চট্টগ্রাম শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

সর্বশেষ:

সাইনবোর্ড ছাড়াই ক্রেতার কমতি নেই

মদনমোহনের ঐতিহ্যবাহী দই ভা-ার

নিজস্ব প্রতিবেদক

১০ মে, ২০১৯ | ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

অভিজাত দই দোকানের জৌলুসের মাঝেও ভোজনরসিকদের তৃপ্ত করে চলছে মদনমোহনের ঐতিহ্যবাহী দই ভা-ার। নগরীর

এনায়েতবাজার মোড়ে ৭০ বছরের পুরনো এ দোকানের বিজ্ঞাপন কিংবা সাইনবোর্ড কোনটিই নেই। তবে ক্রেতার কমতি নেই।

স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে রমজানে দধির চাহিদা বেড়েছে বৈকি। বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে আসলে দই খেতে আসতেন মদনের দোকানে। গতকাল

বৃহস্পতিবার দই ভা-ারে গেলে দেখা যায় টিনের ছাউনি দেয়া এক রুমের কক্ষে রয়েছে একটি পুরনো চৌকি, কাঠের ছোট ক্যাশ

বক্স, ছোট ছোট ড্রাম ভর্তি দুধ আর কিছু মাটির পাত্র।
কথা হয় মদন মোহন দাশের একমাত্র ছেলে সঞ্জয় দাশের সাথে। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রসায়নে মাস্টার্স পাশ করা সঞ্জয় জানান, বাবা

মারা গেছেন দুই বছর আগে। চেষ্টা করছেন বাবার স্মৃতি রাখতে। দই কিংবা মাখন কোনটিই দাম বাড়ায়নি। সাত বছর আগেও তার

বাবা টকদই বিক্রি করতেন প্রতিকেজি ৮০ টাকা। এখনো সেই দামেই বিক্রি করা হচ্ছে। সঞ্জয় বলেন, আমি চাই না আমার কারণে

বাবার দোকানের বদনাম হোক। এতে বাবার আতœা কষ্টপাবে। সাজসজ্জায় মলিনতার ছাপ থাকলেও গুনগত মানে ঘি,মাঠার শরবত,

মাখন, টকদই, দধিচিড়া আর মাখনরুটি তৈরিতে এতটুকু ছাপ পড়েনি। বংশ পরম্পরায় এখনো রয়ে গেছে পুরনো স্বাদ।
১৯৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পটিয়ার কচুয়াই গ্রামে জন্মগ্রহন করেণ মদনমোহন। ১৯৫৫ সালে এসএসসি পাশ করার পর পরিবারের দায়িত্ব

নিতে টিউশনি করার পাশপাশি চাকুরি নেন বন্দরে। কিন্তু অল্প বেতনের টাকায় পারিবারের ভরনপোষণ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এক পর্যায়ে পঞ্চাশের দশকে যুক্ত হলেন টকদই আর মাখন বিক্রির ব্যবসায়। সততা আর নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভোজনরসিকদের টানা ৬৪

বছর তৃপ্ত করেছেন মদনমোহন। ২০১৪ সালের ৩০ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সঞ্জয় বলেন, মাস্টার্স পাশ করার পর খাদ্য বিভাগ ও জিপিওতে চাকুরি পেয়েছিলাম। কিন্তু বাবার ইচ্ছায় ঐতিহ্য রাখতে এ ব্যবসায়

জড়িয়েছিল নিজেকে। শুরুতে ৬ কেজি দুধ ব্যবহার করে তৈরি করতেন দুগ্ধজাত খাবার। বর্তমানে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ কেজি দুধ

ব্যবহার করা হচ্ছে দই ও মাখন তৈরির কাজে।
মদনের দোকানে দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে দুধ সরবরাহ করছেন বোয়ালখালির শাকপুরার আহমদ হোসেন। তিনি বলেন, শতভাগ খাঁটি দুধ

ছাড়া কখনো মাখন তৈরি হবেনা। বর্তমানে বাজারে খাঁটি দুধের সংকট রয়েছে। বোয়ালখালির শাকপুরা ও চরখিজিরপুরের বিভিন্নগ্রাম

থেকে সংগ্রহ করা হয় এ দুধ। এরপর শুরু হয় মুলকাজ। সনাতন পদ্ধতিতে চীনামাটির পাত্রে বাঁশের সাহায্যে দুধকে মন্থন করে চলে

মাখন ও মাঠা তৈরির কাজ। নিপূণতার প্রমাণ মিলে মাখন বিক্রির সময়ও। ভাঁপানো পলাশ পাতায় ক্রেতাদের চাহিদা মতো মাখন নিয়ে

নারকেল পাতার শলা গেঁথে মুখ বন্ধ করা হয় মাখনভর্তি পাতার। আঁখেরগুড় ছিটিয়ে পরিবেশন করা হয় দধি চিড়া। একইভাবে বিক্রি

করা হয় দই চিড়া, মাঠার শরবত। সঞ্জয়ের কাছ থেকে জানা যায়, দুগ্ধজাত খাবার তৈরিতে সকাল থেকে রাত অব্দি শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন

আর চারজন। স্বাধীনতার পর থেকে মদনের দোকানে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন চন্দনাইশের বৈলতলি গ্রামের ষাটোর্ধ নেপাল বিশ্বাস।
২৪ বছর ধরে আছেন মাধব বসু। তিন বছর আগে এসেছেন সুমন চক্রবর্তী আর দুই বছর আগে যোগ দিয়েছেন ঋষু দেব। সঞ্জয়

বলেন, আমি চেষ্টা করছি বাবার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটির খাবারের গুণগত মান ধরে রাখতে। ছয় টাকার দোকানটির ভাড়া বর্তমানে

ছয় হাজার টাকা হয়েছে। এ ব্যবসা খুবই পরিশ্রমের। নির্দিষ্ট সময়ে সব কাজ সম্পন্ন করতে। সময়ের হেরফের হলে দুই থেকে দই

কিংবা মাখন কোনটিই যথাসময়ে তৈরি করা সম্ভব নয়। বাবার স্মৃতি ধরে রাখতে নিজেকে ব্যবসায় জড়িয়েছি। কিন্তু আমার পরবর্তী

প্রজন্ম এ ব্যবসায় আসুক তা আমি চাই না।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট