শীতের শহরে উষ্ণতার কেনাবেচা
‘এলাম আবার যেন-তুষারের রাজ্যে,
ঝিম্-ঝিম্ হিম ঝরে-অবিরাম আজ যে;
আবার শীতের শুরু-দেহ কাঁপে দুরু দুরু,
হিমেল জোয়ার এলো-দুনিয়ার মাঝ যে!’
প্রখ্যাত কবি সুনির্মল বসুর ‘শীত এলো’-কবিতার মতোই এবার দেশের শহর থেকে গ্রাম-সবখানেই ঝাঁকিয়ে শীত পড়ছে। প্রচণ্ড ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে দুপুরেও সূর্যের দেখা মিলছে না। রেকর্ডভাঙা এই তীব্র শীতে কাঁপছে জনজীবন। স্বাভাবিকভাবেই এবার শীতের কাপড়ের চাহিদাও বেশি। চট্টগ্রামের অভিজাত শপিংমল থেকে হকার্স মার্কেট, ফুটপাত থেকে পাইকারি বাজার-সবখানেই চলছে গরম কাপড় কেনার ধুম। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে চলতি শীত মৌসুমের তিন মাসে চট্টগ্রামে প্রায় হাজার কোটি টাকার শীতবস্ত্র বিকিকিনি হতে পারে।
এখন হাত বাড়ালেই মিলছে গরম কাপড়। তবে চট্টগ্রামের সুলভ মূল্যের জন্য চারটি বাজার হয়ে ওঠে গরম কাপড়ের প্রধান গন্তব্য। চাদর থেকে কম্বল, জ্যাকেট থেকে সুয়েটার-হুডির জন্য সুখ্যাত সেই বাজারগুলোর গল্প বলা যাক এবার।
জহুর হকার্স মার্কেট: বুধবার বিকেল চারটা। চট্টগ্রামের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে অতি পরিচিত জহুর-হকার্স মার্কেটের আমতলের প্রবেশমুখে তখন আর পা ফেলার জায়গা নেই। মানুষের ঢেউ কেটে কেটে যতই মার্কেটের ভেতরে ঢুকবেন দুই পাশ থেকেই কানে ভেসে আসবে দোকানিদের হাঁক-ডাক। এখানকার তিনটি মার্কেটে প্রায় ১ হাজার দোকান আছে। এরমধ্যে বড় দোকানের সংখ্যা ২০০, মাঝারি ৩৫০। বাকিগুলো ছোট। শীতের আগের এসব দোকানে শার্ট-প্যান্ট-টি-শার্ট বিক্রি হলেও এখন গরম কাপড় বিক্রি শুরু হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান হকার্স মার্কেটে মেয়েদের সোয়েটার ও জ্যাকেটের দাম মানভেদে
২০০ থেকে ৮০০ টাকা, ছেলেদের সোয়েটার ১০০ থেকে ৫০০ টাকা, ছেলেদের জ্যাকেট ৩০০ থেকে ৩০০০ টাকা, বাচ্চাদের সোয়েটার ৫০ থেকে ৬০০ টাকা, মাফলার ৪০ থেকে ২০০ টাকায় এবং গরম টুপি ৫০ থেকে ২৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
কম্বলের জন্যেও এই বাজার বেশ জনপ্রিয়। এখানকার মেসার্স তৈয়ব ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহাদাত হোসেন সোহেল পূর্বকোণকে বলেন, ‘গত বছর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনসহ নানা অস্থিরতার কারণে শীতের কাপড় কম বিক্রি হয়েছিল। সেই তুলনায় এবার বিক্রি বেশি। তবে একদিকে শীতের তীব্রতা, অন্যদিকে নির্বাচনের মৌসুমÑভেবেছিলাম ব্যাপক বিক্রি হবে। কিন্তু সে অনুযায়ী-বিক্রি কম।’
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হকার্স মার্কেটে মানভেদে ১৪০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা দামের কম্বল মিলছে।
খাতুনগঞ্জ: খাতুনগঞ্জে ব্যবসায়ীরা সারা বছরই যুক্ত থাকেন ভোগ্যপণ্যের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে। তবে শীত এলেই এখানকার আমির মার্কেটসহ বিভিন্ন মার্কেটের ৫০ থেকে ৬০টি দোকানের ব্যবসায়ীরা আমদানি করেন পুরনো শীতের কাপড়। তবে এবার প্রায় ২০০ ব্যবসায়ী এই খাতে যুক্ত হয়েছেন। তাইওয়ান, চীন, কোরিয়া ও জাপান থেকে আমদানি করা এসব পুরাতন কাপড়ের গাঁট মূলত নি¤œ ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য। চলতি মৌসুমে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা শতকোটি টাকার ব্যবসার কথা জানিয়েছেন।
খাতুনগঞ্জের আমির মার্কেটের আজিম বিল্ডিংয়ে অবস্থিত মেসার্স মনজুর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারীদের একজন মোহাম্মদ ইউসুফ পূর্বকোণকে বলেন, ‘এবার শীতের কাপড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে শীতের শুরুতে আমদানি মূল্য বেশি ছিল। পরবর্তীতে দাম পড়ে যাওয়ার পর ব্যাপক আমদানি হয়েছে। এ কারণে দামও কম।’
রিয়াজউদ্দিন বাজার ও তামাকুম-ি লেন: চট্টগ্রামের বৃহত্তম শীতের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত রিয়াজউদ্দিন বাজার ও তামাকুম-ি লেন। এখানে ১২৫টি মার্কেটে প্রায় ১৫ হাজার দোকান রয়েছে। চট্টগ্রাম তো বটেই, আশপাশের জেলার খুচরা ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে কাপড় কেনেন। প্রায় ১৫টি পথ দিয়ে বিশাল এই বাজারে প্রবেশ করা যায়। এখানে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার গরম পোশাক তো মেলে। সুন্দর কারুকাজের চাদরের জন্যও এটি বিখ্যাত।
তামাকুম-ি লেন বণিক সমিতির অধীনে ১১০টি মার্কেট রয়েছে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক পূর্বকোণকে বলেন, ‘এবার যেহেতু শীত বেশি পড়ছে ব্যবসাও ভালো হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে আরও বেশি হতো। আশা করছি নির্বাচনের পর আমাদের সুদিন ফিরবে।’
তামাকুমন্ডি ও রিয়াজউদ্দিন বাজার-এই দুই বাজার মিলিয়ে ১৫ হাজার দোকানের মধ্যে ৩৫ শতাংশ দোকান শীতের কাপড়ের ব্যবসা করছে। প্রতিদিন সব দোকান মিলিয়ে কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সবমিলিয়ে এই শীত মৌসুমে অন্তত ৭০০ কোটি টাকার ব্যবসার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
টেরিবাজার: ৮২টি মার্কেট আর তিন হাজার দোকান নিয়ে ঐতিহ্যবাহী টেরিবাজার শাড়ি ও থান কাপড়ের জন্য পরিচিত হলেও শীতে পশমি চাদর ও শিশুদের পোশাকের বড় বাজারে পরিণত হয়।
টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মান্নান বলেন, ‘টেরিবাজার মূলত পোশাক ও প্রসাধনীর জন্য বিখ্যাত। তবে শীত মৌসুমে অনেক ব্যবসায়ী গরম কাপড় নিয়ে আসেন। ব্যবসা ভালো হলেও এই মৌসুমে কত টাকার ব্যবসা হবে-সেটি এখনি বলা যাচ্ছে না।’ এছাড়া নগরের নিউমার্কেট মোড়, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, দুই নম্বর গেটসহ বিভিন্ন ফুটপাতে নতুন-পুরনো শীতের কাপড়ের জমজমাট বিক্রি চলছে। একইসঙ্গে ব্যস্ত সময় পার করছেন লেপ-তোশক তৈরির কারিগরেরাও। শীতের এই তীব্রতায় চট্টগ্রামের বাজারগুলো যেন হয়ে উঠেছে উষ্ণতার নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।