
দরজায় কড়া নাড়ছে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যতই ঘনিয়ে আসছে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের নির্বাচনী প্রচারণা ততই জমে উঠছে। আসনটি লোহাগাড়া উপজেলা ও সাতকানিয়ার একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত। এ আসনের নির্বাচনী মাঠে বর্তমানে তিন প্রার্থী থাকলেও মূলত ভোটের লড়াই হবে জামায়াত ও বিএনপির প্রার্থীর। শেষ মুহূর্তে এসে প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নানা ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে প্রার্থীরা নিজের প্রতীকে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ভোটারদের অনুরোধ করছেন। সরাসরি প্রচারণার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভিডিও বার্তা, পোস্টার ও ডিজিটাল কনটেন্ট এর মাধ্যমে সাধারণ ভোটার ও তরুণ ভোটারের মন জয়ের চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর দিন থেকে প্রার্থীরা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুই উপজেলার একটি পৌরসভা ও ২০টি ইউনিয়নের ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন। প্রার্থীদের গণসংযোগের পাশাপাশি নিয়মিত চালু রয়েছে উঠান বৈঠকও। সেই সাথে সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। কেউ বলছেন ধারাবাহিক উন্নয়নের কথা, কেউ বলছেন পরিবর্তনের কথা। সব মিলিয়ে অফিস পাড়া থেকে শুরু করে চায়ের দোকান সর্বত্র নির্বাচনী আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সাধারণ ভোটারেরা জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় অনেকটা নীরব রয়েছেন তাদের কর্মী সমর্থকরা। তবে যত সময় যাচ্ছে উপজেলার আওয়ামী সমর্থকদের ভোট আদায়ে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করছেন জামায়াত-বিএনপির প্রার্থীরা। অনেকেই মনে করছেন, আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভোট যেই প্রার্থীর পক্ষে যাবে সেই প্রার্থী বিজয়ী হবে। এক সময় আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করা অনেক প্রভাবশালী ও ব্যবসায়ীদেরকে বিএনপি -জামায়াত তাদের নিজের সুবিধার জন্য নির্বাচনী মাঠে নামিয়েছে। এ নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। উপজেলার নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের এসব ভোটারদের নিজেদের দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে নানা কৌশলে উদ্বুদ্ধ করছেন।
নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে ৩ প্রার্থীরা হলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন ও হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী ইসলামী আন্দোলনের শরীফুল আলম চৌধুরী।
ভোটাররা জানিয়েছেন, প্রবাসী ও ব্যবসায়ী অধ্যুষিত লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলার এ আসনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাদীক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও অনেক ঐতিহ্যের পীঠস্থান এ দুই উপজেলায় রয়েছে অনেক জ্ঞানীগুণীর বসবাস। চট্টগ্রাম শহর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ দুই উপজেলার ব্যবসায়ীদের ব্যাপক আধিপত্য রয়েছে। এমন কি মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও এদের অবস্থান অগ্রগণ্য। এ কারণে প্রতিবারের ন্যায় এবারও এ আসনটিকে ঘিরে বাড়তি নজর রয়েছে সব দলের।
নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে উপজেলাজুড়ে ততই প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকরা। এ আসনটিতে নির্বাচনে তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করলেও এ দুই প্রার্থীর প্রচারণা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
এ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে মাঠে রয়েছেন ১০ দলীয় জোটের জামায়াত প্রার্থী দুইবারের সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী। বিগত আওয়ামী লীগের আমলে অসংখ্য মামলা ও জেল জুলুমের শিকার হয়েছেন তিনি। জামায়াতের শক্ত ঘাঁটিখ্যাত এই আসনে শাহজাহান চৌধুরীর রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি। ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে উপজেলার প্রতিটি এলাকায় তিনি গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিএনপি’র প্রার্থীকে ছাপিয়ে এই আসনে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করতে তার পাশাপাশি জামায়াতে সুশৃঙ্খল নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত কর্মী বাহিনী ভোটারদের মন জয় করতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এবার এ আসনটিতে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে জামায়াত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী বিপুল ভোটে জয় লাভ করবেন বলে আশাবাদী তার কর্মী সমর্থকেরা।
বর্তমানে গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন জামায়াত প্রার্থী আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী। তিনি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, চিহ্নিত করছেন এলাকার সমস্যা। এ আসনে বিজয়ী হয়ে সকল সমস্যা নিরসনে দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি। তিনি নিয়মিত গণসংযোগ ছাড়াও সামাজিক অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করছেন।
জানতে চাইলে আলহাজ শাহজাহান চৌধুরী বলেছেন, ‘সাতকানিয়া- লোহাগাড়ার মানুষ অতীতে আমাকে ভোট দিয়ে ঠকেনি। তাই আগামীতেও আমাকে ভোট দিতে তারা দ্বিধা করবে না। এই আসনের মানুষ প্রতিবারের মত ন্যায়-ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে আমাকে আবার বিজয়ী করবে। আর আমি নির্বাচিত হলে শিক্ষাখাতে ব্যাপক উন্নয়ন, মাদক নির্মূল, স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তনসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করবো।’
বিএনপি নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে নাজমুল মোস্তফা আমিনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। লোহাগাড়া উপজেলা বিএনপির দায়িত্ব পালনকালে উপজেলা বিএনপির তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করে রেখেছেন। বিগত সময়ে হামলা-মামলাসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়াও ২৯ বছর পর এ আসনে দলীয় প্রার্থী পেয়ে উচ্ছ্বসিত বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা ভেদাভেদ ও কোন্দল ভুলে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছে।
জানতে চাইলে বিএনপি প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন বলেন, ‘বিএনপি সাধারণ জনগণের দল। সাধারণ মানুষ সব সময় এই দলটির উপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছে। আশাকরি আগামীতেও রাখবে। ধানের শীষে ভোট দিয়ে কেউ প্রতারিত হয়নি। কারণ গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতীক হচ্ছে ধানের শীষ। নির্বাচিত হলে কৃষি, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সন্ত্রাস নির্মূলে কাজ করে যাব। মাটি, বালু খেকো ও চাঁদবাজদের বিতাড়িত করে সাতকানিয়া-লোহাগাড়াকে একটি শান্তির জনপদে পরিণত করবো।’
উপজেলা নির্বাচনী অফিস সূত্রে জানা গেছে, একটি পৌরসভা, ২০ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনটির মোট ভোটার ৫ লাখ ৬ হাজার ৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭০ হাজার ৯১৫ জন এবং নারী ২ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৪ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১৫৭ টি, ভোট কক্ষের সংখ্যা ৯৫৯ টি। এ আসনটিতে পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের জন্য নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ১৪ হাজার ২৭২ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ হাজার ৫০৫ জন ও নারী ভোটার ৭৬৭ জন।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। সেই সাথে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনায় প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’
পূর্বকোণ/পিআর