
একসময় তার মঞ্চে ওঠা মানেই ছিল হাসির বিস্ফোরণ। সংলাপ শেষ হওয়ার আগেই দর্শকের হাততালি আর হো হো হাসিতে ঢেকে যেত চারপাশ। যার অভিনয়ে মুহূর্তেই হালকা হতো ক্লান্ত মানুষের মনখারাপী, যিনি অন্যের চোখের জল মুছে দিতেন হাসির ঝলকে, আজ সেই মানুষটির নিজের চোখের কোণেই জমে আছে অসহায়ের আর্দ্রতা। অবশ শরীর, অভাব-অনটনের সংসার আর ছোট্ট ঘরের চার দেয়াল-এই সীমার ভেতরেই যেন থেমে আছে সাড়ে চার দশকের সরব জীবনমঞ্চ।
যাকে নিয়ে এত এত বেদনার খতিয়ান, তিনি আর কেউ নন-দিলীপ হোড়। যদিও প্রাণবন্ত অভিনয়ের কীর্তিতে ঢাকা পড়ে গেছে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার এই কিংবদন্তি অভিনেতার সেই আসল নাম। দর্শকদের কেউ তাকে চেনেন ‘মেরামিয়া’ নামে, কেউবা বলেন ‘মিডা চুন্ চুইন্না’। চট্টগ্রামের মঞ্চে একসময়ের জ্বলজ্বলে তারার চেয়েও বেশি আলো ছড়ানো দিলীপ হোড়ের জীবন আজ একেবারেই নিভু নিভু।
হাসির আড়ালের মানুষটা: ১৯৫৫ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের আলামপুর গ্রামে দিলীপ হোড়ের জন্ম। জীবনের প্রারম্ভে জড়িয়েছিলেন ব্যবসাতে। কিন্তু শুধু লস আর লস। শেষ পর্যন্ত কৈশোরের প্রেম-অভিনয়ই হয়ে উঠলো আজীবনের ঠিকানা। ১৯৭৬ সালে মঞ্চে পা রাখা। সেই শুরু। ২০২০ সাল পর্যন্ত সাড়ে চার দশক কাটলো ক্যামেরার সামনে, মঞ্চের কাতারে। এই সময়ে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, শর্টফিল্ম, আঞ্চলিক নাটক, গান ও বিজ্ঞাপন-কোথায় অভিনয় করেননি দিলীপ হোড়? ডাক পড়েছিল এফডিসিতেও। নব্বইয়ের দশকে খ্যাতিমান অভিনেতা জসিম-ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গেও ভাগ করেছেন অভিনয়।
কিন্তু সেই অভিনয়ের আলো সংসার পর্যন্ত পৌঁছায়নি কোনোদিন। যে অল্প আয় হতো তা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরাতো। তবুও আনন্দে যেন তিনি থাকতেন কোটিপতি। কেননা দিলীপের কাছে যে অর্থকড়ির চেয়ে মানুষের ভালোবাসাকেই বড় মনে হতো।
বিছানাবন্দী জীবন: দেওয়ান বাজারের দিদার মাকের্টের পেট ছিঁড়ে পূর্বের দিকে সড়কটি যতই এগিয়েছে ততই ছোট হয়েছে। সাপের মতো আঁকাবাঁকা সেই গলিপথ পেরিয়ে কিছুদূর যেতেই সামনে হাজির ‘২৫ কামড়ার মোড়’। এই মোড়ের ডান পাশের পুরনো ভবনটির তিন তলার বাসাটির দুয়ার খুলতেই যেন বেরিয়ে এলো হাহাকার মেশানো বাতাস। রেকসিনে ঢাকা পুরনো খাটে কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে আছেন দিলীপ হোড়। জীর্ণ শরীরের সঙ্গে যুক্ত প্রস্রাবের নল গিয়ে পড়েছে বালতিতে।
অভিনয়ের গল্প শুনতে চাই-বলতেই সানন্দে কাঁপাকাঁপা গলায় নিজের পুরনো ইতিহাসের একটা একটা পাতা যেন খুলতে শুরু করেন দিলীপ। তবে পাশে বসা পঞ্চান্ন বছরের স্ত্রী মিনা হোড় একেবারেই নির্বাক, স্বামীর সেই গরিমা নিয়ে এক বিন্দুও যেন গর্বিত নন। অভিমানী মিনা খুলে বললেন কারণ, ‘বিয়ের পর থেকে আমার সময়টা কাটছে কষ্টে কষ্টে। স্বামীর জীবন গেলো অভিনয়ে অভিনয়ে, আর আমাকে সংসার চালানো থেকে দুই ছেলে-মেয়েকে মানুষ করতে হয়েছে একা হাতে। এখন পাঁচ বছর ধরে বিছানাবন্দী প্যারালাইজড স্বামীকে টানতে টানতে আমি বড় ক্লান্ত।’
দিলীপ হোড়ের এই অসুস্থ জীবনের শুরু পাঁচ বছর আগে। তখন হাতে কাজ নেই, কেউ আর ডাকছেও না। সেই কষ্ট ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিয়েছিল দিলীপকে। হঠাৎ হঠাৎ পড়ে যেতেন বিছানা থেকে। হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বড় কোনো সমস্যা মিলল না। আবারও অসুস্থ হলে স্বজনেরা ধরাধরি করে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাঁটতে হাঁটতে যে মানুষটা হাসপাতালে গিয়েছিলেন, সেই তিনি বাসায় ফিরলেন প্যারালাইজড হয়ে। তারপর থেকে বিছানাবন্দী জীবন, সেখানেই খাওয়া, সেখানেই প্রাকৃতিক কাজ সারা।
তবে শারীরিক কষ্ট ভুলে দিলীপ গল্প করতে চাইলেন অভিনয় নিয়েই। এই মাসেই ৭২ বছর ছুঁয়েছেন। তবুও অভিনয়ের সেই স্মৃতি যেন কিছুতেই ঘোলাটে হওয়ার নয়! গড় গড় করে তুলে ধরছিলেন সেই জীবনের খণ্ড খণ্ড দৃশ্যগুলো। স্বামীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মিনা হোড় বলে উঠলেন, ‘কি লাভ হলো এই অভিনয় করে। এখন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছো, আমরা ছাড়া তো কেউই খবরও নেয় না।’
স্ত্রীর কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলেন দিলীপ হোড়। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘কে আর মনে রেখেছে আমায়।’ চোখের কোণে তখন চিকচিক করে ওঠে জল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। ম্লান আলোটুকু নিভে আসে একটু পর। এবার দিলীপ হোড়ের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার পালা। এমন সময় কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন চাঁটগাইয়্যা ভাষার অভিনয়ের এই ‘কিং’। তবে বাতাসের গায়ে কেউ যেন তার হয়ে লিখে দেয় সেই আর্তি-‘৪৫ বছর ধরে যেভাবে হাসিয়েছি, সেই ঋণটা এবার শোধ করুন।’ রাষ্ট্রের কানে কি পৌঁছাবে মেরামিয়ার এই আকুতি?