন অর্জন করেছি। সিআরআইএসপিআর (CRISPR) নামক কৌশলগুলির একটি সেট ব্যবহার করে (যার জন্য ড. জেনিফার ডুডনা এবং ইমানুয়েল চার্পেন্টিয়ার ২০২০ সালে নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন) আমরা এখন জেনেটিক কোড সম্পাদনা করতে পারি। সহজ কথায়, এই ক্ষমতাই বিজ্ঞানীদের দ্রæত এমআরএনএ ভ্যাকসিন তৈরি করতে দেয় যা ২০২০ এবং ২০২১ সালের কোভিড সংকটের সময় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। জিন সম্পাদনা এখন যেকোনও জায়গায় মাত্র কয়েক হাজার ডলারে সম্পন্নযোগ্য।

জিন সম্পাদনা (‘জীবনের নির্দেশাবলী’ পরিবর্তন) করার এই ক্ষমতা বিপুল সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি প্রচুর ঝুঁকিও তৈরি করেছে। যে কোনো গুরুতর রোগের কথা চিন্তা করুন – পারকিনসনস, ডায়াবেটিস, আলঝেইমারস, সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা এমনকি ক্যান্সারের মতো রোগ আামাদের জেনেটিক কোড সম্পাদনা করে ঠিক করা যেতে পারে। তাছাড়া শীঘ্রই জিন সম্পাদনা করার মাধ্যমে নবজাতক শিশুর উত্তরাধিকার রোগ (পিতামাতার থেকে রোগের সম্ভাবনা), এমনকি প্রাণ-সংহারি রোগগুলি মাতৃগর্ভেই সনাক্ত, এমনকি হবার সম্ভাবনা দূর করা যেতে পারে।

এই সমস্তই এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
আরেকটি বাপার- প্রজনন কর্মসূচী হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা একটি অনুশীলন। ধান এবং গম বা গরুর নতুন ধরণ সম্পর্কে চিন্তা করুন যা আরও ফসল, মাংস এবং দুধ সরবরাহ করতে পারে। এই প্রোগ্রামগুলি মূলত ‘ম্যানুয়াল’ জিন ম্যানিপুলেশন ছিল। কিন্তু নতুন জিন সম্পাদনার মাধ্যমে নাটকীয়ভাবে প্রজনন কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব হচ্ছে। এর থেকে অনেক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে: বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা হ্রাস করা যেতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ফসলের স্থিতিস্থাপকতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এই সবই এখন কেবল সময়ের ব্যাপার-হয়তো মাত্র ক’টি বছর। তবে জিন সম্পাদনা এবং ম্যানিপুলেশন থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনার বিশালতার পাশাপাশি ঝুঁকিও কম নয়।

উদাহরণস্বরূপ, একটি নৈতিক প্রশ্ন, আমরা কি পিতামাতাকে তাদের সন্তানদের জেনেটিক বৈশিষ্ট্যগুলি (উদাহরণস্বরূপ, বুদ্ধিমত্তা, চুল এবং চোখের রঙ, উচ্চতা) বেছে নেওয়ার অনুমতি দেব? এ প্রযুক্তি এখন কেবলি সময়ের ব্যাপার মাত্র।

যাইহোক, আমি বিশ্বাস করি না যে, মানব জেনেটিক সম্পাদনা এবং এর বিস্তৃত ব্যবহারের অনুমতি সমাজের দেওয়া উচিত। অন্তত যতক্ষণ না আমরা এই ক্ষমতা এবং এর প্রভাব সম্বন্ধে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করতে পারছি। আমাদের এ বিষয়ে নীতি-নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রশ্নে বিস্তৃত পরিসরে বিতর্ক (আলোচনা) করে খুঁটিনাটি সন্দেহ দূর করে নিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, এমনকি ‘উপকারী’ চিকিৎসার ক্ষেত্রেও আমরা কীভাবে নিশ্চিত হব যে, দরিদ্রদের জন্যও এই ‘অগ্রগতি’ সহজলভ্য হবে?
কীভাবেই-বা আমরা নিশ্চিত করব যে, এই শক্তিশালী প্রযুক্তি ‘প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে’ ধনী-শক্তিশালী এবং আমজনতার মধ্যে ব্যবধান বাড়াবে না? কে নেবে ‘কোনটি হবে সঠিক’-তার সিদ্ধান্ত? আমদের কি তবে শুধুমাত্র ‘সোম্যাটিক জিন এডিটিং’ (যেটার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম প্রভাবিত হবেনা)- এর অনুমতি দেওয়া উচিত? নাকি ‘জার্মলাইন জিন এডিটিং’ (যেটা ভবিষ্যত প্রজন্মের মাধ্যমে বংশবিস্তার করার জন্য জেনেটিক কাঠামোর পরিবর্তনের অনুমতি দেয়)-এর?

এআই-গবেষণা পরিস্থিতি এখন যেভাবে সফলতার মুখ দেখে চলেছে তাতে শিগগিরই ‘অতি-মানবীয় বুদ্ধিমত্তা’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা (এটিকে এজিআই বা কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তাও বলা হয়) উড়িয়ে দেবার নয়। আমাদের এহেন সম্ভাবনাগুলিকে উপেক্ষা করা যেমন উচিত নয়, তেমনি আমাদের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলায় আরও বেশি সময় এবং মনোযোগ দেবার প্রয়োজন।

সিন্থেটিক বায়োলজির ক্ষেত্রে, আমার মনে হয়, কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা থেকেই আসতে চলেছে সবচেয়ে বড় বিপদের ঝুঁকিটা। যেহেতু বৃহদাকারে এআই-গবেষণাকাজে প্রয়োজন প্রভূত অর্থের, তাই এর বাস্তবায়নে মাইক্রোসফট, গুগল, ওপেনএআই, অ্যাপল-এর মতো সংস্থা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা চীনের মতো দেশগুলোর পৃষ্টপোষণা প্রয়োজন।

কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে যথাযথ আইনী ব্যবস্থার অভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে হয়তো মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করেই কেউ ‘জৈবিক অস্ত্র’ তৈরি করে ফেলবে। অথবা সঠিক তত্ত¡াবধানের অভাবে কোনোও ধ্বংসাত্মক রোগ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে। এমন জোড় সম্ভাবনা কিন্তু রয়েই গেছে।

উপসংহারে, আমাদের সকলকে তাই সিন্থেটিক বায়োলজি এবং এর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। উদ্ভাবনের গতি এবং এর সাথে জড়িত ঝুঁকি ও পুরস্কারের ভারসাম্যের সাথে কীভাবে দায়িত্বের সাথে মোকাবিলা করা যায় সে সম্পর্কে কোন সহজ উত্তর নেই। প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং এর সমস্যা বুঝতে আমাদের ‘কমনসেন্স’-এর উপর আস্থা রাখতে হবে। আমাদের সকলের জন্য প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে এটিই।

[লেখক : সিইও, ডব্লিউএন্ডএ কনসাল্টিং : প্রাক্তন প্রধান কৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারশে (Hershey), ফার্মার ব্রাদার্স’র পরিচালনা পরিষদের সদস্য। এছাড়াও ‘ফরচুন ফাইভ হানড্রেড’ কোম্পানির বেশ ক’টি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে উদ্যোক্তাদের পরামর্শ আর সিনিয়র একজিকিউটিভদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।]

শেয়ার করুন