চট্টগ্রাম রবিবার, ০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

হেভিওয়েট গিয়াস কাদেরকে চ্যালেঞ্জ দিতে চায় মঞ্জু-নুরী

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান)

হেভিওয়েট গিয়াস কাদেরকে চ্যালেঞ্জ দিতে চায় মঞ্জু-নুরী

মোহাম্মদ আলী ও জাহেদুল আলম

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১২:৩৬ অপরাহ্ণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর রাজনীতি, খুনাখুনিসহ নানা কারণে আলোচিত-সমালোচিত রাউজান। এর মধ্যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে চ্যালেঞ্জ দিতে চায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শাহাজাহান মঞ্জু ও বৃহত্তর সুন্নী জোটের প্রার্থী আল্লামা ইলিয়াছ নূরী। প্রতিদিনই এ তিন প্রার্থী চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠে-ময়দানে। করছেন পথসভা ও উঠান বৈঠকও। 

 

 

স্বাধীনতার পর থেকে রাউজানে বেশিরভাগ সময়ই জয়লাভ করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। কিন্তু ৫ আগস্টের পর রাউজানের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। মাঠ ছাড়া রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে মূল আলোচনায় বিএনপি। এ আসন থেকে জয় ঘরে তুলতে উপজেলার মাঠ-ঘাট চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী আলহাজ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। এই আসনে এবার তার সাথে নির্বাচনী মাঠে লড়াইয়ে নেমেছেন জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহাজাহান মঞ্জু, বৃহত্তর সুন্নী জোটের মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী আল্লামা ইলিয়াছ নূরী ও গণসংহতি আন্দোলনের মাথাল মার্কার নাছির উদ্দীন তালুকদার। এর মধ্যে জামায়াতের শাহজাহান মঞ্জু ও বৃহত্তর সুন্নী জোটের ইলিয়াছ নূরী বিএনপি প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে পাল্লা দিয়ে রাতদিন ভোটের মাঠে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচিত হলে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এলাকার সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত, এলাকার উন্নয়ন এবং বেকারত্ব দূরীকরণের উপর জোর দিচ্ছেন। প্রায় একই ধরনের সমস্যা দূরীকরণের আশ্বাস দিচ্ছেন অপর প্রার্থীরাও। এবার বিএনপি প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী শক্ত অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। তবে তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে প্রস্তুত জামায়াত ও বৃহত্তর সুন্নী জোটের প্রার্থী।

 

স্থানীয়রা বলছেন, বিএনপি প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী পুরোনো ও পরিচিত মুখ। তার বাবা এ কে এম ফজলুল কাদের চৌধুরী ও বড় ভাই বিএনপি নেতা মরহুম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন রাউজান তথা চট্টগ্রামসহ সারাদেশের পরিচিত রাজনীতিবিদ। রাজনীতিতে বনেদি পরিবার হিসেবে খ্যাতি রয়েছে তাদের। তাছাড়া গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। বৃহৎ রাজনীতিক দলের প্রার্থী ও পারিবারিক পরিচিতির কারণে তার বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। তাছাড়া বিএনপি নেতাকর্মী, সমর্থকরা গত কয়েকটি নির্বাচনে ছিল না। সে হিসেবে এবার বিএনপি বিজয় উৎসব করতে আঁটঘাঁট বেঁধে মাঠে নেমেছে।

 

অপরদিকে জামায়াত এবং বৃহত্তর সুন্নী ঐক্য জোট নিজেদের শক্ত অবস্থান জানিয়ে দিতে ভোটের মাঠে লড়ে যাচ্ছেন। নানা হিসেব কষে তারা ভোট লড়াইয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রার্থীরা যার যার মতো করে সাধারণ মানুষকে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশেষ করে এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জোর দিচ্ছেন তারা।

 

নির্বাচনকে ঘিরে প্রচারণায় সরব রাউজানের প্রতিটি জনপদ। আলোচনায় প্রাধান্য পাচ্ছে নির্বাচন। এলাকাজুড়ে মাইকিং, লিফলেট বিতরণ, পথসভা ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন প্রার্থীরা। প্রার্থীদের সরাসরি কথা শোনার সুযোগ পাচ্ছেন ভোটাররা, তুলে ধরছেন নিজেদের প্রত্যাশা ও এলাকার সমস্যা।

 

 

জানতে চাইলে বিএনপির প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমি একটি ঘোষণাপত্র করেছি। নির্বাচিত হলে সেই ভিত্তিতে কাজ করবো। তবে রাউজানকে সন্ত্রাসের মাধ্যমে যেভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে, সন্ত্রাস নির্মূলের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এটা হবে আমার প্রধান কাজ। পাহাড় থেকে যেভাবে মাদক নামছে, তাতে নতুন প্রজন্ম ধ্বংস হওয়ার উপক্রম। এ জন্য মাদক নির্মূল করা হবে। এছাড়া হালদা ও কর্ণফুলীর ভাঙ্গনরোধ, হালদা নদী ড্রেজিং করা হবে। যুবকদের বেকারমুক্ত করার জন্য কৃষি এবং রেমিটেন্স নির্ভরতার উপর জোর দেয়া হবে।’

 

তিনি আরো বলেন, ‘আমার পেছনে অত্যাচারী ও সন্ত্রাসীদের হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। রাউজানকে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত করা হবে। বিএনপি কখনোই সন্ত্রাস কিংবা চাঁদাবাজির রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।’

 

জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণা করছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও রাউজান উপজেলা আমীর মোহাম্মদ শাহজাহান মঞ্জু। প্রচারণাকালে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও দলের নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন। এলাকার সার্বিক উন্নয়নে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন তিনি।

 

শাহজাহান মঞ্জু বলেন, স্বৈরশাসনের কারণে মানুষের গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার বারবার বিপন্ন হয়েছে। ক্ষুধা ও দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পায়নি এদেশের শ্রমজীবী মানুষ। নারীরা হয়েছেন নির্যাতিত ও নিগৃহীত। শিক্ষার্থীরা পায়নি শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ, পায়নি মানসম্মত শিক্ষা। বেকারত্ব যুব সমাজকে করেছে হতাশাগ্রস্থ। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা ছিলেন এসব বিষয়ে নির্বিকার এবং দুর্নীতির মহোৎসবে। এমনই এক পরিস্থিতিতে বাংলদেশ জামায়াতে ইসলামী এদেশকে জুলুম-শোষণ এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিরাপদ রাউজান গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাউজান আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আমাকে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করা এবং একইসাথে রাষ্ট্রসংস্কার করার জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানাচ্ছি।’

 

 

পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণা করছেন বৃহত্তর সুন্নী জোট সমর্থিত বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট প্রার্থী অধ্যক্ষ আল্লামা ইলিয়াছ নূরী। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে আমি রাউজানে সন্ত্রাস, বেকারত্ব, মাদক ব্যবস্যা, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব সমস্যা সমাধানে কাজ করে যাব। রাউজানের পূর্বপাশে প্রস্তাবিত শিল্প জোনকে বাস্তবে রূপ দিয়ে যোগ্য যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনব। সরকারি উন্নয়ন কাজে রাউজানে কমিশন বাণিজ্য হতে দেব না।’ গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী নাসির উদ্দিন রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চারিয়ে যাচ্ছেন।

 

রাউজান উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা পরান্টু চাকমা পূর্বকোণকে বলেন, ‘রাউজান উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার তিন লাখ ৩৯ হাজার ৯৮৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৭৮ হাজার ৯৮১ জন এবং নারী ভোটার এক লাখ ৬১ হাজার ৭ জন। উপজেলায় ৯৫টি ভোট কেন্দ্রে মোট ভোট কক্ষ ৬৩৯টি। উপজেলার মোট ৯৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৩৭টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন।’

 

রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা এস.এম. রাহাতুল ইসলাম সকল প্রার্থী ও সমর্থকদের নির্বাচন আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সকল প্রার্থী ও সমর্থকদের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি।’

 

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলায় মোট ৯৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৩৭টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ মহড়া দেয়া হয়েছে রাউজানে। ‘নির্বাচনে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। কোন অপরাধ দলীয় পরিচয়ে বিবেচনা করা হবে না।’

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট