চট্টগ্রাম রবিবার, ২৬ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

বাংলাদেশে বায়ুদূষণ এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য

অধ্যাপক ড. নারায়ণ বৈদ্য

১৩ মে, ২০১৯ | ১:২৩ পূর্বাহ্ণ

লেখক : ট্রেজারার বিজিসি ট্রাষ্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
মাছ যেমন পানির মধ্যে ডুবে থাকে তেমনি মানুষ বিশাল বায়ুম-লের মধ্যে ডুবে আছে। মাছ পানির মধ্যে ডুবে থেকে দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে পারে। তেমনি মানুষও বায়ুম-লের মধ্য ডুবে থেকে নিত্যনৈমিত্তিক জীবন প্রবাহ চালাতে পারে। পানিতে ডুবে থেকে মাছের জীবনচক্র পরিচালনা করার জন্য যে সব উপাদানের প্রয়োজন হয় সব উপাদান পানিতে আছে। এ কারণে পানিতে বংশ বৃদ্ধি করতে মাছ তথা জলজ প্রাণীর কোন অসুবিধা হয় না। অবশ্য বিশে^ এমন কিছু সাগর বা জলরাশি আছে যেখানে জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার সকল উপাদান থাকে না। ফলে এসব জলরাশির মধ্যে জলজ প্রাণী থাকে না। যেমন- ‘ডেড সি’ নামক জলরাশিতে কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নেই।
মানুষ যে বায়ুম-লের মধ্যে ডুবে আছে, এই বায়ুম-লের বৈশিষ্ট্য এরূপ যে, বায়ুম-লের মধ্যে মিশে আছে বিভিন্ন বায়ুর সংমিশ্রণ। যেমন- অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, জলকণা, ধুলিকণা ইত্যাদি। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী বাঁচার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র এক চতুর্থাংশ। ভূপৃষ্ঠের প্রাণীগুলো অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। এভাবে ক্রমাগত মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী দ্বারা অক্সিজেন গ্রহণ করার কারণে বায়ুম-লে অক্সিজেন যেদিন নিঃশেষ হয়ে যাবে সেদিন বিশেষ করে মনুষ্য নামক প্রাণীটি আর বাঁচার সম্ভাবনা থাকবে না।
সেইদিনটি দ্রুত চলে আসতো যদি বৃক্ষ নামক বস্তুটি পৃথিবীতে না থাকতো। প্রকৃতির কী অদ্ভুত নিয়ম। মানুষ শ^াস-প্রশ^াসের ভেতর দিয়ে যে দূষিত বায়ু ছাড়ে তা বৃক্ষরাজি গ্রহণ করে বায়ুকে বিশুদ্ধ রাখে। তাছাড়া, বৃক্ষরাজি বায়ুম-লে অক্সিজেন ত্যাগ করে বায়ুম-লকে মানুষ বসবাসের উপযোগী করে রাখে। প্রকৃতির এরূপ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির ব্যাঘাত ঘটায় মানুষ। মানুষ যখন বৃক্ষরাজিকে ধ্বংস করে তখন এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাধাপ্রাপ্ত হয়। বায়ুম-ল হয়ে পড়ে দূষিত। শুধু তাই নয়। মানুষ, কল কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া, ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া, এসি মেশিন থেকে নির্গত বায়ু, বডি স্প্রে থেকে নির্গত বায়ু দ্বারা সামগ্রিক বায়ুম-লকে দূষিত করছে।
বিশ^জুড়ে বায়ুদূষণের কারণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে রয়েছে। শুধু শহরাঞ্চলে নয়, সারা দেশের শতভাগ মানুষ বাস করছে দূষিত বায়ুর মধ্যে। বাংলাদেশ ছাড়া বিশে^র আরো চারটি দেশ রয়েছে, যে দেশগুলোর জনগণ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে। এই চারটি দেশ হয়- চীন, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে যে, ২০১৭ সালে বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে অন্তত এক লাখ ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বায়ুতে মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর ক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম-২.৫ (পার্টিকুলেট ম্যাটার-২.৫) ও পিএম-১০-এর পরিমাণ মেপে বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়। বাতাসে পিএম-২.৫ এর পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর অবস্থান হয় দক্ষিণ এশিয়ায়। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মাত্রা অনুযায়ী ২০১৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি দূষিত বায়ু ছিল নেপালে। আর, সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর বায়ু ছিল ভূটানে। বিশ^ব্যাপী বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘দ্যা স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার-২০১৯ (এসওজিএ)’ এর প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়। এসব তথ্য যৌথভাবে তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব কলাম্বিয়া, টেক্সাস বিশ^বিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিক্স এন্ড ইভ্যালুয়েশন ও হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট । প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করছে তার মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও আছে চীন, পাকিস্তান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন বায়ুদূষণ জনিত কারণে মারা গেছে। সড়ক দুর্ঘটনা বা ধূমপানের কারণে মৃত্যুর হারের চেয়ে পরিবেশ দূষণে মৃত্যুর হার বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ারভিজ্যুয়ালের ‘বিশ^ বাতাসের মান প্রতিবেদন ২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বিশে^ সবচেয়ে বায়ুদূষণের কবলে থাকা শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা শহরের অবস্থান ১৭তম। আর, রাজধানী শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান হয় দ্বিতীয়। ঢাকা শহরের বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম-২.৫) পরিমাণ বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বেঁধে দেয়া মাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। বায়ুদূষণের কারণে মানুষের রোগ-ব্যাধি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বায়ুদূষণ দ্বারা মানুষের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। কারণ, দূষিত বায়ুতে ধুলিকণার মিশ্রণ থাকার কারণে মানুষের চোখ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে। ফলে ছোট শিশুরাও চোখের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আজকাল শিশুদের স্কুলে গেলে এই সত্য উপলব্ধি করা যায়। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়ার কারণে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যারও সৃষ্টি হচ্ছে। পিতামাতারা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছে।
তাছাড়া, বায়ুদূষণের কারণে হৃদরোগ, শ^াসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রামণ ও ক্যান্সারের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে। বায়ুদূষণের জন্য যে সব বিষয় সবচেয়ে বেশি দায়ী সেইসব বিষয় হচ্ছে ইটভাটা, শিল্প কারখানা এবং নির্বিচারে গাছ কাটা। গ্রামাঞ্চলে যেখানে সেখানে ইটভাটা নির্মাণ করে মুনাফালোভীরা ইট উৎপাদন করছে। এই ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া মা ও শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে বেশি। শুধু তাই নয়, কৃষি পণ্য উৎপাদনেরও ক্ষতি করছে। গাড়ী থেকে নির্গত ধোঁয়া বাতাসে সীসার পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক কথায় বলা যায়, বাংলাদেশ হয়ে উঠছে বসবাসের অনুপোযোগী।
বিশ^জুড়ে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বর্তমান সময়ে জন্ম নেয়া শিশুদের গড় আয়ু ২০ মাস কমবে। বাংলাদেশের বায়ুর মান বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুর মান থেকে অনেক নীচে। সংস্থাটির বেঁধে দেয়া সীমার মধ্যে বায়ুমান ধরে রাখতে পারলে যে দেশগুলো লাভবান হবে তার মধ্যে সবার ওপরে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু তখন বাড়বে ১ দশমিক ৩ বছর। ভারত, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ায় গড় আয়ু এক বছর করে বাড়বে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট