
সোমবার বিকেল তিনটা। কাঁধে ব্যাগ। হন্তদন্ত হয়ে নগরীর জিইসি মোড়ের সড়ক পার হচ্ছিলেন এক শিক্ষার্থী। রাস্তার মাঝপথে এসে দেখতে পান-দ্রুতগতিতে দুই পাশ থেকেই এগিয়ে আসছে গাড়ি। তখন ঝুঁকি নিয়ে এক দৌড়ে সড়ক পার হন ওই তরুণ। যেন হাফ ছেড়ে বাঁচেন ওই শিক্ষার্থী।
কাছে গিয়ে জানতে চাইলে ১৭ বছরের ছেলেটি জানান, তার নাম সাজিদুল হাসান। ওমরগণি এমইএস কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়েন তিনি। প্রতিদিন বাসা থেকে জিইসি মোড় পার হয়ে ও আর নিজাম রোড আবাসিক এলাকায় কোচিংয়ে যেতে হয় তাকে। এভাবে ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হওয়া নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘কী করবো, কোনো ফুটওভার ব্রিজ নেই। প্রতিদিন তাই ঝুঁকি নিয়ে প্রাণ হাতে নিয়ে আমাদের সড়ক পার হতে হয়।’
অবশ্য পথচারীদের নিরাপদ পারাপারে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। ২০২৪ সালের ফেব্রæয়ারিতে সেটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। কিন্তু গত দুই বছরে ফুটওভার ব্রিজগুলোর কাজের অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ। ফলে প্রতিনিয়ত পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার করতে হচ্ছে। শুধু এই মোড়ে নয়, নগরীর ৩১টি ব্যস্ততম মোড় ও এলাকায় ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের চার বছরেও ২৭টি ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজই শুরু হয়নি। বাকি ১১টির মধ্যে মাত্র তিনটির কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। ৮টির কাজ চলমান রয়েছে। তবে জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে সবগুলো ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজ শেষ করা হবে বলে জানান চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৩৮টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কথা ছিল। ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৫৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের প্রথম মেয়াদ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেই মেয়াদেও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, নগরীর লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত সড়কে ১১টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে বলে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) উল্লেখ করা হয়েছিল। দুটি করে পদচারী-সেতু নির্মাণ হবে টাইগারপাস, জিইসি, ষোলোশহর ২ নম্বর গেট, অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, অলংকার ও সিটি গেট মোড়ে।
এছাড়া লালখানবাজার, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, বাদামতলী, বারিক বিল্ডিং, নিমতলা, সল্টগোলা ক্রসিং, সিমেন্ট ক্রসিং, কেইপিজেড, কাঠগড়, মুরাদপুর, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, টেকনিক্যাল, একে খান, সাগরিকা, নয়াবাজার, রুবি গেট, কুলগাঁও স্কুলের সামনে, মনসুরাবাদ, এক্সেস রোডের মুখে, মহিলা কলেজের মোড়ে, সরাইপাড়া স্কুলের মোড়, আকবরশাহ ও সানোয়ারা স্কুলের মোড়ে একটি করে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করার কথা রয়েছে।
প্রকল্প সূত্র জানায়, বর্তমানে তিনটি ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ ও ৮টির কাজ চলমান রয়েছে। ৭টির বিষয়ে দরপত্র মূল্যায়ন করছে কর্তৃপক্ষ। ১১টির নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে। চারটি কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। টাইগারপাসে দুইটি ও লালখান বাজারে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) বলা হয়েছে। এছাড়া জিইসি ও ২ নম্বর গেট মোড়ে নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে ফুটওভার ব্রিজ না থাকায় শুধু পথচারীরা নন, বিপাকে আছেন যানবাহনের চালক ও চালকের সহকারীও। কয়েকজন চালক ও চালকের সহকারী বলেন, ‘ফুটওভার ব্রিজ থাকলে মোড়ের উপর চাপ অনেক কমে যেত। পথচারীরা সেতু ব্যবহার করে সহজেই পারাপার হতে পারতেন। এতে আমাদের গাড়ি চালাতে সমস্যায় পড়তে হতো না।
জিইসির মোড় ও দুই নম্বর গেটে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কাজ পাওয়া খান কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মো. হাবিব উল্লাহ খান বলেন, ‘সাবেক মেয়র রেজাউল করিমের আমলে জিইসির ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু হলেও তখন যুবলীগ নেতারা বাধা দেন। যা তৎকালীন মেয়রও সমাধান করতে পারেননি। এখনো বিভিন্ন সংস্থার ইউটিলিটির সার্ভিস লাইন নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা যাচ্ছে। এগুলো সমাধানের জন্য আমরা বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সাথে দেখা করেছি। তা দ্রুত সমাধান করা হবে বলে মেয়র আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।’
চার বছরেও কেন ২৭টি ফুটওভার ব্রিজের নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি- জানতে চাইলে চসিকের প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ শুরু করতে গিয়ে নকশা পরিবর্তন ও লোকেশন পরিবর্তন করতে হয়েছে। নির্মাণকাজ শুরুর আগে অনেক সেবাপ্রদানকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে। দেখা গেছে, সেতুর জন্য নির্ধারিত স্থানের নিচে বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন চলে গেছে। এসব বিষয়েও সমাধান করতে হচ্ছে।’
আনিসুর রহমান আরো বলেন, ‘এছাড়াও মাটির নিচে সার্ভিস লাইন, উপরে বিদ্যুৎ লাইনসহ কাজ শুরু করার আগে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিয়েছে। কোন কোন জায়গায় জলাবদ্ধতা প্রকল্পের জন্য কাজ শুরু করা যায়নি। ইতোমধ্যে সবগুলো ড্রয়িং-ডিজাইনের কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে পুরোদমে কাজ চলছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। তবে প্রকল্প শেষ করতে হয়তো ২০২৭ সালের ডিসেম্বর হবে। এরমধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ হবে।’
এ বিষয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘যে কয়েকটি ফুটওভার ব্রিজের কাজ এখনো শুরু হয়নি তা দ্রæত শুরু করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এগুলোর ডিজাইন ও টেন্ডার হয়ে গেছে।’
পূর্বকোণ/ইবনুর