চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

ফিলিস্তিনি কূটনীতিক হুসাম জোমলটের জবানি

ফিলিস্তিন বিষয়ে আসল সত্য

তৃতীয় পর্ব

২৫ জানুয়ারি, ২০২৪ | ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ

[হুসাম জোমলট গত ১০ নভেম্বর, ২০২৩-এ বিখ্যাত মার্কিন টিভি প্রোগ্রাম ফ্রন্টলাইন-এ দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্বের খুঁটিনাটি নিয়ে। ‘সময়ের দাবি’ বিবেচনায় তথ্যবহুল এ সাক্ষাৎকারের উল্লেখযোগ্য অংশ দৈনিক পূর্বকোণের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হচ্ছে (প্রশ্ন ও উত্তর আকারে)। আজ ৩য় পর্ব।]

আপনার পক্ষ থেকে কি একটি কূটনৈতিক ভুল ছিল- বিশেষ করে ইসরায়েল যখন একের পর এক আরব-উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে মেতে উঠেছিল, তখন আপনার পক্ষ থেকে (পিএলও-এর পক্ষ থেকে) উপসাগরীয় রাজ্যগুলোয় আগেভাগে না গিয়ে কি কোন ভুল হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

না, আমাদের আলাপ কিন্তু চলছিলই। সেখানে আমরা খুব স্পষ্টভাবে আমাদের মতামত প্রদান করেছি যে, দয়া করে ‘এজেন্ডায়’ খেলবেন না। প্রথম আলোচ্যসূচি হলো ‘দীর্ঘদিন ধরে চলা আন্তর্জাতিক ঐকমত্য’- এক ব্যাহত করার চেষ্টা করবেন না। আর দ্বিতীয় এজেন্ডায় তো (ফিলিস্তিনি জনগণকে আত্মসমর্পণে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা) অবশ্যই নয়। কিন্তু তারা আমাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। হয়তো আমাদের আরও তৎপর হওয়ার দরকার ছিল। নেতানিয়াহু কিন্তু তার ‘একক’ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিন্দুমাত্র ক্ষান্ত দেননি। সমানে ফিলিস্তিনি ভ‚মি দখল, বসতি স্থাপন করে চলা এবং এই বসতি স্থাপনকারীদের অস্ত্র সরবরাহ করা, আর অস্ত্রধারী এই বসতি স্থাপনকারীরা অবাধে ফিলিস্তিনি নিরীহ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করছে।

এখন যা ঘটছে তার কারণগুলো আপনি বর্ণনা করতে পারবেন না। তবে এটি আরও সংঘাতের রাস্তা তৈরি করে বলে মনে হচ্ছে। ফিলিস্তিনি সমস্যাটিকে উপেক্ষা করা যাবে না।

অবশ্যই, এটি গত ৭৫ বছর ধরে চলা একটি বিতর্ক। আপনি ফিলিস্তিনি জনগণকে উপেক্ষা করতে পারবেন না। আপনি আমাদের মতো প্রাণবন্ত, শক্তিশালী, সংস্কৃতিবান একটি জাতিকে উপেক্ষা করতে পারবেন না। মনে রাখবেন, এটা খ্রিস্টধর্মের জন্মস্থান। মনে রাখবেন, এই বেথলেহেমেই যীশুর জন্ম হয়েছিল। মনে রাখবেন, এই জাতি হাজার বছর ধরে আছে। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অনেক পরে এবং তখন থেকেই তাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্বকে অস্বীকারের ধৃষ্টতা দেখিয়ে চলেছে। আজও তা চলমান।
স¤প্রতি ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ প্যারিসে এক ভাষণে বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনি জনগণ বলে কিছু নেই। তাদের অস্তিত্ব নেই।’ আর তার সামনে মঞ্চে ছিল ইসরায়েলের মানচিত্র। অর্থমন্ত্রীর সামনের মানচিত্রে কী অন্তর্ভুক্ত ছিল জানেন? এটি ছিল সমগ্র ঐতিহাসিক প্যালেস্টাইন এবং সমগ্র জর্ডানের মানচিত্র। তাই এই, ৭৫ বছর আগে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত, আমাদের অস্বীকার করার খুব শক্তিশালী স্রোত রয়েছে। আর হ্যাঁ, আবারও প্রশ্নের উত্তরে বলছি, এমন জাতিকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, আমাদের অধিকার কেউ বাইপাস করতে পারবে না এবং আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ট্যাঙ্কের শক্তি দ্বারা (যেমনটি আমরা বছরের পর বছর এবং এখন দেখছি) কিংবা ট্রাম্পের মতো মার্কিন প্রশাসনের দ্বারা আরব দেশগুলোকে একটি বাস্তব সমাধান ছাড়াই ‘স্বাভাবিক’ করার চেষ্টা কখনওই কাজ করেনি এবং তা কখনওই করবে না।

এখন, আমি এখানে পার্থক্যটি বুঝতে চাই। কারণ স্পষ্টতই আপনি যেমন বর্ণনা করছেন, নেতানিয়াহু যা করতে চান তা সম্পাদন করার ক্ষমতা এবং অবশ্যই তার দেশের ডানপন্থীরা যা করতে চায়, তার ক্ষমতার দিক থেকে প্রায় ‘সুপারচার্জড’ হয়ে আছেন। তাকে কার্টে বøাঁশে (ইচ্ছেমতো কাজ করার ক্ষমতা) দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন কি আগের প্রশাসনগুলোর চেয়ে আলাদা ছিল?

এমন কোন মার্কিন প্রশাসন ছিল না, যারা সত্যিই একজন নিরপেক্ষ, সৎ মধ্যস্থতাকারীর ভ‚মিকা পালন করেছে। এটি একটি বাস্তবতা। প্রতিটি প্রশাসনই ধারাবাহিকভাবে ‘গলাগলি’ সম্পর্কে ছিল। খুব অল্প সময়ের জন্য একটা ‘ব্যতিক্রম’ বাদে। সেটা মাদ্রিদের শান্তি প্রক্রিয়ার ঠিক আগে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী শামির শান্তি সম্মেলনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহবান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সেসময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার ইসরায়েলি প্রতিপক্ষ আইজাক শামিরকে মার্কিন প্রস্তাবনা (যেটি কিছুটা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে গিয়েছিল) মেনে নিতে অনুরোধ করেন। বলেন, কংগ্রেসে ইসরায়েলের জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণের ব্যাপারটি নইলে পুনর্বিবেচনা করা হবে।
শামির অবিলম্বে মাদ্রিদে চলে গেলেন। যেতে যেতে বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। কিন্তু আমি কিছু না দিয়ে ২০ বছর ধরে কেবল ‘আলোচনা’ই করব। একবার সেই ২০ বছর শেষ হলে আমরা আরও ২০ বছরের জন্য আলোচনা করব।’.. ঠিক তাই ঘটছে।
এসব আলোচনার ক্ষেত্রে বরাবর দুটি এজেন্ডা ছিল। একটি ফিলিস্তিনিদের জন্য- একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা- তার সমস্ত জনগণের জন্য-মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি, অ-ধর্মীয়, সবার জন্য। অন্যদিকে, ইসরায়েল ইহুদিবাদের উপর ভিত্তি করে একটি একচেটিয়া আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যেটা সমগ্র ভূখন্ডের শুধুমাত্র ইহুদি জনগণের জন্য একটি ইহুদি রাষ্ট্রের মডেল।
১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে তৎকালীন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৯৬৭ মডেলে একটি দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পক্ষে তার যুক্তি তুলে ধরেন, যা আরবসহ বেশিরভাগ আলোচকরাই গ্রহণ করেছিল। এতে বলা হয়েছিল- ইসরায়েলকে অবশ্যই ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া তার দখলদারিত্বের অবসান ঘটাতে হবে। অর্থাৎ, তাকে অবশ্যই এ পর্যন্ত দখল করা ফিলিস্তিনি ভ‚মি থেকে সরে যেতে হবে। তবেই ইসরায়েলকে মেনে নেয়ার কথা বিবেচনায় নেয়া হবে। এখন মানুষ মনে করে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ফিলিস্তিনিদের দাবি। ভুল.. দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান একটি ফিলিস্তিনি ছাড়। কারণ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান আমাদের ঐতিহাসিক ভ‚মির মাত্র ২২% দিয়েছে। বাইশ শতাংশ। সেটা হলো পশ্চিম তীর এবং গাজা।
এরপর ‘অসলো’ হয়েছে। আমরা ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছি। আমরা অহিংসা ও আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং আমরা সমস্ত আন্তর্জাতিক রেজল্যুশনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসরায়েল গত ৩০ বছরে একটি জিনিস করবে বলে আশা করা হয়েছিল- তার ঔপনিবেশিক বসতি বিস্তার বন্ধ করা। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও একটি জিনিস করবে বলে আশা করা হয়েছিল- এই চুক্তিগুলো কার্যকর করা। আমি হলফ করে বলছি, আমরা আমাদের তিনটি প্রতিশ্রুতি এখন পর্যন্ত, এই মুহূর্ত পর্যন্ত মেনে চলছি- আমরা এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিচ্ছি, আমরা এখনও বিশ্বাস করি অহিংসা ও আলোচনার অনুশীলন করা এবং আমরা এখনও আন্তর্জাতিক বৈধতা, আইন এবং রেজল্যুশনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অথচ এই ৩০ বছরে একটিও ইসরায়েলি সরকার বসতি নির্মাণ বন্ধ করেনি। আমরা ১২৫,০০০ অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সাথে শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম, আজ সেটা ৭৫০,০০০ এরও বেশি। এটা ৫০০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই ৩০ বছরে ইসরায়েল যখন বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছিল, তখন ধারাবাহিক মার্কিন প্রশাসন কী করেছিল?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রশাসনগুলো ইসরায়েলকে কার্যতঃ কিছুই বলেনি। তারা কেবল ইসরায়েলকে আরও বেশি সামরিক সাহায্য দিয়েছে, আরও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি; ইউএন ব্যবস্থায় আরও রক্ষা; ফিলিস্তিনিদের আইসিসি [আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত] এবং আইসিজে [আন্তর্জাতিক বিচার আদালত]-এ প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া; ইসরায়েলের অবৈধতাকে আরও বেশি করে আলিঙ্গন করে গেছে।

আপনি যে উল্লেখ করেছেন একটা পরিবর্তন এখন হয়েছে, সেটা কী রকম এবং কেন এই পরিবর্তন?

হ্যাঁ, পরিবর্তন একটা অবশ্যই হয়েছে। আমি বলতে চাচ্ছি, যা ঘটেছে তার প্রতিক্রিয়া এখন বিশ্বব্যাপী। আসুন, লন্ডন এবং ম্যানচেস্টারের রাস্তাগুলো বা ওয়াশিংটন এবং নিউইয়র্কের রাস্তাগুলো দেখুন। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। কারণ গাজায় যা ঘটছে তা আগামী প্রজন্মের জন্য, আমাদের মানবতার জন্য ক্ষতিকর। উত্তরণের পথ হলো আন্তর্জাতিক ঐকমত্য। পথ হলো ঐতিহাসিক সমঝোতা; যা আমরা ৩০ বছর আগে করেছিলাম। পথ পারস্পরিক স্বীকৃতি। আমরা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছি। ইসরায়েলকে এখন আমাদের স্বীকৃতি দিতে হবে, আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে, যেমন আমরা তাদের সাথে করেছি। মার্কিন প্রশাসনের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার এখনই সময়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে আমাদের প্রচেষ্টাকে ভেটো দেওয়া এবং বাধা দেওয়া বন্ধ করা। কারণ যা ঘটছে, এই নৃশংসতা, গাজায় হত্যাকান্ড মোটেই কারও কাম্য হতে পারে না। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের কাছে তাদের জবাবদিহি করার জন্য প্রতিষ্ঠান আছে। সেটা হলো আইসিসি এবং আইসিজে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর তার ভেটো শেষ করতে হবে। এটি আমাদের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার অবরোধের অবসান ঘটাতে পারে। একবার আপনার কাছে এটি হয়ে গেলে, একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই দূরদর্শী এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রমাণিত হলে এবং সবার সাথে সমানভাবে আচরণ করলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান করা খুব সহজ হবে।
অর্জন- এটা জটিল নয়। এটা সোজা। ছয়দিনে ফিলিস্তিনি ভূখন্ড দখল করে ইসরায়েল। এটি ছয়দিনের মধ্যে তারা ছেড়ে যেতে পারে এবং আমরা সবাই বিশ্রাম নিতে পারি ও একটি খুব সমৃদ্ধ জাতি গঠন শুরু করতে পারি।- চলবে

লেখক পরিচিতি
[হুসাম জোমলট বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ফিলিস্তিনি মিশনের প্রধান। তিনি এর আগে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের স্ট্র্যাটেজিক এডভাইজার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতিসংঘে একজন অর্থনীতিবিদ এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অর্থনৈতিক গবেষক হিসেবেও কাজ করেছেন।]

শেয়ার করুন