চট্টগ্রাম বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

প্রচ- গরমে ঘরে ঘরে জ¦র সর্দিকাশি

ইমাম হোসাইন রাজু

১৪ মে, ২০১৯ | ৩:০২ পূর্বাহ্ণ

কিছুতেই ছন্দে ফিরছে না আবহাওয়া। প্রচ- তাপে হাঁসফাঁস অবস্থা সর্বত্র। ঘরে কিংবা বাইরে কমবেশি সবাই কাশছেন, কেউ বা নাকও টানছেন, সঙ্গে জ¦র-গলাব্যথা তো আছেই। ঠা-া গরমের মিশ্র আবহাওয়ার এই তারতম্যের কারণে নগরীর প্রতিটি ঘরে ঘরেই বাসা বাঁধছে রোগ জীবাণুর। চিকিৎসকরা বলছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণেই এ প্রকোপটা বেশি। যার কারণেই শিশু থেকে বয়স্ক সকলেই জ¦র, সার্দিকাশি, গলাব্যাথাসহ ফ্লু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আছে। তবে আক্রান্তের বেশি অংশই হচ্ছে শিশু।
গত কয়েকদিন ধরে ঠা-াগরমের ফারাকের জন্য নগরীর সরকারি-বেসরকারি ও প্রাইভেট চেম্বারে এ ধরনের রোগীদের ভিড় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকরা। তাই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সতর্ক থাকার পরামর্শ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের।
গতকাল (সোমবার) চট্টগ্রামের সর্বোচ্চ তাপমাত্র ছিল ৩৪.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস. এবং সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল ২৮.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস.। এর আগের দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ম তাপামাত্রা ছিল ২৭.৮ সেলসিয়াস। এতেই বুঝা যায়, তাপমাত্রা অপরিবর্তিত রয়েছে।
নগরীর একটি শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে চার বছর বয়সী শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা সুমাইয়া চৌধুরী। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ শিশুকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আবার কিছুক্ষণ বসে থাকতে হয়েছে তাকে। অন্যদিকে অসুস্থ শিশুর অভিভাবকের অধিক উপস্থিতির কারণে কক্ষটিও একদম গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। একপর্যায়ে শিশুটি মায়ের ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, গত তিনদিন ধরে প্রচ- জ¦র হয়েছে শিশুটির। সেই সঙ্গে সর্দি-কাশিও আছে। প্রাথমিক ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। তবে কিছুতেই জ¦র না কমায় ডাক্তার দেখাতে অপেক্ষা করছেন তিনি।
শুধু সুমাইয়া নয়। পাশে থাকা আরও কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, উপস্থিত হওয়া বেশিরভাগ শিশুই জ¦র-সর্দিকাশিসহ আবহাওয়া জনিত রোগে আক্রান্ত। অনেকের ঘরে শিশু ছাড়াও বৃদ্ধসহ সবাই জ¦রে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানান তারা। শুধু যে শিশুই আক্রান্ত এমনটিও নয়। মেডিসিন বিভাগে গিয়েও বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের লম্বা সিরিয়াল দেখা যায়। তাদের সবারও একই ভাষ্য। প্রচ- গরমের কারণেই জ¦র-মাথাব্যথাসহ সর্দিকাশিতে আক্রান্ত সবাই।
এদিকে, শুধু চেম্বারে যে ভিড় তাও নয়। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এমন রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই ভর্তি হয়েছে। তারমধ্যে বেশি অংশই হচ্ছে শিশু।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের তথ্য মতে, গতকাল (সোমবার) হাসপাতালের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১৬৮ জন শিশু। আর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগেই ভর্তি রয়েছে ৪৫৪ জন শিশু। এর মধ্যে বেশিরভাগ শিশুই হচ্ছে জ¦র, সর্দিকাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।
অন্যদিকে, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের তথ্যমতে, হাসপতালে মোট রোগীর ভর্তির অর্ধেকেই হচ্ছে শিশু। তাদের দেয়া তথ্যানুসারে, গতকাল (সোমবার) পুরো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৪৯৯ জন রোগী। তারমধ্যে ২৪৯ জনই হলো শিশু। এদের মধ্যে ব্রঙ্কিওলাইটিসে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ৬৩ জন। আর ডায়েরিয়ায় আক্রান্ত শিশু হলো ৭২ জন। অন্যসবাই জ¦র-সর্দিকাশিসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত বলে জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি ছাড়াও গতকাল (সোমবার) ১৮৭ জন শিশু রোগী বহিঃবিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান ডা. ফাহিম হাসান রেজা পূর্বকোণকে বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেই এসব রোগে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। যার কারণেই প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাইরাসজনিত শ^াসকষ্ট, এজমা বা হাঁপানি ও ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত শিশুই বেশি। বলা চলে আবহাওয়ার এমন তারতম্যের কারণে নগরীর ঘরে ঘরে ভাইরাস জ¦র হচ্ছে। জ¦রের সাথে মাথাসহ শরীর ব্যথা এবং বমিও হচ্ছে অনেকের। তারমধ্যে শিশুদের জ¦রটা একটু বেশি হচ্ছে। তিনি বলেন, গত কয়েকদিনের তথ্যমতে আমাদের হাসপাতালে কয়েকগুণ বেশি রোগী আসছে। যার মধ্যে বেশিরভাগই হচ্ছে জ¦র-সর্দিকাশিসহ আবহাওয়া জনিত রোগে আক্রান্ত। অনেক সময় এমন কিছু শিশু রোগী আসে যাদের জ¦র ১০৩ থেকে ১০৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে যায়। তবে আবহাওয়া ঠিক হলে বা বৃষ্টি হলে অন্তত এমনটি কমে আসবে বলে অভিমত তাঁর।
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. বাসনা মুহুরী পূর্বকোণকে বলেন, ‘এ সময়ে রোগবলাই এমনিতেই বেশি হয়। তারমধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভ্যাপসা গরম পড়ছে। এতে আরও কাহিল হয়ে পড়ছে শিশুরা। তাপমাত্রা যদি স্বাভাবিক না হয় তাহলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে’। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন থেকে আমার চেম্বারে যত রোগী আসছে তার বেশি অংশই হচ্ছে জ¦র-সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া, শ^াসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত তাপদাহের কারণে ধুলোবালি থেকে এসব রোগজীবাণু হচ্ছে বলেও অভিমত তাঁর’।
এ সময়ে খুব প্রয়োজন না হলে শিশুদের ঘরের বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে এ শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘এ সময়টিতে শিশুদের তরল পানি জাতীয় খাবার বেশি খাওয়াতে হবে। ঘাম হলে পাতলা কাপড় দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে মুছে দিতে হবে এবং বাচ্চাদের সুতির কাপড় পরিধান করাতে হবে’। শিশুকে ভারী কাপড় পড়ানো যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া শিশুকে এন্টিবায়োটিক দেয়া যাবে না’।
এদিকে, আজ (মঙ্গলবার) থেকে তাপমাত্রা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা শেখ ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে আবহাওয়া অপরিবর্তিত থাকলেও আজ (মঙ্গলবার) দুপুরের পর থেকে আবহাওয়া পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে’।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট