চট্টগ্রাম রবিবার, ২৬ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

চ্যাট জিপিটি কি গুগলের হুমকি

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ

[প্রযুক্তি এখন এগোতে এগোতে এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মানুষকে তেমন একটা মাথা খাটাতে হচ্ছে না। এতদিন ধরে গুগল বা এমন কিছু সার্চ ইঞ্জিনে এসব সুবিধা মিলতো। তবে এবার এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন করে যোগ দিয়েছে ‘চ্যাট জিপিটি’]

চ্যাট জেনারেটিভ প্রি-ট্রেইনড ট্রান্সফরমার বা চ্যাট জিপিটি হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিসার্চ কোম্পানি ‘ওপেন এআই’র একটি চ্যাটবট। মানুষের কথা বলার ভাষা বুঝতে পারে এই এআই চ্যাটবটটি। সহজ ভাষায় বলতে গেলে গুগলে যেমন অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলে খুব সহজেই, সেই সহজ ব্যবস্থাটি আরও সহজ ও উন্নত হয়ে এসেছে চ্যাটবট চ্যাট জিপিটিতে।

বিশ্বের প্রচুর ডেটা সংগ্রহ করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে টেক্সট ফরম্যাটে জানাবে এই প্রযুক্তি। গত নভেম্বরে চালু হওয়া এই চ্যাটবট ব্যবহার করতে ওয়েবসাইটে ঢুকে নিবন্ধন করতে হবে। এরপর সহজেই ব্যবহার করে এর মাধ্যমে সেবা পাওয়া যাবে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, চ্যাট জিপিটিকে প্রশ্ন করা হলে মানুষের মতোই উত্তর দিতে পারে। এমনকি এই চ্যাটবটকে যদি কেউ কবিতা লিখতেও বলেন, তাও লিখে দেবে। সার্চ টুলটি দিয়ে দেবে পরীক্ষাও।

ওপেন এআই নতুন সংস্করণের চ্যাটবট প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছে, সংলাপের ধরন বুঝে ফলোআপ প্রশ্নের উত্তর দেয়া, ভুল স্বীকার করা, ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করা এবং অনুপযুক্ত অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার মতো কাজ করতে দক্ষ হয়ে উঠেছে চ্যাটবটটি। ইন্টারনেটে থাকা ওয়েব পেজ, ওয়েব টেক্সট, বই, উইকিপিডিয়া, আর্টিকেলসহ বিভিন্ন উৎস থেকে প্রায় ৫৭০ জিবির বেশি ডাটা সমৃদ্ধ চ্যাট জিপিটি। শুধু তাই নয় এই চ্যাটবটে রয়েছে ৩০০ বিলিয়ন শব্দের ভা-ার। পাশাপাশি একটি বাক্যের পরবর্তী শব্দটি কী হওয়া উচিত তা অনুমান করতেও সক্ষম চ্যাট জিপিটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আপনি যদি চ্যাট জিপিটিতে গিয়ে সার্চ করেন মূল্যস্ফীতি কি? চ্যাট জিপিটি তার যথোপযুক্ত নির্ভুল উত্তর দেবে। উত্তরটি যদি কোনও কারণে ভুলও হয় তাহলে এর কর্মীরা প্রশ্নের সঠিক উত্তরটি সিস্টেমে ইনপুট করে দেন। ফলে চ্যাট জিপিটির জ্ঞানের ভা-ার ক্রমশ বাড়তে থাকে। তবে অনেক সুবিধা থাকলেও চ্যাট জিপিটির মাধ্যমে মূলত টেক্সট রেজাল্ট পাওয়া যায়। ভিডিও বা ভিজ্যুয়াল রেজাল্ট আসে না। এসব বিষয়ে আরও কাজ চলছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

যেভাবে চ্যাট জিপিটি একাউন্ট তৈরি করবেন এবং ব্যবহার করবেন

আপনি যদি চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করতে চান সেক্ষেত্রে প্রথমে আপনাকে একটি একাউন্ট ক্রিয়েট করতেই হবে। একাউন্ট ছাড়া কখনোই আপনি, চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করতে পারবেন না। তাই একাউন্ট ক্রিয়েট করার জন্য আপনাকে, এই লিংকে (https://chat.openai.com/auth/login) প্রবেশ করতে হবে। এরপরে যথাযথভাবে সাইন আপ করে চ্যাট জিপিটি একাউন্টটি তেরি করে নিতে হবে। আপনি যদি সফলভাবে চ্যাট জিপিটি একাউন্ট তৈরি করতে পারেন তাহলে খুব সহজেই, চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করে সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

 

চ্যাট জিপিটি’র প্রধান কিছু বৈশিষ্ট্য
কথোপকথনে প্রাকৃতিক ভাষা ইনপুট বোঝার এবং প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা। এটি কথোপকথনের সুরে প্রশ্নের স্বাভাবিক উত্তর দিতে পারে এবং কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে। এটি এমনকি গল্প এবং কবিতার মতো সৃজনশীল পাঠ্য তৈরি করতে পারে। এটি ডেভেলপারদের বিভিন্ন ভাষা মডেল তৈরিতে এবং প্রোগ্রামিংয়ে ভুল চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। এটি বিভিন্ন এপ্লিকেশন যেমন চ্যাটবট, ভার্চুয়াল সহকারী এবং ভাষা অনুবাদ সিস্টেমে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি টেক্সট বক্সে মানুষের মতো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এবং কথোপকথন।

চ্যাট জিপিটি’র সুবিধা
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)- এর টুল হিসেবে চ্যাট জিপিটি ব্যবহার করার অনেক সুবিধা রয়েছে। এর রয়েছে উচ্চ-মানের টেক্সট জেনারেশন, এবং এটি প্রচুর পরিমাণে টেক্সট ডেটার উপর প্রাক-প্রশিক্ষিত। ফলে এটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর সুসংগত এবং সাবলীল পাঠ তৈরি করতে পারে।
এটি কথোপকথন বুঝতে পারে অর্থাৎ চ্যাট জিপিটি কথোপকথন এবং ভাষা বোঝার কাজগুলির জন্য প্রশিক্ষিত বিধায় এটি চ্যাটবট এবং ভার্চুয়াল সহকারী তৈরির জন্য উপযুক্ত করে তোলে।
ভাষা প্রক্রিয়াকরণও সম্ভব এর দ্বারা, অর্থাৎ একে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে যেমন পাঠ্য তৈরি, প্রশ্নের উত্তর এবং ভাষা অনুবাদ ইত্যাদি। ওপেনএআই নিয়মিতভাবে চ্যাট জিপিটি মডেলের আপডেট এবং উন্নতি প্রকাশ করে, সময়ের সাথে সাথে এর কর্মক্ষমতা এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে বলাই যায় এটি উন্নত কর্মক্ষমতাসম্পন্ন।

চ্যাটজিপিটি’র অসুবিধা
এটি প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ এবং কথোপকথনমূলক এআই-এর জন্য একটি শক্তিশালী টুল হলেও এর কিছু অসুবিধা রয়েছে।
কথার প্রসঙ্গ না বোঝা অর্থাৎ চ্যাটজিপিটি কথোপকথনের প্রেক্ষাপট এবং উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিমূলক বা অর্থহীন প্রতিক্রিয়া দিতে পারে।
ক্ষেত্র বিশেষে এর যোগ্যতা সীমিত হতে পারে, অর্থাৎ এর কোনো ত্রুটি বা পক্ষপাত সনাক্ত করা এবং এর সমাধান করার যোগ্যতা নাও থাকতে পারে।
ক্ষেত্র বিশেষে আবার এর জ্ঞানও সীমিত হতে পারে। এই যেমন- এটি বিশেষ করে ২০২১ সালের পরের কোন তথ্য, ঘটনা সরবরাহ করতে পারে না।
এতে থাকতে পারে সৃজনশীলতার অভাবও। যেহেতু মডেলটি প্রাক-প্রশিক্ষিত এবং ইনপুটের উপর ভিত্তি করে আউটপুট তৈরি করে, তাই এতে সৃজনশীলতা এবং মৌলিকতার অভাব থাকতে পারে। এটি একই উত্তরের পুনরাবৃত্তিও করতে পারে।
এটি ভৌত বা বাস্তব জগত সম্পর্কে অজ্ঞ অর্থাৎ চ্যাট জিপিটি টেক্সট ডেটার উপর প্রশিক্ষিত এবং ফলে ভৌত জগত সম্পর্কে এর কোন বোঝাপড়া নেই।
ইন্টারনেটের উপর নির্ভরতার কারণে কাজ করার জন্য এর একটি ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বা পরিবেশে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এটি অনেক সময় ভুল তথ্য সরবরাহ করতে পারে।

চ্যাট জিপিটি’র ভবিষ্যত
নিঃসন্দেহে এ মুহূর্তে প্রযুক্তি বিশ্ব চ্যাট জিপিটি-তে সম্মোহিত। সামনে এর আরো আপডেটেড ভার্সন আসছে। ফলে আশা করা যায়, এর বর্তমান খামতিগুলো তাতে থাকবে না। চলতি বছরের প্রথম চতুর্ভাগে এটি আরো উন্নত প্রযুক্তি-নির্ভর হয়ে বাজার সরগরম করবে সন্দেহ নেই। তারওপর আরেক প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট এতে মাল্টি-বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এ খাতের অন্য প্রতিযোগীদের কপালে ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। তাই বলাই যায়, এর ভবিষ্যত উজ্জ্বলতরই হতে চলেছে।

টেক জায়ান্ট গুগলের তৎপরতা
চ্যাট জিপিটির এই সাফল্য দেখে কার্যত চিন্তায় পড়ে গিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন গুগল। কারণটা আশাকরি সবাই অনুমান করতে পেরেছেন। আসলে গুগল সার্চ ইঞ্জিন সংস্থার মোট রেভেনিউয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ অবদান রাখে। তাই এই ক্ষেত্রে চ্যাট জিপিটি তথা এআই সার্চ টুলের জনপ্রিয়তা তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তা দেখে সম্প্রতি ঈড়ফব জবফ (কোড রেড) ঘোষণা করেছে টেক জায়ান্ট গুগল। কোড রেড হল গুগলের আসন্ন চ্যাট বট। আশা করা হচ্ছে এটি চ্যাট জিপিটি-কে টেক্কা দেবে। কিন্তু তাজ্জব করা বিষয় হল, ২০ বছর ধরে যে সংস্থা সার্চ ইঞ্জিনের ব্যবসায় রয়েছে তারা প্রযুক্তির অগ্রগতির কথা মাথায় রেখে এআই চ্যাট বট তৈরি করতে পারেনি! প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়, গুগলের ইতিমধ্যে একটি এআই চ্যাটবট কিন্তু রয়েছে যার নাম এলএএমডিএ (খধগউঅ)। কিন্তু কোনোও গূঢ় কারণে গুগল এটিকে এখনি জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করতে আগ্রহী নয়।

পরিশেষে
অনেকের মনেই এ ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে চ্যাট জিপিটি কন্টেন্ট রাইটিং বা ক্রিয়েটিভ রাইটিং ইন্ডাস্ট্রিকে ধ্বংস করে দিতে পারে, মূলত এই ধারণাটি সঠিক নয়। কেননা, চ্যাট জিপিটি সম্পূর্ণ একটি যান্ত্রিক চ্যাট বট। সে যে সকল তথ্য প্রদান করে তার সবগুলোই কোন না কোন ওয়েবসাইট থেকে সংগ্রহ করা। আর সে যে সকল ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেই তথ্যগুলো কোন না কোন ব্যক্তি সরবরাহ করেছে। সুতরাং, চ্যাট জিপিটি মানুষের উপরে নির্ভরশীল, মানুষ চ্যাট জিপিটির উপর নির্ভরশীল নয়।

[তথ্যসুত্র : ডিজিটালট্রেন্ডস]

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট