চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪

সরকারি চাল খোলাবাজারে পাচার

কালোবাজারিদের দৌরাত্ম্য থামছে না

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

২১ মে, ২০২৩ | ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ

গত বছরের ২৮ জুন নগরীর চাক্তাই রাজাখালীর মোশাররফ হোসেন রোডে সরকারি খাদ্যবান্ধব চাল পাচারকালে আটক করে পুলিশ। খাদ্য বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছিল, মেসার্স বেলাল ট্রেডিংয়ের মালিক মো. বেলাল উদ্দিনের গুদামে খালাসের সময় পুলিশ তা আটক করে।

আটকের পর বলিরহাট পুলিশ ফাঁড়ির এসআই মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন। এতে ট্রাকচালক মো. কামরুল রানাকে (২৪) আসামি করা হয়। কিন্তু পুলিশ ও খাদ্য বিভাগের তদন্তে রহস্যজনক কারণে পাচারকারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

শুধু চাক্তাইয়ের রাজাখালী নয়, নগরীর পাহাড়তলী চাল বাজারের ফারুক ও বাহার মিয়ার গুদাম থেকে একাধিকবার খাদ্য বিভাগের চাল আটক করা হয়েছিল। তারপরও পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না। এরমধ্যেই গত মঙ্গলবার পাচারকালে এক ট্রাক চাল আটক করে পটিয়া থানা পুলিশ। ডিও ব্যবসার আড়ালে এভাবে প্রতিনিয়ত সরকারি খাদ্য বিভাগের চাল পাচার করা হচ্ছে খোলা বাজারে।

গুটিকয়েক লোভী-কালোবাজারির কারণে সরকারের বড় ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ খাদ্য পরিবহন ঠিকাদার সমিতির সভাপতি সৈয়দ মাহমুদুল হক। তিনি গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা ট্রাকে করে এক গুদাম থেকে অন্য গুদামে চাল পাঠাই। একই সময়ে একাধিক প্রোগ্রাম (চালের সূচি) থাকলে স্টাফ (প্রতিনিধি) যেতে পারে না। এ সুযোগে পাচারকারী চক্র ডিও ব্যবসার আড়ালে চাল পাচার করে দেয়। বিষয়টি আমি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি।

খাদ্য বিভাগ ও পুলিশ সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে পটিয়ার কচুয়াই ইউনিয়ন পরিষদের সামনে থেকে ১ ট্রাক চাল আটক করে থানা টহল পুলিশ।

পটিয়া থানা সূত্র জানায়, পাহাড়তলী চাল বাজারের ফারুক ট্রেডিংয়ের মালিক ওমর ফারুক নামে এক চাল ব্যবসায়ী থানায় এসে ডিও’র কাগজপত্র দেখিয়ে আটক করা চাল নিয়ে যান।

পটিয়া থানার ওসি প্রিটন সরকার পূর্বকোণকে বলেন, ‘এক ট্রাক চাল আটক করা হয়। পরে এক ব্যবসায়ী কাগজপত্র দেখান। তা ঠিক থাকায় চালগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, আটক করা চালের ট্রাকগুলো চট্টগ্রামের হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম থেকে খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি খাদ্য গুদামে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চালগুলো লোহাগাড়ার পদুয়া এলাকায় পাচার হয়।

চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম কায়ছার আলী গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘খাদ্য বিভাগের কাজ হলো, এক গুদাম থেকে অন্য গুদামে ইনভয়েস অনুযায়ী চাল প্রেরণ ও গ্রহণ করা হয়েছে কিনা তা দেখা। গুদাম থেকে ট্রাক বের হওয়ার পর পথে কী ঘটনা ঘটল তা আমাদের দেখা বা আটক করার ক্ষমতা নেই। এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ। অথবা যে সংস্থার ডিও প্রদান করা হয়েছে, সে সংস্থা যাচাই-বাছাই বা আটক করতে পারে।’ পটিয়ায় আটক করা চালগুলো হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদাম থেকে মানিকছড়ি যাওয়ার কথা ছিল।

খাগড়াছড়ি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের উদ্ধৃতি দিয়ে আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘মানিকছড়ি খাদ্য গুদামে ইনভয়েস মতে চাল পৌঁছেছে বলে খাদ্য কর্মকর্তা আমাকে নিশ্চিত করেছেন।’

৬ বছরেও দৌরাত্ম্য কমেনি : ২০১৭ সালে হালিশহর সিএসডি গুদাম থেকে চাল পাচারকালে বিপুল সংখ্যক চাল আটক করেছিল র‌্যাব। এসময় গুদাম ম্যানেজার প্রণয়ন চাকমা ও সহকারী ম্যানেজার ফখরুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এই ঘটনায় খাদ্য বিভাগের দুই কর্মকর্তা ছাড়াও পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী শাহাব উদ্দিন ও ট্রাকচালকসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

২০২০ সালের এপ্রিলে পাহাড়তলী বাজার থেকে ২১ বস্তা সরকারি ত্রাণের চাল আটক করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চাল ব্যবসায়ী মেসার্স ফারুক ট্রেডার্স থেকে তা উদ্ধার করা হয়েছিল। এছাড়াও ১৫শ খালি বস্তা ও ৯ হাজার চটের বস্তা উদ্ধার করা হয়।

২০২১ সালের ২১ এপ্রিল পাহাড়তলী বাজার থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সরকারি ৭০ হাজার কেজি চাল জব্দ করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয় চাল ব্যবসায়ী বাহার মিয়াকে। এ সময় বাহার মিয়ার গুদাম তল্লাশি করে প্রায় ২২শ বস্তা সরকারি সিল মারা চাল উদ্ধার করা হয়েছিল। এ চাল পাচারের নেপথ্যে ছিল পরিবহন ব্যবসায়ী খোকন কান্তি দাশ।

গত বছরের ২৮ জুন রাজাখালী সড়কে বেলাল ট্রেডিংয়ের মো. বেলাল উদ্দিনের গুদামে সরকারি খাদ্যবান্ধব চাল নামানোর সময় আটক করে পুলিশ। দেওয়ানহাট সিএসডি থেকে রাঙামাটি সদর এলএসডি গুদামে সরকারি ১৫ হাজার টন চাল পরিবহনের কথা ছিল। ৬ বছর ধরে এভাবে সরকারি চাল আটক করা হলেও অদৃশ্য কারণে আড়ালে থেকে যান এর পেছনের বাঘর-বোয়ালরা।

সর্ষের মধ্যে ভূত :
সরকারের খাদ্য অধিদপ্তর ও গুদাম কর্মকর্তাদের যোগসাজশে চাল পাচার বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একাধিক পরিবহন ঠিকাদার ও চাল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিও কেনেন কালোবাজারিরা। তিন পার্বত্য জেলা, কক্সবাজার ও জেলার বিভিন্ন প্রকল্পের ডিও মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে চাক্তাইয়ের দুই ভাই ও পাহাড়তলী বাজারের পাঁচ ব্যবসায়ী কিনে নেন।
দেওয়ানহাট ও হালিশহর খাদ্য গুদাম থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি চাল পরিবহন করা হয়। পরে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও গুদাম কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ডিও’র বিপরীতে খাদ্যবান্ধব চাল বস্তা পাল্টে পাচার হয় খোলাবাজারে। কেন্দ্রীয় এ দুটি গুদামই হচ্ছে চাল পাচার, দুর্নীতি ও অনিয়মের আঁতুরঘর।

পূর্বকোণ/এ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট