চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

১২ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

মুহুরী নদীর কোলে চিরজাগরূক মহীরূহ- ইঞ্জি. মোশাররফ হোসেন

সবুজ মণ্ডল

 

মাকড়সার জালের মতো জড়াজড়ি করে ফেনী আর মুহুরী নদী লক্ষ-সহস্র একর পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত শরীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে, মাথা ঠোকে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেলের কোলে। এই সন্দ্বীপ চ্যানেলেরই ঠিক উল্টোদিকে সব বাঁধা পেরিয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে আকাশে উঁকি দিয়ে জানান দেয় সুবিশাল-বিস্তৃত পর্বতমালা।
ঘন সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া পাহাড়-টিলা-ফসলি জমি আর বঙ্গোপসাগরের অবাধ্য জলরাশির মাঝখানে একবুক ইতিহাস নিয়ে কাল নিরবধি সাক্ষী হয়ে থাকা মিরসরাইয়ের ধুম গ্রামে ১৯৪৩ সালের ১২ জানুয়ারি জন্ম নেন রাজনীতির বরপুত্র মোশাররফ হোসেন। দীর্ঘ ২০ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে থাকা ফজলুর রহমান ছিলেন মোশাররফ হোসেনের পিতামহ।

ফজলুর রহমানের ৬ সন্তানের মধ্যে আলহাজ্ব ছৈয়দুর রহমান (এস. রহমান) ছিলেন দ্বিতীয়। মানবপ্রেমিক ও শিক্ষানুরাগী এস.রহমান সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, সন্দ্বীপসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রচুর দান-অনুদান করেন। মিরসরাইতে যখন কোন কলেজ ছিলোনা প্রয়াত এস রহমান নিজামপুরে একটি কলেজ স্থাপনের জন্য তৎকালীন সময়ে এককালীন ১০ হাজার টাকা দান করেন।মূলত এস.রহমান ছিলেন একজন প্রথিতযশা ব্যবসায়ী, যিনি ১৯৪৪ সালে কলকাতায় ব্যবসা শুরু করেন এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর চট্টগ্রামে ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ নামক একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যার মাধ্যমে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ভবন ও স্থাপনা গড়ে তুলেন। ১৯৬০ সালের দিকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এস.রহমান সাহেব।

পর্যটন শিল্প প্রসারে এস. রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী। কক্সবাজার যে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনশিল্প ভূমি হতে পারে তা আঁচ করতে পেরেছিলেন আগে থেকেই। কক্সবাজারকে বিদেশী পর্যটকদের কাছে পরিচিত করার সুবিধার্থে তাদের ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন ‘হোটেল সায়মন’। তদুপরি, পর্যটকদের সুবিধার্থে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার রুটে ২০ টি মার্সিডিস গাড়ির বহর চালু করেন।

মোশাররফ হোসেন মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে পাড়ি জমান লাহোরে। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ৬-দফার ঘোষণা দেন তখন তিনি লাহোর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। লাহোরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত পূর্ব-পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ছিল- পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র পরিষদ। মোশাররফ হোসেন ছিলেন সেই ছাত্র পরিষদের নির্বাচিত সভাপতি। বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা ঘোষণার পর ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ এটি পড়ে আত্মস্থ করে বুঝলেন-এটিই পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের যথাযথ মুক্তির সনদ। মোশাররফ হোসেন তার সভাপতিত্বে একটি সভা ডেকে একে সাদরে গ্রহণ করলেন এবং এর প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেন।

১৯৬৬ সালের সেপ্টেম্বরে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন মোশাররফ হোসেন,প্রাপ্তির খাতায় নামের আগে যুক্ত হয় ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবী । বুকপকেটে এহেন খুশির সংবাদ চেপে নিজ ভূমে যখন পা ফেললেন তখন তাঁর বাবার শরীরে দানা বাঁধে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা। বাবাকে খুশির সংবাদ দিবেন কি তিনি তখন বার্ধক্যজনিত কারণে কথা বলতেই পারতেন না।কিন্তু তাতে কি! তাঁর মস্তিষ্ক ছিল পূর্ণ সচল, ছেলের পাসের খবর শুনে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। ইশারায় তিনি দোয়াও করেছিলেন ছেলেকে। মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিএসসি সম্পন্ন করে চাইলেই বনেদী পরিবারের এ-ই যুবক ব্যবসায়িক ভাবে সফল হবার জন্য নিশ্চিত জীবনের পথে পা বাড়াতে পারতেন।

কিন্তু রাজনীতি যার ধমনীতে নিত্য বহমান, তিনিই বা কি করে এড়িয়ে যাবেন এ অমোঘ নাড়ির টান! রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেয়া ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রাজনীতিকেই ব্রত হিসেবে,অদৃষ্টের একমাত্র নিয়তি হিসেবে মেনে নিলেন।স্বদেশে ফিরে চট্টল শার্দুল এম.এ. আজিজের হাত ধরে সরাসরি সম্পৃক্ত হন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে।রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গেলেও তখনও দেখা মিলেনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। তবে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন খুব করে চাইতেন বঙ্গবন্ধুর কথা শুনতে, তার সান্নিধ্য পেতে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম ১৯৫৮ সালে এবং সর্বশেষ ১৯৭৫ সালের ১০ জানুয়ারি কক্সবাজার সফর করেন। ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু কক্সবাজার সফরে গেলেন। তার সফর ব্যয় বহনের জন্য জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ হোটেল সায়মনে গেলেন ফাণ্ড কালেকশনের জন্য।নেতৃবৃন্দের হাতে চাঁদা দিয়ে মোশাররফ হোসেন জিজ্ঞেস করলেন-বঙ্গবন্ধু ডিনার কোথায় করবেন? উনারা বললেন, তা ঠিক হয়নি।হোটেলের লনে বঙ্গবন্ধুকে একটা নাগরিক সংবর্ধনা দেয়ার জন্য নেতৃবৃন্দকে প্রস্তাব দিলেন তিনি। তাঁরাও রাজি হলেন। সকল শ্রেণি পেশার লোকদের দাওয়াত দিতে বললেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। বঙ্গবন্ধুও এ নাগরিক সংবর্ধনায় আসতে সম্মতি জানালেন।ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জাতির জনককে দেয়া বিশেষ এই নাগরিক সংবর্ধনা উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর জন্য বিশেষ ক্যাণ্ডেল লাইট ডিনারের আয়োজন করেন।

অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সাথে চট্টগ্রামের এমএ আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, এমএ হান্নান, আতাউর রহমান খান কায়সার, ডা. এমএ মান্নান, মির্জা আবু মনসুরসহ কক্সবাজারের অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন।ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন-এর সৌভাগ্য হয়েছিল সেদিন বঙ্গবন্ধুর পাশে বসার। আলাপচারিতার এক ফাঁকে বঙ্গবন্ধু মোশাররফ হোসেনকে বিশেষভাবে তৈরি ক্যাণ্ডেল লাইট সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, এটি কি বাজারে পাওয়া যায়? মোশাররফ হোসেন উত্তর দিলে, না। তবে এটি আমি আপনার জন্য বিশেষ উপায়ে তৈরি করেছি। উনি খুব খুশি হলেন। নৈশভোজ শেষে তিনি মোশাররফ হোসেনকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরলেন এবং এ আয়োজনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন।

মূলত ১৯৬৭ থেকে হোটেল দেখাশোনার, পরিচালনার দায়িত্ব নেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। শুরুতেই ১২ কক্ষের হোটেল থাকলেও পরবর্তীতে তিনি এটিকে আরও সম্প্রসারণ করেন এবং হোটেলের মাঝখানে একটি লন নির্মাণ করেন।

বঙ্গবন্ধুকে হোটেলের সম্প্রসারিত কক্ষগুলো ঘুরে দেখালেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।তিনিও বেজায় খুশি হয়ে বললেন, ‘তোর এখানে রুম আছে, আমি কেন মোটেল উপলে উঠলাম?’ তখন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আবদারের স্বরেই বললেন- আপনি যখন পরবর্তীতে কক্সবাজার আসবেন আশা করি আপনি তখন আমার এখানেই থাকবেন।

পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু যখন উপরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। খাটের চতুর্পাশে নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপচারিতায় মশগুল। আলাপের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু এ্যাডভোকেট নূর আহমদকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘এই নূর আহমদ তুই মাওলানা ফরিদকে পরাজিত করতে পারবি?’ নূর আহমদ তখন বললেন, মাননীয় বঙ্গবন্ধু আপনি দোয়া করলে নিশ্চয়ই আমি তাকে পরাজিত করতে পারবো। বঙ্গবন্ধু সাথে সাথেই বলে উঠলেন, ‘তোরা আমাকে ১৫১টি আসন আইন্যা দে, আমি দেখাইয়া দিমু।’ বঙ্গবন্ধুর এ কথাতে কি নিহিত ছিল কারও আর বোঝার বাকি রইলো না। স্বাধিকার আর স্বাধীনতা তার মনে যে প্রোথিত ছিল তা এ কথাতেই বুঝতে পারা যায়।

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পরে মোশাররফ হোসেন বুঝলেন একটি সশস্ত্র জনযুদ্ধ ছাড়া এ দেশ কখনও স্বাধীন হবে না। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে সেটিই বুঝিয়ে দিলেন। এ ভাষণের প্রতিটি কথায় দেশের মানুষ স্বাধীনতার নতুন বীজমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন।

মীরসরাই’র শুভপুর ব্রিজটি ছিল তৎকালীন ঢাকা ও চট্টগ্রামের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। সে সময় চট্টগ্রামে প্রবেশের জন্য এটি ছাড়া বিকল্প আর কোনো ব্রিজ ছিল না ।ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলেন শুভপুর ব্রিজটি যদি কোন উপায়ে ধ্বংস করা যায় তাহলে পাকিস্তানি সৈন্যরা চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে পারবে না, চট্টগ্রামকে স্বাধীন রেখেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন।আর এ জন্য বিস্ফোরক জোগাড় করতে হবে ।

১৭ মার্চ সকালে জানে আলম দোভাষকে সঙ্গে নিয়ে ইঞ্জি. মোশাররফ হোসেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন । ঐদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। পরিকল্পনার কথা বঙ্গবন্ধুকে জানাতেই তিনি মোশাররফ হোসেন-এর বুকে হাত রেখে বললেন, ‘সাবাস, তুই বিস্ফোরক জোগাড় করে অর্ধেক দিয়ে শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দিবি আর বাকি অর্ধেক ঢাকায় রেখে যাবি ।’
তাৎক্ষণিক, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর থেকে বের হয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে গিয়ে কয়েকজন মাইন ইঞ্জিনিয়ার সহকর্মীর সাথে যোগাযোগ করেও ডেটোনেটর জাতীয় বিস্ফোরক পেলেন না।
ফিরতি পথে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডে আরেক ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু জামাল উদ্দিনের সাথে দেখা করেও সফল হন নি মোশাররফ হোসেন। বন্ধুদের কাছ থেকে বিষ্ফোরক জোগাড় করতে পারলেও ডেটোনেটর যোগাড় করতে পারেন নি,অনেকটা ভগ্ন মনোরথেই ২১ মার্চ চট্টগ্রাম ফিরে এলেন।

এদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অস্ত্রবাহী জাহাজ ‘সোয়াত’ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার খবর পেয়ে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২৩শে মার্চ থেকে এম এ হান্নান, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ শ্রমিক-জনতা নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন যাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস না হতে পারে।

২৫শে মার্চ সকাল থেকেই থমথমে ভাব। সবার চোখেমুখে বিদ্রোহের ছাপ। ওইদিন ২৬টি ট্রাক বোঝাই পাকিস্তানি সৈন্য কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে চট্টগ্রামের দিকে রওনা দেয়। সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে এ গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন সফল করার দায়িত্ব বর্তায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন-এর উপর।

পূর্বের পরিকল্পনা মত বিকেল ৫টার দিকে অন্য সঙ্গী সহযোদ্ধাদের নিয়ে শুভপুর ব্রিজ ধ্বংস করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ব্রিজের দু’পাশে দু’জন পহারাদার ছিল, প্রথমে সহযোদ্ধাদের নিয়ে তাদেরকে নিরস্ত্র করলেন।ব্রিজ ধ্বংস করার জন্য কোনো বিষ্ফোরক না পেয়ে প্রচুর পরিমাণে বিটুমিন ও কেরোসিন জোগাড় করে সহযোদ্ধাদের নিয়ে ব্রিজের কাঠের অংশে সংগৃহীত বিটুমিন ও কেরোসিন ঢেলে অগ্নিসংযোগ করেন তিনি।আগুনের তীব্র দহনে ব্রিজের কাঠের অংশ সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়। যার ফলে ব্রিজটি এক প্রকার ধ্বংস হয়ে সম্পূর্ণরূপে যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে রওয়ানা হওয়া ২৬টি সাঁজোয়া যান শুভপুর ব্রিজে এসে বাধাগ্রস্ত হয়।

ঘটনার পর ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে ফেরার জন্য উদ্যোগী হলে পথিমধ্যে হাজার হাজার মানুষকে পাকসেনাদের আগমনের কথাটা অবহিত করে তাদেরকে প্রতিরোধের নির্দেশ দেন। বিস্ফোরণোন্মুখ প্রতিবাদী জনতা পাকসেনাদের আগমন প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে। ইঞ্জি. মোশাররফ হোসেনের দূরদর্শিতায় পাক সেনারা যদি সেদিন শুভপুর ব্রিজ-এ বাধা না পেত এবং মীরসরাই-সীতাকুণ্ডের জনগণ সড়কে ব্যারিকেড না দিত তাহলে পাক সৈন্যরা ২৫শে মার্চ রাতেই চট্টগ্রাম পৌঁছে যেত। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এবং বন্দরের পাক সেনাদের সাথে যৌথভাবে শক্তি বৃদ্ধি করে শহর দখল করতে পারত। এমনকি চট্টগ্রামে ঘটে যেত পারত আরেকটি নিঃশংস গণহত্যার। শুধু তাই নয়, ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করাও হয়ত সম্ভব হত না।

রাজনীতি করতে এসে মুক্তিযুদ্ধসহ বহুবার জন্মভূমির সম্মান রক্ষার প্রশ্নে, জাতির জনকের প্রশ্নে, নেত্রীর প্রশ্নে জীবন মৃত্যুর মুখোমুখী হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট চত্বরে তৎকালীন বিএনপি’র সশস্ত্র সন্ত্রাসী কর্তৃক আক্রমণের শিকার হন, এমন কি তার পায়ের রগও কেটে দেয়া হয়। ‘৮৮ সালে ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার মিছিলে পুলিশ কর্তৃক গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যা করার ঘটনায় তিনিও মারাত্মকভাবে আহত হন। ‘৯২ সালের ৮ মে ফটিকছড়িতে জামায়াত ক্যাডারদের সশস্ত্র হামলায় গুরুতর আহত হয়ে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

ব্রিটিশ ভারত থেকে পাকিস্তান আমল তারপর স্বাধীন বাংলাদেশ— ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের প্রায় ৮০ বছরের লম্বা জীবনের সিংহভাগ কেটেছে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে।বঙ্গবন্ধু যেমন ‘৭০ এর নির্বাচন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা উত্তর সময়ে তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন পরবর্তিতে বঙ্গবন্ধু তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনারও আস্থার ঠিকানায় পরিণত হন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রাজনৈতিক উচ্চাশা থেকে নয় বরং নির্লিপ্ত রাজনীতিতে ব্রতী একজন রাজনৈতিক হিসেবে সর্বমহলে সুপরিচিত।১৯৭৫ পরবর্তী বিভিন্ন সরকারের মন্ত্রী পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আহবান তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন এবং নিজ দলের আদর্শে অবিচল থেকেছেন সব সময়।

টানা ৭ বার সংসদ সদস্য, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করে আজও তিনি চট্টগ্রামে হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত ঢাল। চতুর্থ বারের মতো সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ এ বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নির্লিপ্ত জীবনাচরণে বারংবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে- ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’

১২ জানুয়ারি মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনকের প্রশ্নে আপোষহীন এই রাজনীতিকের জন্মদিন এবং ৮০ তম জন্মবার্ষিকী। চট্টলার সর্বমহলের কাছে সজ্জন-সদালাপী হিসেবে বিবেচিত এ রাজনীতিক অযুতবর্ষ ধরে এ চট্টলার মাটিতে আলোকদ্যুতি ছড়িয়ে যাবেন বলেই প্রত্যাশা সকলের।

সহ-সভাপতি
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগ

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট