
মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার তিনদিন পর আজ শুক্রবার একদিনের সফরে নিজ এলাকা চট্টগ্রাম আসছেন নবনির্বাচিত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কাট্টলী নাজিরবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে গিয়ে কবর জিয়ারত ছাড়াও এদিন দলীয় নেতা- কর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, বন্দর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করবেন, এক কথায় দিনভর কর্মব্যস্ত সময় কাটাবেন তিনি। অর্থমন্ত্রী মহোদয়, নতুন পরিচয়ে আপনাকে চট্টগ্রামে স্বাগত জানাই। অভিনন্দন জানাই।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী— আমাদের চট্টগ্রামের সন্তান। তাঁর ওপর ন্যস্ত হয়েছে দেশের আর্থিক রূপরেখা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সর্বোচ্চ দায়িত্ব। এটি শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; এটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ। আর সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণে চট্টগ্রামের ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি।
চট্টগ্রাম একদিন ছিল উপমহাদেশের বাণিজ্য প্রবেশদ্বার। চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে গড়ে উঠেছিল শিল্প, আমদানি-রপ্তানি, ব্যাংকিং ও শিপিং ব্যবসার শক্ত ভিত। খাতুনগঞ্জ ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য ম্লান হয়েছে। বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়েছে; আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রিকরণ হয়েছে রাজধানীমুখী।
বিগত তিন মেয়াদে উন্নয়নের যে চিত্র আমরা দেখেছি, তা প্রধানত ঢাকাকেন্দ্রিক। অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, আন্তর্জাতিক মানের প্রদর্শনী কেন্দ্র, বহুজাতিক বিনিয়োগ— সবকিছুর মূল স্রোত ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। অথচ চট্টগ্রাম, যা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, সেখানে এখনো নেই বিশ্বমানের সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল, নেই আধুনিক মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার। চিকিৎসার জন্য আমাদের রোগীদের ঢাকামুখী হতে হয়— এ এক প্রাত্যহিক বেদনা।
বাণিজ্য ও শিল্পের ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম তার ঐতিহাসিক অবস্থান হারিয়েছে। বন্দরনির্ভর লজিস্টিক হাব, গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও এক্সিবিশন সেন্টার— এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। পর্যটনের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনার অভাব নেই। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্য— সবই আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে স্থান পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু প্রণোদনা, পরিকল্পনা ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতিতে সম্ভাবনাগুলো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।
চট্টগ্রাম শুধু অর্থনীতির নয়, সংস্কৃতি ও শিক্ষারও কেন্দ্র হতে পারত। এখানে আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, আর্ট গ্যালারি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিংক ট্যাংক গড়ে তোলা সম্ভব। কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক নগর পুনর্গঠন, স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্লু-ইকোনমি গবেষণা ইনস্টিটিউট—এসব উদ্যোগ চট্টগ্রামকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
বিএনপি তাদের পূর্ববর্তী মেয়াদে চট্টগ্রামকে ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ ঘোষণার অঙ্গীকার করেছিল। সেই অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ পায়নি— এ কথা স্বীকার করতেই হবে। এখন যখন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে চট্টগ্রামেরই একজন সন্তান, তখন এ শহরের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সুবর্ণ সুযোগ এসেছে।
আমাদের আবেদন—
১. চট্টগ্রামের জন্য একটি যুগোপযোগী মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন।
২. সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল ও আন্তর্জাতিক মেডিকেল সিটি স্থাপন।
৩. বন্দর-নির্ভর লজিস্টিক ও ফিনান্সিয়াল হাব গঠন।
৪. আন্তর্জাতিক কনভেনশন ও এক্সিবিশন সেন্টার নির্মাণ।
৫. পর্যটনে বিশেষ প্রণোদনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
৬. সাংস্কৃতিক ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।
চট্টগ্রাম একদিন ছিল জাতীয় অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন। আজও সেই সক্ষমতা রয়েছে— প্রয়োজন শুধু নীতি-সাহস, সুষম বণ্টন ও দূরদর্শী পরিকল্পনা।
আমরা আশাবাদী, জননেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তাঁর নিজ শহরের প্রতি ন্যায্য দৃষ্টি দেবেন— কোনো আঞ্চলিক পক্ষপাত নয়, বরং জাতীয় স্বার্থেই। নীতি নির্ধারকদের অনেকেই খুব দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই বাংলাদেশের উন্নয়ন। অন্যভাবে বললে, শক্তিশালী চট্টগ্রাম মানেই শক্তিশালী বাংলাদেশ।