
চট্টগ্রামের একমাত্র দ্বীপ আসন চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ)। বঙ্গোপসাগর ও মেঘনার ক্রমাগত ভাঙন, অনুন্নত স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা এবং নৌ-যোগাযোগ দ্বীপের মানুষের অন্যতম সমস্যা হলেও রয়েছে অবারিত সম্ভাবনাও। বিপুল সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্পের বিকাশ, ইকোনমিক জোন ও নৌবন্দর তৈরি, পরিকল্পিতভাবে মৎস্য, কৃষি, পশুখামারে বিনিয়োগের হাতছানি এবং জেগে ওঠা চর আশা জাগাচ্ছে দ্বীপবাসীকে। তাই আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরাও ভোটারদের কাছে দ্বীপের এসব সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা যেমন তুলে ধরছেন, তেমনি নির্বাচিত হলে সমস্যা সমাধানেরও আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন।
দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপের বর্তমান আয়তন প্রায় ৬৪ বর্গমাইল। অথচ পাঁচ দশক আগেও দ্বীপের আয়তন ছিল প্রায় ৫৬০ বর্গমাইল। ভাঙতে ভাঙতে তা আজকের এ অবস্থায় এসে ঠেকেছে। তাতে বসতঘর, জমি-জমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে সন্দ্বীপের অজস্র পরিবার। অনেকে বসতঘর পরিবর্তন করেছেন একাধিকবার। তাতে অসহায়-নিঃস্ব হয়ে অনেকে ছেড়েছেন সন্দ্বীপও। এত কিছুর পরও সন্দ্বীপের মানুষ এখনও স্বপ্ন দেখে ঘুরে দাঁড়াবার। বিগত কয়েক বছর ধরে সন্দ্বীপে একের পর এক জেগে উঠছে চর। এতে আশায় বুক বাঁধছে সন্দ্বীপের মানুষ।
এ অবস্থায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় মুখর সন্দ্বীপের জনপদ। বর্তমানে নির্বাচনী মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় রয়েছেন চার প্রার্থী। তারা হলেন- বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা (ধানের শীষ),জামায়াতে ইসলামীর আলাউদ্দিন শিকদার (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুহাম্মদ আমজাদ হোসেন (হাতপাখা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মোনায়েম মাওলা (ফুটবল)। গত কয়েকদিন ধরে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া বাকিরা পথসভা, গণসংযোগ ও মাইকিংসহ নানামুখী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থক নিয়ে প্রার্থীরা ঘুরছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে।
স্থানীয়রা বলছে, আগামী নির্বাচনে এ আসনে প্রার্থীদের বিজয়ে কাজ করছে চার ফ্যাক্টর। প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, দলের নিজস্ব ভোটব্যাংক, তরুণ ও নারী ভোটারের মাঝে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ভোট নিজেদের পক্ষে নেওয়া- এ চার বিষয় মাথায় রেখে নির্বাচনী মাঠে কাজ করছেন প্রার্থীরা। এসব বিষয় অনুকূলে যে প্রার্থীর থাকবে তারই জয়লাভের সম্ভাবনা থাকবে বেশি।
সন্দ্বীপের সমস্যা-সম্ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সদস্য ও উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন পূর্বকোণকে বলেন, বিপুল সম্ভাবনা থাকার পরও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে সন্দ্বীপের কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। আগামীতে সরকার সন্দ্বীপের সমস্যা-সম্ভাবনার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করবে- এ প্রত্যাশা সবসময়।
নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, সন্দ্বীপ আসনে মোট ভোটার ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৮৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭২০ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৬৩ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন দু’জন। অনুমোদিত পোস্টাল ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ৭৮৫ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৮৩টি।
নির্বাচিত হলে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশা পূর্বকোণকে বলেন, সন্দ্বীপকে শান্তির জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে নদীপথে জনদুর্ভোগ নিরসনে আধুনিক নৌ-যোগাযোগব্যবস্থা চালু, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত সন্দ্বীপ গড়াই আমার প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আলাউদ্দিন শিকদার পূর্বকোণকে বলেন, নির্বাচিত হলে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, দুর্নীতি হ্রাস ও নৌ-যাতায়াত সিন্ডিকেটমুক্ত করা হবে। সন্দ্বীপের নৌঘাট, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ব্যবস্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট দূরীকরণসহ বঞ্চিত জায়গাগুলোর উন্নয়ন নিয়ে কাজ করবো।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলেন, সন্দ্বীপ আর অবহেলার দ্বীপ থাকবে না- এটা হবে সম্ভাবনার দ্বীপ। চিকিৎসার জন্য আর শহরে ছুটতে হবে না, চিকিৎসা হবে সন্দ্বীপেই। আমাদের সন্তানেরা আর বেকার থাকবে না- শিক্ষা ও কর্মসংস্থান একসাথেই গড়বো। নিরাপদ নৌপথ মানেই জীবন নিরাপদ। নেওয়ার জন্য নয়, সন্দ্বীপবাসীকে দেওয়ার জন্যই আমি রাজনীতিতে এসেছি।
পরিসংখ্যান মতে, স্বাধীনতার পর ১২টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সন্দ্বীপ আসনে সর্বোচ্চ ছয়বার জয়লাভ করে। এরপর বিএনপির অবস্থান। দলটির প্রার্থীরা তিনবার বিজয়ী হন। জাতীয় পার্টি, গণফ্রন্ট ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার করে জয়লাভ করেন। বিএনপি যে তিনবার এ আসনে জয়লাভ করে, প্রতিবারই প্রার্থী ছিলেন মোস্তফা কামাল পাশা। আওয়ামী লীগের ছয়বারের মধ্যে দু’বার জয়লাভ করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনবার তার জ্যেষ্ঠ পুত্র মাহফুজুর রহমান মিতা।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচনে সন্দ্বীপ আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার ওবায়দুল হক। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন ইসলামী ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী একেএম রফিকুল্লাহ চৌধুরী। ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী একেএম সামশুল হুদা। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন জাতীয় পার্টিতে যোগদান করা একেএম সামশুল হুদা।
একই আসনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের মোস্তাফিজুর রহমান। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা। একই বছর ১২ জুন সপ্তম সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের মোস্তাফিজুর রহমান। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন বিএনপির মোস্তফা কামাল পাশা। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ, ২০১৮ সালে নবম এবং ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ নির্বাচনে পরপর তিনবার বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের মাহফুজুর রহমান মিতা।
পূর্বকোণ/এএইচ