চট্টগ্রাম বুধবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

১ ডিসেম্বর, ২০১৮ | ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

সম্পাদকীয়

বিজয়ের মাস : শুরু হোক বধ্যভূমি সংরক্ষণ

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা দেশজুড়ে চালিয়েছে বীভৎস হত্যাযজ্ঞ। গণহত্যার পর লাশগুলো কোথাও মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে, কোথাও ফেলে দেয়া হয়েছে নদীতে। যেসব স্থানে নিরীহ মানুষজনকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে সেসব স্থান বধ্যভূমি নামে পরিচিত। এখনো একাত্তরে পাকহানাদারদের পৈশাচিকতার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে আছে দেশের বধ্যভূমিগুলো। সেগুলো যথাকায়দায় সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করতে পারলে যুগপরম্পরায় পাক-বর্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে। সাক্ষ্য দেবে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক এদেশের নিরীহ বাঙালিদের নির্মমভাবে হত্যার বিষয়টি। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মকে জানানোর জন্যও বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণ অপরিহার্য। তবে বাস্তবে বধ্যভূমিগুলো যথাকায়দায় সংরক্ষণ হচ্ছে না। এটি দুঃখজনক।
উল্লেখ্য, সরকার বছরকয়েক আগে বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। এ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের পাহাড়তলি বধ্যভূমিসহ সারাদেশের ৩৫টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়। ২০০২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই থেকে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মেয়াদে ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। একাত্তরের চেতনা বিকাশে এসব স্থাপনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সন্দেহ নেই। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এসব বধ্যভূমি এবং স্মৃতিস্তম্ভের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণে নেয়া হয়নি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। ফলে বধ্যভূমিগুলোতে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভগুলো ভেঙে পড়ছে অবহেলায়। স্মৃতিসৌধের বেশির ভাগই অকেজো হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, বেশিরভাগ বধ্যভূমিতে কোনো নামফলক নেই। নেই নিরাপত্তাবেষ্টনী বা সীমানাপ্রাচীর। নোংরা ও ময়লা আবর্জনায় পরিপূর্ণ এবং অনেকটা পরিত্যক্ত স্থানের মত অবহেলায় পড়ে আছে অনেক বধ্যভূমি। বেশিরভাগ বধ্যভূমিই সন্ধ্যার পরে মাদকসেবীদের আড্ডায় পরিণত হয়। প্রশাসনিক অবহেলায় বধ্যভূমিগুলোর কোনো কোনোটি এখন রিকশার গ্যারেজ কিংবা টেম্পো স্ট্যান্ড হিসাবেও ব্যবহার হচ্ছে। কোনো কোনো বধ্যভূমির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে স্যুয়ারেজ লাইন! স্বাধীনতা ও বিজয়ের মাসে বধ্যভূমিগুলোর কিছুটা পরিচর্যা হলেও সারাবছরই পড়ে থাকে অবহেলায়। বধ্যভূমির ইতিহাস সম্পর্কে স্থানীয় তরুণ প্রজন্মকে জানানোর উদ্যোগও নেই। এ চিত্র খুবই বেদনাদায়ক ও চরম আপত্তিকর।
আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বধ্যভূমি ও স্মৃতিস্তম্ভগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ অতি জরুরি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সারাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে দেশের কোটি কোটি তরুণ ও যুবসমাজকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব। সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা বধ্যভূমিসমূহে স্মৃতিস্তম্ভ¢ নির্মাণ করে প্রত্যেকটি স্থানকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে নবপ্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বেড়ে উঠার সুযোগ পাবে। এগুলোকে মুক্তিযুদ্ধচর্চাকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হলে জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাবাদসহ নানা জনবিরোধী তৎপরতা রোধও সহজ হবে। এমনকি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও বধ্যভূমিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা ও সঠিক বাস্তবায়ন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট