চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সর্বশেষ:

বিএনপি আর জামায়াতের দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস

চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী,  হালিশহর ও খুলশী) আসন

বিএনপি আর জামায়াতের দ্বিমুখী লড়াইয়ের আভাস

মোহাম্মদ আলী

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১২:১৭ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রাম-১০ আসনে দুই নতুন প্রার্থীর জমজমাট লড়াই দেখতে মুখিয়ে আছেন ভোটারেরা। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সাঈদ আল নোমান ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীর বিরামহীন প্রচারণায় ইতোমধ্যে জমে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ।  এছাড়াও প্রচারে রয়েছেন ইসলামিক ফ্রন্টের মো. লিয়াকত আলী (চেয়ার) ও  ইসলামী আন্দোলনের মুহাম্মদ জান্নাতুল ইসলাম (হাতপাখা) সহ অন্যান্য প্রার্থীরাও।

চট্টগ্রাম আসনে ৯ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতায়  নামলেও বেশিভাগ ভোটারের দৃষ্টি এখন বিএনপি ও জামায়াতের এ দুই প্রার্থীর দিকে। বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের একমাত্র পুত্র সাঈদ আল নোমান জীবনে প্রথম ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এ আসনে নির্বাচন করছেন।  অপরদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৮নং শুলকবহর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীও এবার প্রথম সংসদ নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন। বর্তমানে এই দুই প্রার্থীর পক্ষে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা মাঠে ওয়ার্ড, বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, অলিগলি,  পাড়া-মহল্লা ও অফিস পাড়ায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।  

বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী ছাড়া চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, হালিশহর ও খুলশী) আসনে আরো প্রার্থী রয়েছেন ৭জন। এরা হলেন, ইসলামিক ফ্রন্টের মো. লিয়াকত আলী (চেয়ার), ইসলামী আন্দোলনের মুহাম্মদ জান্নাতুল ইসলাম (হাতপাখা),  ইনসানিয়াত বিপ্লবের সাবিনা খাতুন (আপেল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আরমান আলী (ফুটবল), জাতীয় পার্টির মুহাম্মদ এমদাদ হোসাইন চৌধুরী (লাঙ্গল),  সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) আসমা আকতার (কাঁচি) ও লেবার পার্টির মো. ওসমান গণি (আনারস)।  বর্তমানে এদের বেশিভাগ প্রার্থী মাঠে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ আসনের বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমান পূর্বকোণকে বলেন, ‘বিশ্বমানের চট্টগ্রাম গড়া আমার রাজনৈতিক অঙ্গীকার। চট্টগ্রাম-১০ আসনে সবচেয়ে যেসব বিষয় আমাকে নাড়া দিয়েছে- ভয়াবহ ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতা সমস্যা, যুবকদের কর্মসংস্থানের অভাব,  মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার, হাসপাতাল সংকট, স্কুল ও নাগরিক সেবার মানের ঘাটতি, জেলে ও মৎস্যজীবীসহ পথশিশু ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা সংকট। মানুষ বছরের পর বছর একই সমস্যার কথা বলছে,  কিন্তু টেকসই সমাধান হয়নি। এই জায়গা থেকেই আমার দায়িত্ববোধ জন্মেছে। আমার পরিকল্পনা হচ্ছে – ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি কর্পোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে স্থায়ী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন। বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আইটি ও টেকনিক্যাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, ছোট উদ্যোক্তা ফান্ড তথা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমসহ সোশ্যাল এন্টারপ্রেনারশিপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান। মাদক ও কিশোর গ্যাং রোধকল্পে কমিউনিটি পুলিশিং, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো, স্কুল-কলেজভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার জন্য সুলভ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ এবং মহিলা ও শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রকৃতপক্ষে সকল ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও গোষ্ঠীর সমন্বয়ে একটি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক জাতি রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।’

 

সাঈদ আল নোমান বলেন, ‘আমার বাবা আবদুল্লাহ আল নোমান চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আদর্শ, সাহস ও মানুষের পাশে থাকার রাজনীতির প্রতীক। তাঁর কাছ থেকে আমি শিখেছি- রাজনীতি মানে সেবা, আপস না করে নীতি ধরে রাখা, বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। তবে আমি নিজেকে আলাদা করতে চাই- আধুনিক, প্রযুক্তি-নির্ভর ও পরিকল্পনাভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে তরুণদের ভাষায় কথা বলা, তরুণদের সুযোগ তৈরি করা, শুধু বক্তৃতা নয়, ডাটা ও ফলাফলভিত্তিক কাজ দেখাতে চাই।’

নির্বাচনে অপর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী পূর্বকোণকে বলেন, ‘নির্বাচিত হলে রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা ও পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যার সমাধান, ছিনতাই-চুরি-মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত যুব সমাজ গঠন, নারী শিশু কর্মজীবী ও ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা ও তরুণদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং মানসম্পন্ন পার্ক, আধুনিক খেলার মাঠ ও নিরাপদ সুইমিং পুল নির্মাণ করতে চাই। পাশাপাশি পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সড়ক ফুটপাত ও গণপরিষেবা উন্নয়ন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও সবুজায়ন বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সিটি কর্পোরেশনের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে চাই। অন্যদিকে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও খাল-নালা পুনঃখনন ও নিষ্কাশন এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য পাম্পিং স্টেশন ও স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম চালুতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে সহায়তা করবো। আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরি নির্মাণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবো। মাদকবিরোধী বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, পুনবার্সন কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হবে।  এছাড়াও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকের  আধুনিকায়, বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ ও জরুরি এম্বুলেন্সে সেবা চালুকরণসহ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বে উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি রোধে অনলাইনে মনিটরিং সিস্টেম চালু এবং জনগণের সাথে সরাসরি যোগাযোগ ও মতামত গ্রহণের জন্য ‘জনগণের দরবার’ আয়োজন করতে চান  জামায়াতের এই প্রার্থী। যুবকদের জন্য স্থানীয় শিল্প, আইটি পার্ক ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও স্টার্টআপ সহায়তা তহবিল গঠন ও নারী কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা কর্মসূচি, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত অসহায় নারী বৃদ্ধা ও অনাথ শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-১০ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৪৪ জন।  এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৩ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ৬৩২ জন।  হিজরা ভোটার রয়েছে ২৯জন। মোট ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৩৯টি এবং ভোট কক্ষ ৯৪৮টি।

২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসনটি সৃষ্টি হয়।  নগরীর পাহাড়তলী, ডবলমুরিং, খুলশী, হালিশহর ও পাঁচলাইশ অংশ বিশেষ নিয়ে এ আসনটি গঠিত।  এর আগে সংসদ নির্বাচনে আলোচ্য এলাকাগুলো ছাড়াও পতেঙ্গা ও বন্দর নিয়ে চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসন হিসেবে পরিচিতি ছিল।  পরবর্তীতে এসব এলাকাকে বিভক্ত করে চট্টগ্রাম-১০ ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের সীমানা নির্ধারণ করা হয়।  এ আসনে ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে প্রথম বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের ডা. আফসারুল আমীন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির আবদুল্লাহ আল নোমান। ওই নির্বাচনে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ভোটে হেরে যান তিনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি বিএনপি ও জামায়াত।  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না করায় ভোট বর্জন করে রাজনৈতিক দল দুটি। সেবার নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের ডা. আফসারুল আমীন।  এরপর ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের ডা. আফসারুল আমীন বিজয়ী হয়েছিলেন।  কিন্তু অসুস্থতার কারণে ডা. আফসারুল আমীনের মৃত্যু হলে ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই এই আসনে উপনির্বাচন হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মো. মহিউদ্দিন বাচ্চু বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচনেও তিনি পুনরায় একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট