চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত থেকে ইসরায়েলের রেহাই নেই

মূল : জেফ্রি শ্যাক্স

২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ৪:৫৩ অপরাহ্ণ

আন্তর্জাতিক আইনের শাসন সম্পর্কে কটূক্তি করাই যায়। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস (আইসিজে) ঘোষণা করেছে যে, ইসরায়েল সম্ভবতঃ ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যাই চালাচ্ছে। প্রায় সাথে সাথেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে- ‘আমরা বিশ্বাস করি গণহত্যার অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং সম্ভবত আদালত এই বিষয়ে যথেষ্ট অনুসন্ধান করেনি।’ ইসরায়েলি নেতারাও বলেছেন, মামলাটি ‘আক্রোশজনিত’ এবং ‘ইহুদি-বিদ্বেষী’ বলে অভিহিত করেছিল। তবুও আইসিজে’র রায়ে ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকি বেড়ে গেল।
পরবর্তী ক’বছর দেশটি আইসিজে’র মনিটরিংয়ের আওতায় থাকবে। এ অবস্থায় দেশটি যদি গণহত্যা কনভেনশন প্রত্যাখ্যান করে তবে নিশ্চিতভাবেই সেটা জাতিসংঘে তার মর্যাদাকে খাটো করবে। এটাও সত্য যে, আইসিজে’র এ অস্থায়ী রায়ে গাজায় ইসরায়েলি অভিযান (ইতোমধ্যে ২৭ হাজার পেরিয়েছে মৃতের সংখ্যা, যার ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু) বন্ধ হবে না। এই রায় ইসরায়েলিদের ফিলিস্তিনি-হত্যায় আমেরিকার জড়িত থাকার অবসান ঘটাবে না। মার্কিন যুদ্ধাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা না পেলে ইসরায়েল গাজায় একদিনও যুদ্ধ করতে পারত না।
তবুও এই রায় ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘ক্ষণ’ গণনা শুরু হয়েছে। আইসিজে-এর চূড়ান্ত রায়ে দেশটি যদি ‘গণহত্যাকারী’ হিসাবে ঘোষিত হয়, তাহলে দেশটি একটি ‘অবৈধ’ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। বিশেষ করে তরুণ আমেরিকানরা ইসরায়েলের জন্য মার্কিন সমর্থনের রাশ অবশ্যি টেনে ধরবে। ইসরায়েল সম্পূর্ণ একা, বিশ্ব-নিন্দিত হয়ে পড়বে।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সরকারের অধিকাংশই ইতোমধ্যে দেশটির আচরণকে ঘৃণার চোখে দেখছে। বেশিরভাগ দেশই মনে করে দেশটি ৫৭ বছর ধরে (১৯৬৭ সালের যুদ্ধ থেকে) ফিলিস্তিনের অঞ্চলগুলি দখল করে রেখেছে, বেআইনি এবং নির্লজ্জভাবে বসতি স্থাপন করে চলেছে। অধিকৃত অঞ্চলে আজ ৭ লক্ষাধিক ইসরায়েলির বাস। এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ক’ডজন ঘৃণাসূচক প্রস্তাবনা জাতিসংঘের নিরাপত্তা এবং সাধারণ পরিষদে ‘ভেটো’র মাধ্যমে ব্যর্থ হয়েছে।
জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রই ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি ইসরায়েলি নেতাদের ঘৃণার অভিব্যক্তির কথা জানা। আজকের ইসরায়েলি সরকারের ফিলিস্তিন দখল করা এবং ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে বসবাসকারী ৭০ লক্ষাধিক মুসলমান এবং খ্রিস্টানদের উপর শাসন জারি রাখাকে
দক্ষিণ আফ্রিকা তার দেশের একসময়কার বর্ণবাদী শাসন-ব্যবস্থাকে মনে করিয়ে দিয়েছে। তাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তারা আইসিজেতে মামলাটি করেছে।
ইসরায়েল এখনও পর্যন্ত তার পারমাণবিক সক্ষমতা আর জাতিসংঘের নিরাপত্তা ও সাধারণ পরিষদে মার্কিন সমর্থন সহ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, আর্থিক এবং জনসমর্থনের কারণে ‘বিশ্বমত’কে অগ্রাহ্য করে চলেছে। তারপর, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল বিশ্বাস করে যে, ‘আরব দেশগুলিকে আমেরিকান অর্থ এবং অস্ত্র ব্যবস্থার প্রস্তাব তাদের ফিলিস্তিনি জনগণের দিকে মুখ ফিরিয়ে নিতে প্ররোচিত করবে।’ দেশ দু’টো বিশ্বাস করে- সামরিক শক্তি এবং অর্থ সত্যিই কথা বলে।
হ্যাঁ, ইসরায়েলও ফিলিস্তিনিদের ভয় করে। আসলে না করে পারে না। এই ভয়ের জন্ম- নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত এবং বাস্তুচ্যুতদের অদম্য এবং অবিরাম বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা দেখে। অথচ ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ও শান্তি স্থাপনের মাধ্যমে, ইসরায়েল সেই ঘৃণা ও অপমান দূর করতে পারে সহজেই। ফিলিস্তিনিদের ‘বঞ্চনা’ই তাদের হামাসের প্রতি সমর্থন জোগাতে বাধ্য করে।
ইসরায়েলিদের বোঝা উচিত যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলকে বাঁচাবে না বা বাঁচাতে পারবে না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। দক্ষিণ ভিয়েতনাম, ১৯৫৩ সালে ইউএস-ইউকে’র মদদে অভ্যুত্থানের পর ইরান; ২০০১ সালের পর আফগানিস্তান; ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার পর ইরাক; ২০১১ সালে বাশার আল-আসাদকে উৎখাত-চেষ্টা পর সিরিয়া; ২০১১ সালে ন্যাটো মোয়াম্মার গাদ্দাফিকে উৎখাত করার পর লিবিয়া; বা ২০১৪ সালের পর থেকে ইউক্রেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবলি তার স্বার্থরক্ষার কাজ টুকুই করেছে।
শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সাথেও তা করবে আমেরিকা যদি দেশটি (ইসরায়েল) একটি ‘অবৈধ’ এবং আইন বহির্ভূত রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আর্থিক বিশালতার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মার্কিন পাবলিক ঋণ ইতিমধ্যে জিডিপির ১২২.৯ শতাংশ এবং তা দ্রæত বাড়ছে। কিভাবে মার্কিন বাজেটকে স্থিতিশীল করা যায় সে বিষয়ে ওয়াশিংটন, ডি.সি.-তে কোনো ঐকমত্য নেই, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট বিদেশি দেশগুলির জন্য বড় সমর্থন চুক্তির অংশ হবে না। রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের তীব্র লবিং সত্তে¡ও ইউক্রেনের জন্য মার্কিন অর্থায়নের কাট-অফ একটি স্পষ্ট ঘটনা। এমনকি উন্নত মার্কিন অস্ত্র ব্যবস্থার অ্যাক্সেসও আরব দেশগুলিকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কারণ ত্যাগ করতে রাজি করবে না। এ ক্ষেত্রে, রাশিয়ান, ইরানি, উত্তর কোরিয়ান, চীনা এবং অন্যান্য উন্নত অস্ত্র সিস্টেমগুলি ভবিষ্যতে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক অফারে থাকবে।
এই মুহূর্তে, ইসরায়েলি জনসাধারণ গাজায় ইসরায়েলের বর্বরতা এবং হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহের সাথে সমর্থন করছে। জনসাধারণ অপ্রতিরোধ্য ভয়, ধর্মীয় উগ্রতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার সংমিশ্রণে আঁকড়ে আছে। ইসরায়েলিরা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করে যে আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুত। তারা আরব দেশগুলিতে ভ্রমণ করে না এবং সেসব প্রতিবেশী সমাজের মনোভাব এবং নীতিগুলি জানে না বা বোঝে না। তারা আরব ও ইসলামিক নেতাদের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের উপর ভিত্তি করে শান্তির আহ্বান জানানোর বিবৃতিতে যোগ দেয় না কারণ মার্কিন মূলধারার মিডিয়ার মতো ইসরায়েলি মূলধারার মিডিয়া নিরলস রাষ্ট্রীয় প্রচারণা, মস্তিষ্ক-হত্যাকারী দেশপ্রেম এবং নিরলস যুদ্ধেও ভেতরেই আচ্ছন্ন।
ইসরায়েলি সমাজ নাৎসি হলোকাস্ট দ্বারা অপরিমেয়ভাবে আঘাত পেয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে ইউরোপীয় শিকড়ের প্রতিটি ইহুদি পরিবারের আধুনিকতা এবং স্মৃতির কেন্দ্রীয় সত্য হিসেবে রয়ে গেছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ আদালতের একটি ঘটনাগত অনুসন্ধান যে ইসরায়েল নিজেই এখন গণহত্যার অপরাধে অপরাধী হয়ে উঠেছে। এটা ইসরায়েলি সমাজজের শিকড় নাড়িয়ে দিতে পারে। এবং বিশ্ব ইহুদি গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইসরায়েলের সামাজিক চুক্তি ভেঙে যেতে পারে। এটা হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং অত্যন্ত ভয়াবহ।
হ্যাঁ, আইসিজে-এর রায় সত্তে¡ও ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ চলছেই। ঠাণ্ডা -মস্তিষ্কেই ঘটছে প্রতিটি ইসরায়েলি হত্যা, হাসপাতালে প্রতিটি বোমা নিক্ষেপ, ফিলিস্তিনি স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস, গাজাবাসীদের খাবার এবং পানীয় জল দিতে অস্বীকৃতি। এ সবকিছুই দক্ষিণ আফ্রিকার চমৎকার আইনি দল এবং আশেপাশের অত্যন্ত সম্মানিত আইনি ইনস্টিটিউটের দ্বারা সাবধানতার সাথে রেকর্ড করা হবে এবং এ সমস্ত কিছুই আইসিজেকে যথাযথভাবে অবহিত করা হবে।
প্যালেস্টাইন বর্তমান ভয়াবহ অগ্নিপরীক্ষা থেকে বেঁচে থাকবে, গভীরভাবে আহত কিন্তু শক্তিশালী বিশ্বব্যাপী সমর্থনসহ। বিপরীতে, ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে অনিশ্চয়তায়। কারণ এটি শীঘ্রই আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘনকারী হিসাবে ‘একঘরে’ হয়ে পড়তে পারে।
তাই এ মুহূর্তে ইসরায়েলের জরুরিভাবে এমন নেতার প্রয়োজন যারা সামরিক শক্তির উপর নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনকে শ্রদ্ধা করবে, ঔদ্ধত্যের উপর নম্রতা এবং বর্বরতার উপর শান্তিকে প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে এবং সর্বোপরি ইসরায়েল আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক অধিকার স্বীকার করার পরিবর্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার আত্ম-ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অসারতাকে অনুধাবন করতে হবে। [সূত্র :www.commondreams.org- এ পাবলিশ হওয়া আর্টিক্যালের ভাবানুবাদ]

[লেখক : জেফ্রি শ্যাক্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন বিশিষ্ট উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ। সুদীর্ঘ দুই দশক যাবত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন]

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট