চট্টগ্রাম শনিবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসন : লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসন : লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে

মোহাম্মদ আলী ও সৌমিত্র চক্রবর্তী

৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১:১১ অপরাহ্ণ

দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রাম অংশের উল্লেখযোগ্য আসনটি হলো চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড)। আসনটি সীতাকুণ্ড উপজেলা এবং নগরীর কিছু অংশ আকবরশাহ-পাহাড়তলী আংশিক নিয়ে গঠিত। এ আসনের নির্বাচনী মাঠে বর্তমানে ৯জন প্রার্থী থাকলেও মূলত ভোটের লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই দুই দলের প্রার্থীর মধ্যে চলছে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা। প্রার্থীরা নানা ধরনের অভিনব প্রচারণার মাধ্যমে ভোটারদের তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা প্রতীকে ভোটাধিকার প্রয়োগে অনুরোধ করছেন। তবে এ আসনটিতে মোট ভোটারের মধ্যে তরুণ প্রজন্মের নতুন ২৩ হাজার ভোটার রয়েছে। তাদের ভোটে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা দুই প্রার্থীর যেকোনো একজনের ভাগ্য খুলে যেতে পারে বলে অভিমত স্থানীয় ভোটারদের।

 

নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর দিন থেকে প্রার্থীরা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপজেলার একটি পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়নের ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন। প্রার্থীদের গণসংযোগের পাশাপাশি নিয়মিত চালু রয়েছে উঠান বৈঠক। সেই সাথে সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন প্রার্থীরা। সব মিলিয়ে অফিস পাড়া থেকে শুরু করে চায়ের দোকান সর্বত্র নির্বাচনী আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

 

সাধারণ ভোটার ও বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় অনেকটা নীরব রয়েছেন তাদের কর্মী সমর্থকরা। তবে যত সময় যাচ্ছে উপজেলার আওয়ামী সমর্থকদের ভোট আদায়ে নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছেন বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীরা।

 

উপজেলার নির্বাচনের লড়াইয়ে থাকা বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের এসব ভোটারদের নিজেদের দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে নানা কৌশলে হার হামেশাই উদ্বুদ্ধ করছেন।

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড, আকবরশাহ-পাহাড়তলী আংশিক) আসনে ৯ প্রার্থীরা হলেন, ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী এফসিএ, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী চৌধুরী, হাতপাখা প্রতীকে ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা ক্বারী দিদারুল মাওলা, ট্রাক প্রতীকে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী এটিএম পারভেজ, মোমবাতি প্রতীকে ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থী মো. সিরাজউদ্দৌলা, কাস্তে প্রতীকে সিপিবি’র প্রার্থী মো. মছিউদদৌলা, একতারা প্রতীকে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম চৌধুরী, মাথাল প্রতীকে গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী জাহিদুল আলম ও বই প্রতীকে নেজামে ইসলাম পার্টির প্রার্থী জাকারিয়া খালেদ।

 

ভোটাররা জানিয়েছেন, তিন শতাধিকের অধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান ও দেশের একমাত্র জাহাজ ভাঙ্গা কারখানা বেষ্টিত সীতাকুণ্ড উপজেলার এ আসনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিতর্কিত নির্বাচনগুলো বাদ দিলে ১৯৭০ সাল থেকে এই আসনে যেই দলের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দলই সরকার গঠন করেছে। প্রতিবারের ন্যায় তাই এবারও এ আসনটিকে ঘিরে বাড়তি নজর থাকবে সব দলের।

 

উপজেলা নির্বাচনী অফিস সূত্রে জানা গেছে, একটি পৌরসভা, ৯টি ইউনিয়ন ও চসিকের দুটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ আসনটির মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৩৮০ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩৫ হাজার ৩৫২ জন। নারী ভোটার ২ লাখ ১৩ হাজার ১৬ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) ভোটার ১২ জন।

 

উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, এ আসনটিতে পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের জন্য নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ৫ হাজার ১৪৯ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ হাজার ৫৩২ জন ও নারী ভোটার ৬০৭ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ১২৪ টি। ভোটকক্ষের সংখ্যা ৭৮৮ টি।

 

বিএনপি নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, সীতাকুণ্ডে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে তিনি উপজেলা বিএনপির তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সুসংগটিত করে রেখেছেন। বিগত সময়ে জেল জুলুমসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুরুতেই এ আসনটিতে তাকে বাদ দিয়ে উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সালাউদ্দিনকে মনোনয়ন দিলে আসলামপন্থী কর্মীরা মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। পরে চূড়ান্ত তালিকায় আসলাম চৌধুরীকে রাখা হলে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে প্রশান্তি ফিরে আসে। বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে আসলাম চৌধুরী বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন বলে আশাবাদী নেতাকর্মীরা।

 

এ আসনে বিএনপির শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে মাঠে রয়েছেন ১০ দলীয় জোটের জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী চৌধুরী। একসময়ে ছাত্রশিবিরের রাজনীতিতে হাতে খড়ি হওয়া এ প্রার্থী বর্তমানে উত্তর জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত রয়েছেন। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসাবে এলাকায় দারুণ পরিচিতি রয়েছে তার। ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে উপজেলার প্রতিটি এলাকায় গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। বিএনপি’র প্রার্থীকে ছাপিয়ে এই আসনে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করতে তার পাশাপাশি জামায়াতে সুশৃঙ্খল নারী-পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত কর্মী বাহিনী ভোটারদের মন জয় করতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এবার এ আসনটিতে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী বিপুল ভোটে জয় লাভ করবেন বলে আশাবাদী তার কর্মী সমর্থকেরা।

 

 

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে উপজেলাজুড়ে ততই প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকরা। এ আসনটিতে নির্বাচনে ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করলেও ওই দুই প্রার্থীর বাইরে অন্য প্রার্থীদের গণসংযোগ কিংবা প্রচার-প্রচারণা তেমন একটা নেই বললেই চলে। তবে সম্প্রতি কাস্তে প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা কমিউনিস্ট প্রার্থী মো. মছিউদদৌলা ও একতারা প্রতীকে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির প্রার্থী শহিদুল ইসলাম চৌধুরী সীতাকুণ্ড প্রেস ক্লাবে কর্মরত গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে মতবিনিময় করে নির্বাচনের জানান দেন।

 

 

প্রতিনিয়ত গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। গণসংযোগকালে তিনি বলেন, বড় বড় প্রজেক্ট দরকার হলেও প্রান্তিক লেভেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নযজ্ঞ সাধন করা গেলে দেশের কোনো এলাকায় বঞ্চিত বা অবহেলিত থাকবে না। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সকল এলাকার প্রয়োজনমতো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। সীতাকুণ্ড একটি সম্ভাবনাময় এলাকা। এখানে কৃষির সাথে শিল্পের সমন্বয় ঘটানো গেলে পুরো সীতাকুণ্ডের চেহারাই আমুল বদলে যাবে।

 

আসলাম চৌধুরী বলেন, নির্বাচন আসলে অনেকেই মিথ্যা আশ্বাসের বুলি ছাড়েন। আমি সেটাতে অভ্যস্ত নই। তাছাড়া প্রতিপক্ষ প্রার্থীদেরকেও আমি সম্মান করি। আর তাই এখন পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে আমি কোনো বিরূপ মন্তব্য করিনি। এটাই আমাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার। আমি সবাইকে আহ্বান জানাবো নেতিবাচক প্রচার প্রচারণা ছেড়ে ইতিবাচক হোন, নিজের যোগ্যতা ও পরিকল্পনা উপস্থাপন করুন। এতে করে সবার মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্প্রীতি বজায় থাকবে।

 

অন্যদিকে বিএনপি’র পাশাপাশি গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী চৌধুরী। তিনি ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, চিহ্নিত করছেন এলাকার সমস্যা। এ আসনে বিজয়ী হয়ে সকল সমস্যা নিরসনের দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি। তিনি জয়লাভে নিয়মিত গণসংযোগ ছাড়াও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন। ফুরফুরে মেজাজে থাকা জামায়াতের এ প্রার্থীর নির্বাচন ঘিরে ভালোই প্রস্তুতি রয়েছে বলে ধারণা সাধারণ ভোটারদের।

 

জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মোহাম্মদ তাহের বলেন, সীতাকুণ্ডের ভোটাররা বিগত সময়ে অনেককেই প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করলেও তারা সীতাকুণ্ডের কাক্সিক্ষত উন্নয়নে তেমন ভূমিকা পালন করেনি। যার ফলে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। অপরাধমুক্ত ইনসাফের সীতাকুণ্ড গড়ে তুলতে এবারের ভোটাররা দাঁড়িপাল্লা প্রতীককে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবেন বলে আশাবাদী তিনি।

 

সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, ‘নির্বাচনকে ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার কাজ করা হচ্ছে। সেই সাথে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনায় প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’

 

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট