
পোশাক-আশাক ও সাজগোছে ছিলেন সাজানো-গুছানো। তার পরিপাটি ও সৌখিনতায় বন্ধু-সহপাঠীরা তাকে সাজ-সজ্জার পণ্য (কসমেটিকস) ব্যবসার উৎসাহ দেয়। বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় ২০ হাজার টাকা পুঁজি খাটিয়ে শুরু হয় যে ব্যবসার পথচলা। আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রমের ফলে সেই ছোট্ট উদ্যোক্তা আজ সাফল্যের চূঁড়ায়। তার ব্যবসার পরিধি ছড়িয়েছে ৫০ লাখ টাকা।
হ্যাঁ, বলছিলাম একজন সফল নারী উদ্যোক্তার কথা। সাবরিনা বেগম স্বর্ণার সোনালী গল্প।
যেভাবে শুরু : ২০১৮ সাল। পড়ছেন নগরীর একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। সৌখিন সাজগোজে অভ্যস্ত ছিলেন। সহপাঠী ও বন্ধুরা তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। সাজগোজ ও পরিপাটি জীবনযাপন নিজের মধ্যে বেঁধে না রেখে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগায় বন্ধুরা। তাদের উদ্দীপনায় মাত্র ২০ হাজার টাকার পুঁজি খাটিয়ে শুরু করেন অনলাইনে কসমেটিকস পণ্য ব্যবসা। ভালোই চলছিল অনলাইন ব্যবসা। কিন্তু বছর যেতেই হানা দেয় করোনা মহামারী। বৈশ্বিক সংকটে অর্থনৈতিক টানাপোড়নে ব্যবসায় টান পড়ে। অনলাইন ব্যবসা প্রায় মরমর। ব্যবসার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শুরু করেন চাকরির খোঁজ। ২০২০ সালে একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি নেন। কিন্তু তার মাথায় ব্যবসার ঝোকটা থেকেই যায়। গল্পের শুরুটা ছিল মেকআপ প্রোডাক্ট বিক্রির মধ্য দিয়ে। করোনোকালে অর্থনৈতিক সংকটে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। বছরখানেক প্রায় বন্ধ ছিল ব্যবসা। পরে চাকরি থেকে সঞ্চয় ও পুরোনো পুঁজি নিয়ে ২০২০ ফের শুরু করেন অনলাইনে পোশাকের ব্যবসা। চাকরির পাশাপাশি এ ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তবে আদি ব্যবসা কসমেটিকস ব্যবসা ভুলে যাননি। অল্প সময়ের মধ্যেই ভালো সাড়া পান। উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। কিন্তু পড়াশোনা, চাকরি ও ব্যবসা-একই সঙ্গে তিন কাজ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তারপরও হাল ছাড়েননি তিনি। সবকিছু তাল মিলিয়ে একসঙ্গে মানিয়ে নেয়।
পড়াশোনা, চাকরি ও ব্যবসা কীভাবে সামাল দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তা সাবরিনা বেগম স্বর্ণা। তিনি বললেন, ‘এই পরিস্থিতিতে বড় একটি সিদ্ধান্ত নিই। মেকআপ ব্যবসা সংকুচিত করি। ৫০ হাজার টাকা মূলধন দিয়ে শুরু কাপড়ের ব্যবসায় জোর দিই। নিজের ফেসবুক পেজ ‘কোজি ক্লথিফাই (Cozy Clothify) এর মাধ্যমে অনলাইন ব্যবসার পথচলা শুরু হয়। পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান ও দেশীয় বিভিন্ন ধরনের থ্রি-পিস, লেহেঙ্গা এবং শাড়ি বেচাকেনা শুরু হয়। সঙ্গে ছিল কসমেটিকস আইটেমও। ছোট পরিসরে শুরু হলেও ক্রেতাদের আগ্রহ-আন্তরিকতায় ব্যবসা দ্রুত প্রসার ঘটে। এরপর আর পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি।’
সাবরিনা বেগম স্বর্ণার ব্যবসা এখন আর অনলাইনে বন্দী নেই। নগরের ব্যস্ততম এলাকা জিইসি মোড়ে তার একটি আউটলেটও রয়েছে। সেখানেও বিক্রি হচ্ছে নানা সৌখিন-ফ্যাশন পণ্য। দাম ও গুণগতমানের কারণে আউটলেটেও ক্রেতাদের ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘এই অবস্থানে পৌঁছাতে অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আসতে হয়েছে। ব্যবসার শুরুতে ছিল মূলধনের সীমাবদ্ধতা, ক্রেতা সংগ্রহের চ্যালেঞ্জ এবং অনলাইন ব্যবসার অনিশ্চয়তা। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। ধীরে ধীরে নিজের ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করতে সক্ষম হন।’
সাবরিনা বেগম স্বর্ণা মনে করেন, নারী যদি সাহস করে উদ্যোগ নেয় এবং ধৈর্য ধরে কাজ করে, তাহলে সফলতা আসবেই। তার মতে, ‘শুরুটা ছোট হলেও স্বপ্ন ছিল বড়। বর্তমানে তার আউটলেটে ছয়জন কর্মী কাজ করেন। ভবিষ্যতে আউটলেট আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’
এবার ঈদ উপলক্ষে পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ানসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কালেকশন রয়েছে তার শো-রুমে। মার্কেট মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। অনলাইনে ক্রয়ের পাশাপাশি রয়েছে আউটলেটে এসে যাচাই-বাছাই করে পছন্দনীয় কাপড় ক্রয়ের সুযোগ।
নারী উদ্যোক্তা সাবরিনা বেগম স্বর্ণা ২০ হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করেছিলেন কসমেটিকস পণ্য বিক্রি। করোনার ধাক্কায় পরে বন্ধ হয়ে যায় সেই ব্যবসা। কিন্তু অদম্য এই নারী উদ্যোক্তা নতুন করে শুরু করে কাপড়ের ব্যবসা। এখন তার ব্যবসার পরিধি প্রায় ৫০ লাখ টাকার কাছাকাছি। একজন কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে উঠেন তিনি।
পূর্বকোণ/ইবনুর