চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬

‘পল্লী চিকিৎসক প্রশিক্ষণ’ না আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা-বাংলাদেশ কোন পথে?

‘পল্লী চিকিৎসক প্রশিক্ষণ’ না আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা-বাংলাদেশ কোন পথে?

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

১৩ এপ্রিল, ২০২৬ | ৪:৪১ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রীসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য ‘পল্লী চিকিৎসক প্রশিক্ষণ’ চালুর বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বিষয়টি প্রথম দর্শনে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি পূরণের একটি সহজ সমাধান মনে হলেও, বাস্তবতা ভিন্ন এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক নতুন এমবিবিএস স্নাতকচিকিৎসক কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় আছেন। একদিকে দক্ষ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসকরা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না-অন্যদিকে সীমিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘পল্লী চিকিৎসক’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হলে তা একটি নীতিগত বৈপরীত্য সৃষ্টি করবে। এই অবস্থায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘গ্রাম ডাক্তার’ তৈরি করা মানে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আধুনিকতার পথ থেকে সরিয়ে পুরনো, অপ্রতুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়া।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এলএমএফ (LMF) কোর্স এবং পরবর্তীতে ডিএমএফ (DMF) চালু করা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষাপটেÑযখন দেশে মেডিকেল কলেজ ও এমবিবিএস চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ শুধু চিকিৎসকের সংখ্যা নয়, বরং সেবার গুণগত মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

এই প্রস্তাবের আরেকটি গভীর নৈতিক দিক রয়েছে, যা উপেক্ষা করা যায় না। সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী স্থানে বসে যখন ‘পল্লী চিকিৎসক’ তৈরির কথা বলা হয়, তখন তা একটি প্রশ্ন উত্থাপন করে-গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য কি আমরা একটি নিম্নমানের (হসাডপহগপ) স্বাস্থ্যসেবা মডেল স্থায়ী করতে চাই? বাস্তবতা হলো, যারা এই ধরনের নীতি প্রণয়ন করেন, তাদের নিজেদের ও পরিবারের চিকিৎসা সাধারণত দেশের বাইরে বা রাজধানীর উচ্চমানের বেসরকারি হাসপাতালে হয়ে থাকে। অর্থাৎ, নীতিনির্ধারণে একধরনের দ্বৈত মানদণ্ড (double standard) কাজ করছে-একদিকে সাধারণ মানুষের জন্য সীমিত ও কমমানের সেবা, অন্যদিকে নিজের জন্য সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা। এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘমেয়াদে গণমানুষকে প্রকৃত, বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করবেÑএ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
‘পল্লী চিকিৎসক প্রশিক্ষণ’ চালু হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে ভুল চিকিৎসা ও অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের হার উদ্বেগজনক। অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যদি স্বাধীনভাবে চিকিৎসা দিতে শুরু করেন, তবে নির্বিচারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন বৃদ্ধি পাবে, যার ফলে দেশে দ্রুতগতিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিস্তার লাভ করবে। এর ফলাফল হবে ভয়াবহ-সাধারণ সংক্রমণও তখন প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া, সীমিত জ্ঞানসম্পন্ন চিকিৎসা প্রদানকারীরা জটিল রোগ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন এবং যথাসময়ে রোগীকে রেফার করেন না। ফলে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোকের মতো রোগ দেরিতে ধরা পড়ে, চিকিৎসা জটিল হয় এবং মৃত্যুহার বাড়ে। এতে করে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
একজন এমবিবিএস চিকিৎসক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া উচিত। সরকার যদি সত্যিই গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে চায়, তবে প্রয়োজন- ১. নতুন করে ‘পল্লী চিকিৎসক’ তৈরি না করে বিদ্যমান এমবিবিএস চিকিৎসকদের গ্রামীণ পর্যায়ে কার্যকরভাবে নিয়োগ ও প্রণোদনা প্রদান। ২. ডিএমএফ/SACMO ব্যবস্থার সংস্কার এবং তাদের ভ‚মিকা স্পষ্টভাবে সীমাবদ্ধ করা (স্বতন্ত্র ‘ডাক্তার’ পরিচয় নয়, বরং সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে)। ৩. আন্তর্জাতিক মান অনুসারে প্যারামেডিক ও ইমার্জেন্সি মেডিকেল টেকনিশিয়ান (EMT) প্রশিক্ষণ চালু করা। ৪. একটি সমন্বিত জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস গড়ে তোলা, যেখানে প্রশিক্ষিত প্যারামেডিকরা প্রি-হাসপাতাল কেয়ার নিশ্চিত করবে। ৫. অননুমোদিত চিকিৎসা ও ভুয়া ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই সময়ে যদি আমরা আবারও স্বল্পমেয়াদি ও অদূরদর্শী সমাধানের দিকে ঝুঁকে পড়ি, তবে তা আমাদের অন্তত ৫০-১০০ বছর পিছিয়ে দেবে। উন্নত বিশ্ব যেখানে দক্ষ প্যারামেডিক, প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা এবং শক্তিশালী রেফারাল সিস্টেম গড়ে তুলছে, সেখানে আমাদের উচিত সেই পথ অনুসরণ করাÑনা যে অতীতের সীমাবদ্ধ মডেল পুনরুজ্জীবিত করা।
স্বাস্থ্যসেবা একটি দেশের মৌলিক অধিকার ও দায়িত্ব। তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেÑযেখানে প্রতিটি নাগরিক পাবে নিরাপদ, বৈজ্ঞানিক এবং মানসম্পন্ন চিকিৎসা।

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রæান্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন