চট্টগ্রাম শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

সর্বশেষ:

ইউক্রেন যুদ্ধের একবছর

কার লাভ, কী ক্ষতি

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ

ছোট আকারে দেখলে বলা যায় যুদ্ধ হচ্ছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে। সামান্য বড় করে দেখলে বলা যায় যুদ্ধ হচ্ছে রাশিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে। আরেকটু বড় আকারে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে দেখলে বলা যায় যুদ্ধ হচ্ছে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে রাশিয়া ও চীনের, যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি।
একটা প্রশ্ন এখানে করা যায়। আমেরিকা কেন চীন বা রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখল না, কেন একসাথে দুই শত্রু সৃষ্টি করলো? এই প্রশ্নের উত্তর আছে ক্ষমতা ও ক্ষমতার বেঁচে থাকার যুক্তিতে।
রাশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব রাখা মানে রাশিয়ার সাথে ইউরোপের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়া, রাশিয়ার উপর ইউরোপের নির্ভরতা বেড়ে যাওয়া। রাশিয়ার সাথে ইউরোপের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রভাব কমে যায়। বিশ্বব্যাপী আমেরিকার আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রধান সহযোগী ইউরোপ। ইউরোপ হাতছাড়া হলে বা ইউরোপের কাছে আমেরিকার গুরুত্ব কমে গেলে আমেরিকার সা¤্রাজ্য আর থাকে না, একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকে না।
চীনের অগ্রগতি বজায় থাকলে আমেরিকা বিশ্বের দুই নম্বর শক্তিতে পরিণত হবে অর্থনৈতিক ভাবে। এক নম্বর শক্তি হিসাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে যেকোনো উপায়ে চীনের অগ্রগতি থামাতে হবে। আমেরিকা তাই চীনের বন্ধু হতে পারে না।
ক্ষমতার অন্তর্গত যুক্তি হচ্ছে শক্তির প্রয়োগ ও প্রদর্শন, এটা ক্ষমতার প্রাণ, এটা ছাড়া ক্ষমতা অর্থহীন। শক্তি প্রয়োগে যেকোনো বাধা ক্ষমতার নিরাপত্তার প্রতি হুমকি। চীন ও রাশিয়া আমেরিকার শক্তি প্রয়োগে বাধা। তাই দুই শত্রু না বানিয়ে আমেরিকার উপায় ছিলো না। অথচ, ক্ষমতার এই যুক্তিতে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার ধ্বংসের বীজ; কারণ শক্তির প্রয়োগ শেষমেশ ক্ষমতার ভিত্তি দুর্বল করে এবং ক্ষমতাকে ধ্বংস করে।
ক্ষয়ক্ষতি
বিবিসির হিসাব মতে এই পর্যন্ত রাশিয়া হারিয়েছে ১২ থেকে ১৮ হাজার সৈন্য, আহত হয়েছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার। বেশ কিছু পশ্চিমা সূত্রের মতে, ইউক্রেন হারিয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার সৈন্য, আহত হয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ। জাতিসংঘের মতে ৮ থেকে ১০ হাজার সাধারণ নাগরিক মারা গেছে। রাস্তা, ব্রিজ এবং বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনার ধ্বংসের পরিমাণ এতো বেশি যে তা এখনো হিসাব করা হয়নি, তবে ধারণা করা হয় এর পরিমাণ ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। ৫.২ মিলিয়ন মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে শরণার্থী হয়েছে, সব মিলিয়ে বাড়িঘর ছেড়েছে ১৫ মিলিয়ন।
ইউরোপীয় অর্থনীতি চরম হুমকির মুখে। রাশিয়ার অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে সামান্য। বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।
লাভ
আমেরিকার গ্যাস ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের লাভ হয়েছে প্রচুর। ইউক্রেনের প্রভাবশালীদের অনেকেই প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। ভারত ও চীন রাশিয়া থেকে সস্তায় প্রচুর তেল ও গ্যাস কিনেছে এবং এর কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করেছে ইউরোপ ও আমেরিকায়। অন্যদিকে সাপ্লাই চেইনের ক্ষতি হবার ফলে চীনের রপ্তানি কমেছে। তাই সব মিলিয়ে লাভক্ষতি কেমন বলা কঠিন।
যুদ্ধের ধরণ
ইউক্রেন যুদ্ধকে বলা হচ্ছে আর্টিলারি ও ক্ষয়ের (ধঃঃৎরঃরড়হ) যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বিমান শক্তি ও নৌ শক্তির ব্যবহার খুব কম। স্থলযুদ্ধে ট্যাংক ও আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার কম। এমন যুদ্ধে তারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে যাদের সৈন্য ও আর্টিলারি বেশি। উপরের হিসাবে আমরা দেখেছি রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেন অনেক বেশি সৈন্য হারাচ্ছে। একইভাবে রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেন অনেক বেশি আর্টিলারি ও অন্যান্য অস্ত্র হারিয়েছে। পশ্চিমা শক্তি ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে নিজেদের ভা-ার শেষ করার পথে। পশ্চিমা হিসাব মতে রাশিয়া বর্তমানে যে পরিমাণ আর্টিলারি উৎপাদন করে পশ্চিমা শক্তির সেই অবস্থায় যেতে আরও চার বছর লাগবে। তাই, শুধু সংখ্যার হিসাবে ইউক্রেনের তুলনায় রাশিয়া অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায়। রাশিয়া নিজে যুদ্ধের ধরণ ও মাত্রা বদলাবে কিনা বলা কঠিন। তবে পশ্চিমা শক্তি যদি বদলাতে চায় তার উত্তর রাশিয়ার আছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে কেন সমঝোতা হচ্ছে না?
প্রথম দিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন সমঝোতায় সম্মত ছিল। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের (যিনি ছিলেন একজন মধ্যস্থতাকারী) ভাষ্য অনুযায়ী যুদ্ধ বন্ধের একটা সমঝোতা চুক্তি প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল, রাশিয়া ও ইউক্রেন সম্মত ছিল এই সমঝোতায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা হস্তক্ষেপে ইউক্রেন সংলাপ থেকে সরে যায়। সেই সময় যুদ্ধ বন্ধ হলে ১৫০ হাজারের বেশি জীবন বেঁচে যেতো।
সেই সময় পশ্চিমাদের বিশ্বাস ছিল, অর্থনৈতিক অবরোধে রাশিয়া এতোটাই কাবু হবে যে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শক্তি হারাবে এবং রাশিয়ার সরকার ক্ষমতা হারাবে। পশ্চিমারা এখন জানে তাদের হিসাবে ভুল ছিল, তাও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের উপায় নেই। তাদের চেষ্টা এটাই প্রমাণ করে যে রাশিয়ার অভিযোগ সত্যি ছিল পশ্চিমা শক্তি এক দুর্বল ও তাঁবেদার রাশিয়া দেখতে চেয়েছে, রাশিয়াকে ধ্বংস করার অস্ত্র হিসাবে ইউক্রেনকে ব্যাবহার করেছে।
শুরুতে রাশিয়া জানতো না তারা অর্থনৈতিকভাবে কতোটা কাবু হবে। তাই সমঝোতা করতে তারা প্রস্তুত ছিল। রাশিয়ার আত্মবিশ্বাস এখন অনেক বেশি। রাশিয়া এখন তাই তেমন সমঝোতাই মানবে যে সমঝোতায় ইউক্রেনকে আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।
কে জিতবে?
এই যুদ্ধকে রাশিয়া অস্তিত্বের যুদ্ধ মনে করে, তাই পরাজয় কোন অপশন নয়। অন্যদিকে একটা পর্যায়ে পশ্চিমা শক্তি হাল ছেড়ে দিতে পারে – যেমন আফগানিস্তানে করেছে।
শেষ কথা
বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হিসাবে আমেরিকার ক্ষমতা কমে আসছিলো। এই যুদ্ধ সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। এতো মৃত্যুও ধ্বংসের সামনে দাঁড়িয়ে এই আশা হয়তো করা যায় যে পৃথিবীতে আর নতুন কোন সাম্রাজ্য আসবে না। মানবতা ধ্বংসকারী এই পুরনো ধারণা থেকে পৃথিবী চিরদিনের মতো মুক্তি পাবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট