চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৪ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১:০৯ অপরাহ্ণ

গ্রাহক পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি

শেষপর্যন্ত গ্রাহকপর্যায়েও আরেক দফা বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম। এবার বিদ্যুতের খুচরা দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এবার প্রথমবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) পাশ কাটিয়ে সরকারের নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলো। গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিদ্যুতের নতুন দর চলতি মাস থেকেই কার্যকর হবে।

 

একইসঙ্গে এখন থেকে প্রতিমাসে বিদ্যুতের খুচরা দাম নিয়মিত সমন্বয় করা হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভর্তুকি সমন্বয় করতে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে কোভিড-১৯ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা তছনছ হয়ে যাওয়া এবং অতি মূল্যস্ফীতি ও আয় কমে দরিদ্র মানুষের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়ার এই চরম দুঃসময়ে গ্রাহকপর্যায়ে আরও একবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতোটা যৌক্তিক তা ব্যাপক প্রশ্নসাপেক্ষ।

 

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির এমন সিদ্ধান্ত চলমান দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনে ‘মড়ার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়েই দেখা দেবে। কারণ বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে জীবনযাত্রার সবক্ষেত্রেই বিরূপ প্রভাব পড়বে, মূল্যস্ফীতিকে আরো উস্কে দেবে। সংগতকারণে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অনভিপ্রেত।

 

উল্লেখ্য, গতবছর নভেম্বরে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়ায় এ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এটি ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়। তাই ডিসেম্বর থেকেই খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়াতে বিইআরসির কাছে আবেদন করে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা। চলতি মাসের ৮ জানুয়ারি এসব আবেদন নিয়ে শুনানি করে বিইআরসি। এরপর ১৫ জানুয়ারির মধ্যে মতামত জানাতে বলা হয়। তার ভিত্তিতে নতুন দাম ঘোষণা করার কথা বিইআরসির। তবে সরকার ওই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে নির্বাহী আদেশে আগেই দাম বাড়িয়ে দিলো বিদ্যুতের।

 

প্রসঙ্গত, আইন সংশোধন করে গত ১ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন), অধ্যাদেশ, ২০২২’ গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। এর মধ্যদিয়ে বিশেষ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সরাসরি বাড়াতে বা কমাতে পারবে সরকার। গত ৯ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে এমন বিধান যুক্ত করা হয়।

 

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন) আইন-২০২৩ এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ। পূর্ণাঙ্গভাবে এটি সংসদে পাস হলে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার চাইলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম পুনঃনির্ধারণ বা সমন্বয় করতে পারবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পাশাপাশি সরকার নিজেও এগুলোর দাম বাড়াতে-কমাতে পারবে।

 

তবে বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের দেশে কোনো কিছুর সমন্বয় মানেই হলো বাড়ানো, সমন্বয় করে কমানোর রেকর্ড খুবই কম। যখন কমানোর প্রয়োজন হয় তখন আর সমন্বয় করা হয় না। আবার বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বা জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবক্ষেত্রেই এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সবকিছুরই দাম বেড়ে যায়। আবার দাম কমলে কোথাও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না। গুটিকয় ব্যক্তি ও সংস্থা এর ফায়দা লুটে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে টিকে থাকার যুদ্ধ করছে। এর মধ্যে গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়লে জীবনযাত্রায় এর কঠোর প্রভাব পড়বে। এমনিতে সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। বেশির ভাগ সূচকই নিম্নগামী। বিশ্ব অর্থনীতিও মন্দার আশঙ্কায়। কমে যাচ্ছে সামগ্রিক চাহিদা। এরকম একসময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কতটা সময়োপযোগী, এ নিয়েও এন্তার প্রশ্ন আছে।

 

কনজিউমার এসোসিয়শন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সরকার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে এবং জনগণের কষ্ট বাড়াচ্ছে। নজরদারী এবং কঠোর পদক্ষেপের অভাবে এমনিতেই বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায়। এবার তাদের হাতে আরেকটি অজুহাত তুলে দেয়া হলো। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে আবারও প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়বে। বিদ্যুৎবিল বাড়ানোর ফলে জীনবযাত্রার ব্যয় বহুগুণে বেড়ে যাবে।

 

এতে স্বল্পআয়ের চাকরিজীবীসহ সাধারণ মানুষদের পক্ষে পরিবার নিয়ে জীবন অতিবাহিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সবগুলো পণ্য ও সেবার দাম এমনিতেই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। চালের দাম বাড়ানো হয়েছে কয়েক দফা। বেড়েছে চিনি, ভোজ্যতেল, ডাল, পেঁয়াজ ও রসুনের দাম। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও বেড়ে চলছে। এখন আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। সব মিলিয়ে মধ্যম ও নিম্ন-আয়ের মানুষ যখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখনই আরেক দফা বিদ্যুতের দাম বাড়াল সরকার। এতে সাধারণ মানুষের কষ্টের পরিধি আরো বাড়বে, সন্দেহ নেই।

 

কৃষি, শিল্পোৎপাদন, শিক্ষা, চিকিৎসা, উপাসনাসহ জীবনের সাথে সম্পর্কিত সবক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ ওৎপ্রোতভাবে যুক্ত। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বিদ্যুতের চাহিদানুপাতে উৎপাদন এবং যুক্তিসঙ্গত দামে বিতরণের বিকল্প নেই। কিন্তু লোকসান কমাতে অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের পরিবর্তে বার বার অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির দিকে হাঁটলে নাগরিক জীবন এবং টেকসই জাতীয় অগ্রগতিতে এর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সংগতকারণে সবদিক পর্যালোচনায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা দরকার। আমরা মনে করি সমন্বয়ের নামে বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে সিস্টেমলস ও চোরাই সংযোগ বন্ধ করা এবং অনিয়ম-দুর্নীতির লাগাম টানাই শ্রেয়।

পূর্বকোণ/আরএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট