চট্টগ্রাম সোমবার, ২২ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

ব্রিকস : প্রেক্ষাপট এবং প্রভাব বিশ্লেষণ

ওয়াহিদ জামান

৩১ আগস্ট, ২০২৩ | ৫:৫৮ পূর্বাহ্ণ

ইদানিং ‘ব্রিকস’ (Brics) নামে একটি মাল্টি-ন্যাশনাল গ্রুপ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এই নিবন্ধে এই গ্রুপিং কী সম্পর্কে, এবং কেন এটি নিয়ে এতো আলোচনা সে সম্পর্কে আলোকপত করা হলো।
‘ব্রিকস’ শব্দটি ২০০১ সালে গোল্ডম্যান শ্যাক্স ব্যাংক’র একজন অর্থনীতিবিদের দেয়া। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার এই গ্রুপটি শুরুতে কেবল তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষায় গঠিত হয়েছিল। এ দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল দ্রুত বর্ধনশীল, পরিবর্তনশীল এবং বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময়। ধারণা ছিল, এই দেশগুলোর জোটের মাধ্যমে বাজারভিত্তিক এমন একটা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যেটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ) কিংবা বিশ্বব্যাঙ্কের মতো বহুজাতিক সংস্থাগুলোর প্রভাব সত্ত্বেও স্বতন্ত্র আধিপত্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গড়ে উঠা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উন্নত কাঠামোর মতো।
আজ ‘ব্রিকস’ গঠনের ২ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাবার পর বিশ্বব্যবস্থায় অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। এমতাবস্থায় এর (‘ব্রিকস’) সম্প্রসারিত নতুন জোটের ব্যাপারে অনেককিছুই বোঝার আছে।
প্রথমত, মূল ‘ব্রিকস’ দেশগলোর মধ্যে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা শক্তির আধিপত্যকে’ চ্যালেঞ্জ জানানোর ইচ্ছা ছাড়া আর অন্য কোনোও বিষয়ে খুব অল্পই মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
‘ব্রিকস’র একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির জন্য নিয়মিত মিটিং, একটি ব্যাংক (দ্য নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, যার সদস্যপদ কেবল ‘ব্রিকস’ দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়) গঠন ছাড়া আর কোনোও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়নি। এর কোনো সচিবালয় নেই বা কোনো স্থায়ী কর্মী নেই এমনকি এর কোনো আনুষ্ঠানিক নেতাও নেই।
বিগত ক’বছর ধরে একের পর এক মিটিং হয়েছে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির জন্য- বিশেষত: গ্লোবাল সাউথ থেকে। সর্বশেষ মিটিংটি গত সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংহতির বিবৃতি এবং ডলারভিত্তিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থার আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার বিষয়ে অনেক কথাবার্তার বাইরে, সুনির্দিষ্ট কিছু অগ্রগতি ছিল লক্ষ্যনীয়। বড় খবর ছিল- ছয়টি নতুন দেশকে (আর্জেন্টিনা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত) আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রুপে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত।
একটু পিছিয়ে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। প্রশ্নটা হলো- ‘ব্রিকস’র আনুষ্ঠানিক জোট কাঠামোতে (যেমন অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট ন্যাশনস বা আসিয়ান এবং অর্গানাইজেশন অব আফ্রিকান ইউনিটি) বিকশিত হওয়ায় নতুন কী সম্ভাবনার সৃষ্টি হলো। এর অকপট উত্তরটি হলো- এটি বলা ‘অসম্ভব’। ‘ব্রিকস’-গোষ্ঠীভুক্ত মূল খেলোয়াড়দের সকলেরই ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে যা একটি আনুষ্ঠানিক জোট গঠন প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তোলে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নিজ অবস্থান সংহত রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত।
রাশিয়া, ইউক্রেনে যুদ্ধ পরিচালনাকারী একটি প্রধান পারমাণবিক শক্তি হিসাবে সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইসাথে এখন অর্থনৈতিকভাবে অনেকটাই দুর্বল পশ্চিমা বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ায়। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউ- উভয়েই দেশটির শত্রু হিসাবে বিবেচিত।
ভারত, তার ১৪০ কোটির দ্রুত বর্ধনশীল জনসংখ্যা এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি যা দ্রুতই বর্ধনশীল। বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ব্যবস্থার সাথে ‘ভালভাবে একীভূত’ এবং ‘দারুণভাবে উপকৃত’। যদিও ভারতের রয়েছে চীনের সাথে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কিন্তু তবুও দেশটি পশ্চিম বিশ্বের সাথে তার বাণিজ্যিক সংযোগ রক্ষা করে চলতে বদ্ধপরিকর।
ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতির পাশাপাশি বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশও। এই বছরের নির্বাচনে বোলসোনারোর পরাজয়ের পর বামপন্থী লুলার নেতৃত্বে ব্রাজিল একটি স্বাধীন পথে হাঁটতে চাইছে, কোনোও ‘শক্তি’র মুখাপেক্ষী হয়ে নয়। অনেকটা ভারতের মতো।
সবশেষে, দক্ষিণ আফ্রিকার রয়েছে বড়সড় অর্থনৈতিক সমস্যা। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেরিয়া এবং ইথিওপিয়ার মতো আফ্রিকান দেশগুলিতে তাদের জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর (দক্ষিণ আফ্রিকার) প্রভাব বছরের পর বছর ধরে হ্রাস পেয়েছে।
তাই মূল ‘ব্রিকস’ দেশগুলোর মধ্যে মিলের চেয়ে বরং পার্থক্যটাই বেশি রয়েছে। তাদের একত্রিত হওয়ার একমাত্র সাধারণ ইস্যুটি হল- ‘বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করা, যেখানে পশ্চিমের রয়েছে সুস্পষ্ট আধিপত্য।’
যদিও গত সপ্তাহের মিটিংয়ে ‘ব্রিকস ক্লাব’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিটা ছিল আকর্ষণীয়।
সম্পদশালী পেট্রো-রাষ্ট্র সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের উচ্চাকাক্সক্ষা চরিতার্থ করতেই এ জোটে যুক্ত হয়েছে বলা যায়।
ইথিওপিয়া আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এবং বিগত দুই বছরে অভ্যন্তরীণ ঝামেলা ছাড়াই আফ্রিকার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি।
সরকারকে বিচ্ছিন্ন করার পশ্চিমাদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান এই গ্রুপে যোগ দিতে পেরে নিশ্চিতভাবেই খুব খুশি হবে।
অবশেষে আর্জেন্টিনা এবং মিশর হল আগ্রহী নতুন সদস্য। নিঃসন্দেহে তারা বৃহত্তর বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের দুর্বল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চাইছে।
এর বাইরেও ‘ব্রিকস’-এ যোগদানের বিষয়ে বেশ কিছু দেশ নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা চলেছে। আসিয়ান দেশগুলি (থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরসহ) সতর্কতা অবলম্বন করেছে ‘পশ্চিম’- ‘অ-পশ্চিম’ বিষয়টি নিয়ে। তারা বরং মধ্যম পথের সন্ধান করেছে। এখানে আরো একটা বিষয় ঠিক পরিষ্কার নয়, কেন গ্লোবাল সাউথের বড়, গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলি (যেমন বাংলাদেশ এবং নাইজেরিয়াকে হয় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বা বর্ধিত ব্রিকস গ্রুপিংয়ে তারা নিজেরাই যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল) এর বাইরে রয়ে গেল।
উপসংহারে এটা অবশ্যি বলা যায়, ‘ব্রিকস’ গঠন নি:সন্দেহে একটি অগ্রগতিশীল কাজ। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, পশ্চিমা আধিপত্যশীল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বৈশ্বিক কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধিতার প্রতীক এটি। কিন্তু একই সাথে আমাদের বুঝতে হবে যে ‘ব্রিকস’ হল ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থসহ দেশগুলির একটি শিথিল গোষ্ঠী এবং এর যাবতীয় অগ্রগতি এবং কৃতিত্ব, সম্ভবত ‘ক্রমবর্ধমান’-ই হবে কিন্তু বিশ^ব্যবস্থায় তা ‘গঠনগত কোনোও পরিবর্তন’ সহসা আনতে সক্ষম হবে না। – অনূদিত।

লেখক :

সিইও, ডব্লিউএন্ডএ কনসাল্টিং : প্রাক্তন প্রধান কৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারশে (Hershey),ফার্মার ব্রাদার্স’র পরিচালনা পরিষদের সদস্য। এছাড়াও ‘ফরচুন ফাইভ হানড্রেড’ কোম্পানির বেশ ক’টি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে উদ্যোক্তাদের পরামর্শ আর সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট