চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

বাল্যবিবাহ ও আমাদের দায়বদ্ধতা

১০ মে, ২০১৯ | ১:১৫ পূর্বাহ্ণ

আজকের নির্বাচিত চিঠি

বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। যুগে যুগে সামাজিক কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়ে এসেছে কিন্তু সেই সাথে সামাজিক অবক্ষয়ের পরিমাণ কোনো অংশে কম নয়। বাল্যবিবাহ দুই-চারদিন আলোচনা করে থেমে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয় বরং এটি একটি চলমান সমস্যা যে ক্ষেত্রে শুধু আইন প্রণয়ন নয় প্রয়োজন আইন প্রয়োগের কঠোর নজরদারী। তুলনামূলকভাবে গ্রামের এর বিস্তৃৃত চর্চা রয়েছে। দুঃখজনক বিষয় যে গ্রামে গ্রামে বাল্যবিবাহচর্চা রোধে স্থায়ী কোনো সমাধান বের করা আজও সম্ভব হয়নি। কিছু কিছু জেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হলেও লোকচক্ষুর অন্তরালে এর মতো প্রভাব বিস্তারকারী সমস্যা দিনদিন বেড়েই চলছে। যেসব ছেলেমেয়েদের স্কুলজীবনের প্রথম হাতেখড়ি দিয়েছিলাম কিংবা হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতাম তাদের বেশিরভাগ এখন দুই-তিনজন সন্তানের বাবা-মা। বিগত তিন বছরে আমার প্রতিবেশী ও নিকট আত্মীয়দের মধ্যে প্রায় ১০৭ জনের বেশি ছেলেমেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। বিয়ে একটি ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি, অথচ বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া ছেলেমেয়েরা সেই জ্ঞানটুকু অর্জনের আগেই পারিবারিক চাপে পরাজিত হচ্ছে। নিজে কি হারাচ্ছে, পরিবার কি বলি দিচ্ছে কিংবা জাতিগণভাবে এই ঝরে যাওয়া ছেলেমেয়েদের থেকে কি পেতে পারত সে হিসেব অসমাপ্তই থেকে যায়। নানা ক্ষতিকর দিক থাকার পরেও বাল্যবিবাহের চর্চা আজও সমাজে থেকে গেছে। সামাজিক নিরাপত্তার ভয়ে বাবা-মা সন্তানকে নিয়ে আতঙ্কে থাকার সমাধান খুঁজে নেন বাল্যবিবাহের মাধ্যমে। অতি-আধুনিকতার ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে সহজ সমাধান খোঁজেন বিবাহের মতো সামাজিকতার মধ্যে।
পারিবারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাল্যবিবাহের শিকার জীবনগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুখের হয় না। অপরিণত বয়সে সন্তান জন্ম দিতে যাওয়া মায়ের কিংবা নবজাতকের মৃত্যুর সংখ্যা কম নয় একই সঙ্গে বাল্যবিধবা ও বিবাহবিচ্ছেদ প্রাপ্তদের সংখ্যা সমাজে অগণিত। তাছাড়া বেশির ভাগ বাল্যবিবাহের পরিণতি খুবই খারাপ যা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে শুধু ক্ষতিরই কারণ হয়। কিছু কিছু বাল্যবিবাহ পরবর্তিতে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হয়ে থাকে যার প্রভাবে ওই সব ছেলেমেয়ে ও তাদের জড়িয়ে থাকা পরিবারকে মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত করে থাকে। কখনো কখনো এর প্রভাব আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়ে থাকে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে যুগে যুগে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে গা বাঁচিয়ে চলা আমাদের খারাপ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে যতদিন না সামাজিক সমস্যাগুলোকে গুরুত্ববহ করে উপস্থাপন, জনসাধারণকে সচেতন করা, প্রচার প্রচারণার উদ্যোগ গ্রহণ ও সমাজের সর্বস্তরের জনগণ সবাই একযোগে চেষ্টা করা হবে, ততদিন বাল্যবিবাহের জাঁতাকলে অচিরে ঝরে যাবে হাজারো প্রাণ। দায় সামাজিক নয়, ব্যক্তিগত ভেবে নিজ নিজ স্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। মনে রাখার বিষয় যে, সমাজ আপনা আপনি তৈরি হয়নি, সমাজ কিংবা সামাজিকতা সমাজে বসবাসরত সভ্য মানুষের সৃষ্টি। একইভাবে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি করার দায়িত্বে সেই সভ্য সামাজিক মানুষই রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে মানব সৃষ্ট সামাজিক সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ সচেতন মানুষের খুঁজে বের করা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে। যেখানে যে অবস্থায় বাল্যবিবাহের সংবাদ পাওয়া যায় তা বৈধ উপায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা একান্ত প্রয়োজন। বিভিন্ন এনজিও’র উদ্যোগে নেয়া ‘বাল্যবিবাহ রোধ’ কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো প্রয়োজন। সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের সংখ্যা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিতে রাখতে হবে বিশেষ নজরদারী।

মুক্তা আক্তার
শিক্ষার্থী।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট