চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৪ মে, ২০১৯ | ১:৫২ অপরাহ্ণ

ড. মোহীত উল আলম

ঈদ আসুক বাংলাদেশকে আলো করে

ঈদ আসুক
বাংলাদেশকে আলো করে
ড. মোহীত উল আলম
ঈদ সব সময় তিনটি। উচ্চবিত্তদের জন্য একটি, মধ্যবিত্তদের জন্য একটি, আর নিম্নবিত্তদের জন্য একটি। ইসলাম ধর্মের শুরু থেকে অর্থনৈতিক এ বিভাজন না থাকলে জাকাত, ফিৎরা ইত্যাদি দাতব্য সেবার সৃষ্টি হতো না। বিশ্ব আঙ্গিকেও ঈদ তিনটি। ধনী দেশগুলোর জন্য একটি, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য একটি, আর গরিব দেশগুলোর জন্য আরেকটি।
এ রোজার সময় মেসেঞ্জার নামক ডিভাইসটির প্রচুর ব্যবহার হয়েছে। যে যা পেরেছে ফান মেইল আর ভিডিও পাঠিয়ে বন্ধু বন্ধুদের মনোরঞ্জনের জন্য অকাতরে একে অপরকে ট্যাগ করেছে। খানিকটা যেন রোজার উপবাসের ক্লান্তিমোচনের জন্য। এর মধ্যে একটা পেলাম সৌদি আরবের শেখদের ইফতার করার একটি ভিডিও। একটা হল ঘরে বিরাট আয়োজন। প্রতিটা টেবিলে বিরাট বিরাট আরবদেশীয় দুম্বার রোস্ট এভারেস্টের আকার নিয়ে বসে আছে, আর তার চারপাশে চেয়ারে ঘিরে বসে আছে সৌদিরা, যারা হাত দিয়ে খুবলে খুবলে ঐ দুম্বাগুলোর গা থেকে মাংস চিড়ে বের করছে আর খাচ্ছে। মনে মনে বললাম, আলহামদুলিল্লাহ্। ঠিক তার পাশে আরেকটা ভিডিও, বাংলাদেশের কোন একটা শহরের বস্তির মধ্যে ইফতার উদযাপনের দৃশ্য: একটি থালায় কিছু মুড়ি আর ছোলাভাজি, আর তা থেকে খুবলে খুবলে খাচ্ছে ধরেন দশ-বিশটা হাত। মনে মনে বললাম, সোবহানাল্লাহ্। এ ভিডিও যুগল ইসলামী জগতের অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি আঙুল-নির্দেশকারী ছবি। পরিষ্কারভাবে এ ভিডিওযুগলের বাস্তব প্রতিফলন ঈদের দিনেও দেখা যাবে। কিন্তু এ অর্থনৈতিক পার্থক্য নিয়ে আসলে কিছুই করার নেই, এভাবে চলেছিল, এভাবেই চলছে, এবং এভাবেই চলবে।
তবে ঈদ উদযাপনের জন্য সারা রোজার মাস ধরে যে ব্যস্ততা তার আবার শ্রেণিবিন্যাস হেতু রকমফের আছে। ইংরেজ কবি জন ডানের একটি কবিতায় আছে যে প্রকৃতিতে যে সব ছোটখাটো দুর্যোগ সেগুলি চোখে দেখা যায়, কিন্তু যেগুলি বড় মাপের পরিবর্তন যেমন গ্রহ-নক্ষত্রের চলাফেরা সেগুলি চোখে দেখে বোঝা যায় না। কথার কথা, যেমন, কাল-বৈশাখি চোখে দেখা যায়, কিন্তু ভূমিকম্প চোখে দেখা যায় না। বা পৃথিবীর মেয়ে চাঁদের অভিযাত্রা হয়তো খালি চোখেও খেয়াল করা যায়, কিন্তু সম্রাট সূর্যের গতি বুঝতে পারা যায় না। ঠিক সেরকম ঈদ উদ্যাপনকে যদি মাছের সঙ্গে তুলনা করি তা হলে পুঁটি মাছ যতটা বুদবুদ তোলে, রুই, কাতাল অতটা ঘাই মারে না। সে ভাবে ঈদ উদ্যাপনের বেলায় দৃশ্যমানভাবে সবচেয়ে বেশি জঙ্গম, অস্থির, উত্তেজিত, হতাশ, খুশি-এসব নিয়ে যে সম্প্রদায় জড়িত, তারা সমাজের অর্থনৈতিকভাবে নিম্নবিত্ত শ্রেণি। তার চেয়ে আরেকটু কম ব্যস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, আরো কম ব্যস্ত হলো উচ্চবিত্ত শ্রেণি। বরঞ্চ বলা ভালো শেষের শ্রেণির লোকদের সারাবছরেই প্রায় ঈদের পরিতৃপ্তি থাকে বিধায় রোজার মাসে ঈদের ব্যস্ততা নিয়ে তাদের আলাদা কোন চিত্ত-চাঞ্চল্য থাকে না।
গরিবের ঈদ উদ্যাপনের শানেনজুল হলো সাধ এবং সাধ্যের মধ্যে এক প্রচন্ড-রক্তারক্তি লড়াইয়ের কাহিনী। বঞ্চনা, বঞ্চনা মেটানোর পরিতৃপ্তি, কিংবা না মেটানোর অতৃপ্তি-এগুলি নিয়ে গল্প, উপন্যাস কম রচিত হয় নি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে-গরিবের ঈদ পালন এখনো মহাকাব্যিক শোকগাঁথা রচনার উপজীব্য হতে পারে। এ ছাড়া আছে মর্মন্তুদ ঘটনাগুলো। হয়তো শ্রমিক তার বেতন আর বোনাস নিয়ে রাত্রে ঘরে ফিরছেন, পথিমধ্যে হাইজ্যাকারের হাতে খুন হয়ে গেলেন। হয়তো এক নিম্নবিত্ত কেরানি সৎ জীবন-যাপনকারীর ঘরে আন্ডাপান্ডা শিশুর সংখ্যা ভারি, ছোট মেয়ে দু’টোর জন্য কোনভাবে নতুন জামা কিনতে পারছেন, বাকি বড় দু’টোর জন্য তার কেনার সংগতি নেই। তখন সেই পিতা (বা ঘরে উদ্বেগাকুল চিত্তে অপেক্ষমানা স্ত্রী) যে কী করবেন মাথা ফাটিয়েও বের করতে পারেন না। আবার হয়তো বাবা বের হয়েছেন বাজারে, ছোট্ট মেয়েটি আবদার করেছিল একটা লাল জামার জন্য, বাবা সেটি দামের জন্য কিনতেই পারলেন না। তখন হয়তো পুরোনো কাপড়ের দোকান থেকে পুরোনো একটা লাল জামা কিনে মেয়ের চোখ ভজালেন। রাত্রে স্বামী-স্ত্রী এ নিয়ে হাপুস-হুপুস নিজেদের মধ্যে কাঁদলেন। ঈদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতার উদ্ভব হয় প্রতিবেশি-প্রতিবেশিতে, কিংবা আত্মীয়ে-আত্মীয়ে যে মর্যাদার লড়াই, সেটিও নিম্নবিত্ত (এমন কি মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকেও) দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ‘বাবা, পাশের বাসার ছন্দা আপুরা সবাই নতুন জামা কিনেছে, আমরা পাব না’- শিশু বলে বাবাকে। তখন বাবা (এবং মা)-র মনে হয় এ ঈদটা না এলেই ভালো হতো। মধ্যবিত্তদের ক্ষেত্রে এ প্রতিযোগিতা একটু ভিন্নভাবে হলেও চরিত্র একই। গরিব পরিবারগুলিতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসাবাসির পরিমাণ কোন অংশে কম না হলেও অধিক সংখ্যক শিশুর কোলাহল, ঘর ছোট, এবং স্বামী-স্ত্রীর জন্য প্রায়শই আলাদা শোবার ঘর না থাকাতে এখানে ভালোবাসাটা প্রায়শই বিগ্রহতে পরিণত হয়, এবং অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে হতাশা থেকে দু’জনেরই মুখের বুলি গালিতে, হাতের নখ-নখরে এবং পুরুষের পা ধাবিত হয় স্ত্রীর মাঝ পেট বরাবর। তখন ঈদ আনন্দের জায়গা দখল করে নেয় দাম্পত্য সন্ত্রাস। আমি ছোটবেলায় বেড়ে উঠেছি কাজীর দেউড়িতে। তখন সেখানে প্রচুর নি¤œবিত্তের লোক বাস করত। ঈদ এলে এসব অধিবাসীর ঘরে ঘরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কুরুক্ষেত্র ঘর থেকে বেরিয়ে গলিতে ছড়িয়ে পড়ত। রিকশাওয়ালা স্বামী তার অন্তঃসত্ত্বা বৌকে পেট বরাবর লাথি মারছে এটা আমার স্মৃতির ক্যামেরায় স্থির চিত্র হয়ে গেঁথে আছে। আরেকবার এক ইটের শ্রমিকের বৌ-এর সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে না পেরে নিজের মাথায় ইট মেরে আঘাত করা দেখে আমার শিশু বয়সের অনেক রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছিল।
কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারে ঠিক সে টানাপড়েন নেই, সে জন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসাবাসিটাও বেশি। কিন্তু এটা আরো বড় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। ‘পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি বড় মেয়ের জন্য একটি গলার হার কিনেছে না, তো আমাদের টুসকিওতো সমান বয়সের, আর একই কলেজে পড়ে, কেমন লাগবে না দেখতে! আমরা কি মেয়েকে কম দেখতে পারি?’ বৌএর কথা শুনে স্বামী বৌ-এর গা থেকে আগ্রহভরা হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলবেন, কী করতে বল, আমারতো টাকা নেই, আমিতো ঘুষ খাই না, চুরিও করি না।’ বৌ রিভার্স মোডে চলে গেলেন। অর্থাৎ সরাসরি ঘায়েল না করে আড়াল থেকে ঘায়েল করার কৌশল প্রয়োগ করলেন। তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত হয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, আর কী করা যাবে?’ কিন্তু স্বামীর মনে মন-ঘুরানি শুরু হলো, তার আদরের স্ত্রী, নিজের জন্যতো চায়নি, মেয়ের জন্য চেয়েছে। স্ত্রীও জানেন যে এই দাওয়াইয়ে কাজ দেবে। ঘুমের ভাণ করে পড়ে থাকলেন। বিশ মিনিট যেতে না যেতেই স্বামী বৌএর গালে ঠোনা মেরে বললেন, ‘এই শোন, নতুন একটা ক্রেডিট কার্ড পেয়েছি। ঐটা পাঞ্চ করব। তোমার মেয়ের জন্যও একটা হার হবে, তোমার জন্যও একটা হার হবে।’ স্ত্রী কপট রাগ দেখিয়ে বলবেন, ‘না বাবা, ঐ ক্রেডিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড আর করিও নাতো, মাসের বেতনই থাকবে না। আর আমার জন্য কি দরকার, তোমার মেয়েকে দিতে চাচ্ছো, দাও।’ কিন্তু মনে মনে তিনি খুশি, নিজের শরীরে আলতো হাত বুলিয়ে তিনি নিজেকে থ্যাংক্যু দিলেন এ জন্য যে এ বয়সেও স্বামীকে চোখ কানা করে রাখতে পেরেছেন।
স্ত্রী পরিচালিত এ রিভার্স মোডের ব্যবসায়িক নাম হচ্ছে, ‘বাই ওয়ান, গেট ওয়ান ফ্রি।’ আর এ পদ্ধতির বিরাট গ্রাহক হচ্ছে বড়লোকেরা। কারণ এদের কাছে কোন টাকাই টাকা না। গরিবদের ক্ষেত্রে ঈদ হলো সে উপলক্ষ্য যখন তারা সংসারের আশু কিছু প্রয়োজন অল্প টাকার ভিতরে মেটাতে সচেষ্ট হয়। আর মধ্যবিত্তদের জন্য ঈদ হলো সংসারের কিছু জিনিষ স্থায়ীভাবে সংগ্রহ করার উপলক্ষ্য-যেমন একটা ফ্রিজ, আর ফ্রিজ এর মধ্যে যোগাড় হয়ে গেলে একটা ডিপ ফ্রিজ (এখন জানিয়ে রাখি, গতকাল, ৭ জুন, ঘোষিত বাজেটে ফ্রিজের দাম কমানো হয়েছে), কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে গাড়ি (এ বাজেটে গাড়ির দাম বেড়েছে) ইত্যাদি। কিন্তু বড়লোকদের ক্ষেত্রে পুরো ঈদের বাজারটাই হচ্ছে ফাউ। না করলেও হয়। তখন তারা শুধু বিদেশ ঘোরার প্ল্যান নেয়, যেখানে ‘বাই ওয়ান, গেট ওয়ান ফ্রি’ প্র্যাকটিসটা খুবই কার্যকর।
প্রতিযোগিতাটা হয় এভাবে: এক বাড়ির পুরো পরিবার ঈদের সময় অস্ট্রেলিয়া গেল তো, পাশের বাড়ির পুরো পরিবার নিদেন পক্ষে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া যাবেই।
ধর্মীয়ভাবে ঈদ মুসলিম জাহানের জন্য ধনী-গরিব নির্বিশেষে অবশ্য পালনীয় একটি সম্প্রীতিমূলক আচারানুষ্ঠান হলেও, সামাজিকভাবে-বিশেষ করে আমাদের সমাজে—ঈদ অর্থনৈতিক চেহারার ব্যারোমিটারও বটে।
অন্য একটা দিক থেকে ঈদ সামাজিক এবং পারিবারিক ইতিহাসের এলবামের মতো। ইচ্ছে করলে যে কোন পরিবার তাদের সংরক্ষিত এলবামে গত দুই যুগের ঈদের ছবি মেলালে দেখতে পারবে কী ছিল, কী হয়েছে, কী ছিল না, কী হলো না, এ পর্যায়গুলো যেমন দেখতে পারবে, তেমনি কারা ছিল, কারা চলে গেল, কারা এল, সব ধারণ করা থাকতে পারে ঈদ এলবামগুলোতে। এখন স্মার্ট ফোন আর ফেইসবুকের যুগÑএন্তার ছবিতে সবার মোবাইলের পেট ফুলে উঠবে (যদিও জানিয়ে রাখি যে এবার বাজেটে প্রযুক্তি নির্ভর সেবার ওপর ট্যাক্স বেড়েছে। এমনকি উবার-পাঠাও কল করতে গেলেও বর্ধিত ট্যাক্স দিতে হবে।)
অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের গোত্রীভুক্ত হবার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশের গরিবেরা আসলে আর আগের মতো গরিব নেই, মধ্যবিত্তরাও শক্তিশালী ভোগী গোত্রে পরিণত হয়েছে, আর এবারের বাজেট নাকি উচ্চবিত্তদের দিকে সুনজর দিয়েছেÑফলে সবার লক্ষ্য এখন হতে পারে উচ্চবিত্তে পরিণত হওয়ার। সেদিক থেকে গোটা দেশে একটা স্বচ্ছলতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেটা চোখে দেখা যায়। সে জন্য মাদক-জাত পরিস্থিতি ও যোগাযোগ উন্নয়নের কাজ চলাতে যোগাযোগের সাময়িক অসুবিধা ছাড়া এবারের রোজা এ পর্যন্ত শান্তভাবেই কেটেছে। আশা করি ঈদ পর্যন্ত তাই থাকবে। সামাজিক মানুষ সব কিছুর উপরে জানমালের নিরাপত্তাকে মূল্য দেয়।
অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লে আনন্দের বহরও প্রলম্বিত হয়। খুব ছোটবেলায় ঈদ ছিল মনে হতো এক দিনের। পরে পরে বড় হতে শুনলাম ঈদ আসলে তিন দিনের। এক মাস রোজা রাখার পর এক দিনের ঈদে মোটেও মন ভরতো না। তিনদিনটা ঠিক মনে হতো। আবার ডিজিট্যাল যুগে টিভি চ্যানেলগুলো দেখলাম ঈদকে পাঁচ দিন, পাঁচ দিন থেকে সাত দিন, আর এবার কোন একটা চ্যানেলে দেখলাম ঈদের অনুষ্ঠান বর্ধিত হয়ে চলে গেছে এগারতম দিনে। অনেকটা ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফি’্রর মতো।
ঈদ যেমন ব্যবসার দিক থেকে বহু উদ্যমী প্রকল্পের সূতিকাগার, তেমনি সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়।
এবারের সব জাতীয় পত্রিকাগুলোর ঈদ সংখ্যা ৫১২ পৃষ্ঠার ঢাউশ ভ্যল্যুম। এন্তার গল্প-উপন্যাস-কবিতা-ভ্রমণকাহিনীতে ভরে আছে এগুলো। কিনবেন আর পড়বেন। বাংলাদেশ সৃজনশীল দেশ হলেই না সবদিক থেকে উন্নতি লাভ করবে।
সবার প্রতি পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা।

The Post Viewed By: 301 People

সম্পর্কিত পোস্ট