চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৯ নভেম্বর, ২০১৯ | ৪:৩৩ অপরাহ্ন

হাফিজা আক্তার

নেপাল ভ্রমণ- পর্ব: ১০

পরদিন একই কর্মসূচী। সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে সকল দেশের প্রতিনিধিগণ সমভিব্যাহারে গাড়িতে করে ICIMOD Headquarter-এ। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত Workshop। আয়োজকদের প্রায় সবাই অনুরোধ করছি যেন ঠিক ৫টায়ই Workshop শেষ হয় আর তার পর পরই গাড়িতে করে হোটেলে ফেরা যায়। দিনের আলো থাকতে থাকতেই যাতে আমরা কাঠমান্ডু শহর ঘুরে দেখতে পারি সাথে প্রিয়জনদের জন্য কিছু কিনে নেয়া। ICIMOD কথা রাখলো। সঠিক সময় শেষ করে দিনের আলোয় আমরা হোটেলে ফিরে এলাম।

আরো ঘন্টা দেড় ঘন্টা আলো থাকবে। ICIMOD স্টাফদের জিজ্ঞাসা করে রেখেছিলাম আমরা কোথায় যেতে পারি দর্শণীয় স্থান+কেনাকাটার জন্য। বলল, “দরবারে যাও। তোমাদর সুবিধা হবে”। হোটেলে ফিরেই ভূটান, বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া আরেকজন যেন কোথাকার মিলে দরবারে যাওয়ার জন্য ম্যাপ খুঁজছি। একসাথে যাব। কাঠমান্ডু মেয়েদের জন্য কতটুকু নিরাপদ কে জানে? ম্যাপ এবং নিরাপত্তার বিষয় জানতে সবাই একযোগে রিসিপশন ডেস্কে গেলাম। তাকিয়ে দেখি গত সন্ধ্যায় কথা বলা ছেলেটা রিসিপশন ডেস্কে। আমার সাথে চোখাচোখি হওয়া মাত্র হেসে বলল, “তুমি কি আজ রুমে সেহেরী খাবে? চাইলে পাবে। আজ তোমরা সংখ্যায় কম। আমরা রুম সার্ভিস দিতে পারবো”। একটু ভেবে বললাম, “না, রুমে চাই না। ডাইনিং-এ খেতে চাই তবে wake up call, Please।” রুমের চাইতে সবাই একসাথে সেহেরী খাওয়াতেই মনে হলো আনন্দের। তাছাড়া আমার সহকর্মীও আজকে সেহেরীতে আছেন।

তথাস্তু আমরা সবাই দরবারে যাওয়ার ম্যাপ আর কাঠমান্ডু শহর মেয়েদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এই তথ্যসমেত দরবারের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলাম হেঁটে একটি দলে। বলল হোটেল হিমালয় থেকে দরবার মাত্র ২০-২৫ মিনিটের হাঁটা পথ। আর বিদেশ বিভূঁইয়ে হাঁটতে আমার বেশ লাগে । সব কিছু যেমন- দোকান-পাট-রাস্তা-গাড়ি-মানুষ, মানুষের আচার-ব্যবহার -পোশাক-ফ্যাশন খুঁটিয়ে খুটিঁয়ে দেখা যায় আর সুযোগ পেলে কিছু মুহুর্তকে ফ্রেমেও বন্দি করা যায়। দেখলাম জায়গায় জায়গায় সিঁদুর আর গাঁদা ফুলের মালা দেওয়া দেব-দেবীর মুর্তি। ছোট-বড় কোনা কামচির সেপ অনুযায়ী দেব-দেবীর আকার ছোট বড় বিভিন্ন ধরনের।

মেয়েরা বেশীরভাগ সেলোয়ার-কামিজ পরা কিন্তু ওড়না নেই। শাড়িও আছে আবার পাশাপাশি টি-শার্টও রয়েছে। আমাদের দেশের মত উঠতি বয়সী ফ্যাশনেবল মেয়েদের মত টি-শার্টের ব্যবহার নয় বরং কর্মব্যস্ত ধনী-মধ্যবিত্ত-দরিদ্র আর কিশোরী থেকে বুড়ো সব বয়সীরা পরে আছে সাথে লুজ প্যান্ট যার যার অবস্থান বা ফ্যাশন অনুযায়ী। দেখে মনে হলো আমার বাসায় গৃহকর্মে যিনি সাহায্য করেন তিনি যথেষ্ট বয়স্কা। কামরাঙ্গিরচর থেকে রোজ হেঁটে কাজে আসেন আবার কাজ শেষে রোজ হেঁটে বাড়ি ফেরেন। আমরা মাঝে মাঝে তাকে রিক্সাভাড়া দিলেও রিক্সায় চড়বে না। জমিয়ে রাখবে। এটা তার ভাষায় অপচয়। যেদিন গরম বেশী পড়ে সে গরমে হাসফাঁস করে। কারণ একগাদা শাড়ি ব্লাউজ তার উপর ওড়না মুড়িয়ে পেঁচিয়ে হাঁটে। ঐ তো কিছুদিন আগে আমাদের এলাকার অল্পবয়সী এক গৃহকর্মী ছোট ছোট চার বাচ্চার মা এমনি এক গরমে হিট স্ট্রোকে ঢলে পড়ে Sudden Death। প্রখর রৌদ্রতাপে কর্মরত অবস্থায় কতজন শ্রমজীবি নারী কোনখানে কি কি কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে এগুলোর কোন Case Study Report কেউ কি কোন কালে রেখেছে? উত্তর হচ্ছে, এগুলো রাখার মত কিছু না। যে দেশে ইতিহাস বা পরিসংখ্যানই সঠিকভাবে রাখা নেই এগুলো কোন ছাড়। অথচ এরা যদি আবহাওয়া উপযোগী বা নিদেনপক্ষে নেপালীদের মত লুজ টি-শার্ট আর প্যান্ট পড়ে উপরে ওড়না জড়িয়ে কাজ করতে আসতে পারতো তবে গরমে একটু স্বস্তি পেত।

কিন্তু টি-শার্টের ব্যবহার এ ধরনের দরিদ্রদের জন্য এদেশে ইহজনমেও সম্ভব নয়। কারণ সমাজের গভীরে ঢুকিয়ে দেয়া আছে এই পোশাকধারীরা জাহান্নামী এবং এটা চরিত্রহীনাদের সাজ পোশাক। আর সমাজের দরিদ্ররা যেহেতু অসহায় তাই তারা এর কারণে নির্যাতিত হবে বেশী। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলি–আমি যখন প্রথম কাগোশিমা, জাপানে একজন পর্দানশীন এবং ধার্মিক মিশরীয় মধ্যবয়সী নারীকে মেয়েদের রেস্ট রুমে প্রথম টি-শার্ট এবং লুজ প্যান্ট পরিহীতা অবস্থায় দেখি তখন অবাক হয়ে যাই। একজন পাকিস্তানী তো বলেই ফেললেন, “টি-শার্ট এবং প্যান্ট তো অ-ইসলামিক। মেয়েদের জন্য হারাম।” সে টাস্কি খেয়ে বলল, “কেন?” পাল্টা উত্তর, “ইসলামে ছেলেদের পোশাক পরা মেয়েদের নিষেধ আছে।” সে তখন বলল, “আমি তো মেয়েদের টি-শার্ট এবং প্যান্ট পরেছি, পুরুষদেরটা তো পরিনি। তাছাড়া টি-শার্ট এবং প্যান্ট মিশরের সবাই পরে। এটাই আমাদের পোশাক। এটা দিয়ে তো সুন্দর করে শরীর আবৃত থাকে। কিছু মনে করো না তোমাদের পোশাক কি ইসলামিক?” তথাস্তু আমি ছিলাম শাড়ি পরিহিতা আর সে সেলওয়ার-কামিজ-ওড়না। সেদিন থেকে আমার বিশ্বাসের চিড় ধরেছে। আসলেই তো শাড়ি এবং সেলওয়ার-কামিজ-ওড়না শুধু ইসলামিক আর অন্যগুলো অ-ইসলামিক বা পরলে অসতী বা চরিত্রহীন এটা খুবই ফানি মনে হলো। মিশরীয় মেয়েদের আবায়া বা বোরকার নীচে টি-শার্ট এবং লুজ প্যান্ট আর লং স্কার্ট পরতে দেখেছি। দেখে অশালীন মনে হয়নি কখনও। এখন নেপালেও টি-শার্ট এবং লুজ প্যান্টে তাদের অশালীন লাগছে না।

পূর্বকোণ/টিএফ

The Post Viewed By: 107 People

সম্পর্কিত পোস্ট