চট্টগ্রাম বুধবার, ০৭ জানুয়ারি, ২০২৬

সর্বশেষ:

ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ চট্টগ্রামে

শীতের তীব্রতায় হাসপাতালে ভিড় বেড়েছে শিশু ও বয়ষ্কদের

ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ চট্টগ্রামে

ইমাম হোসাইন রাজু

৬ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

ঘড়ির কাঁটা সকাল সাড়ে ১০টা। সূর্যের আলো তখনো দেখা দেয়নি। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে মায়ের কোলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ঢোকে দুই বছরের এক শিশু। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, বার বার দিচ্ছে কাশি। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়- একটি শয্যায় শিশুটিকে রেখে নেবুলাইজার দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। পাশের বেডগুলোতেও একই দৃশ্য। কেউ জ্বরে কাঁপছে, কেউ দুর্বল হয়ে পড়েছে ডায়রিয়ায়।

 

বিভিন্ন ওয়ার্ডে ঘুরে দেখা যায়, শিশুদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি এবং ডায়রিয়ার উপসর্গে ভুগছে অনেকে। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। শুধু হাসপাতাল নয়, চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও ঠান্ডাজনিত রোগী বেড়েছে।

 

সারাদেশের মতো চট্টগ্রামে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে তীব্র শীত অনুভ‚ত হচ্ছে। ভোর ও রাতে শীতের তীব্রতা বেশি থাকছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার চট্টগ্রামের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের দিনের তুলনায় কম। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, হাড় কাঁপানো এই পরিস্থিতি আরও অন্তত দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে।

 

শিশুদের মধ্যেই সংক্রমণ বেশি: চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শীতে ঠান্ডাজনিত সর্দি, কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। বাচ্চারা শ্বাসতন্ত্রের নানা ধরনের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও এজমায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

 

চমেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাসে শূন্য থেকে পাঁচ বছর বয়সী দেড় হাজারের বেশি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ শতাংশ নিউমোনিয়া ও ৬ শতাংশ ডায়রিয়া রোগী ছিল। ডিসেম্বরে নিউমোনিয়ার রোগী কিছুটা কমলেও বর্তমানে শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যা বেশি।

 

হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ: চট্টগ্রামের বৃহৎ চমেক হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল এবং চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শীতকালীন রোগে আক্রান্ত শিশু রোগীর চাপ অন্য সময়ের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের দুটি ইউনিটে গতকাল ১৮১ জন শিশু ভর্তি ছিল। নতুন ভর্তি হয়েছে ৫২ জন। ভর্তি রোগীদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যাই বেশি।
চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা জানান, সাধারণত শীতের শুরু ও শীতের শেষের দিকে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেশি থাকে। বর্তমানে নিউমোনিয়ার তুলনায় ডায়রিয়ার রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে।

 

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ক্রিটিক্যাল কেয়ারের সহকারী অধ্যাপক ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেন, বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে বহির্বিভাগে শিশু রোগীর সংখ্যা বেশি। বিশেষ করে সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুরা বেশি আসছে। ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, শীতে শিশুদের অসুখ হওয়া কমন হলেও তা কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না।

 

বৃদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীর ঝুঁকি : শীতের এই সময়ে শিশুদের পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা। চমেক হাসপাতালের রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. মুহাম্মদ দিদারুল আলম বলেন, শীতকালে কমন কোল্ড, ব্রংকিওলাইটিস, ভাইরাল ফ্লু ও নিউমোনিয়ার রোগী বাড়ে। সম্প্রতি সময়ে বিশেষ করে এজমা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ও চিকিৎসকের চেম্বারে রোগীর ভিড় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ডায়াবেটিস, কিডনি ও একাধিক রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

 

কেন বাড়ছে শীতকালীন রোগ: বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায় এবং ধূলিকণার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ সহজে ছড়ায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শীতকালীন রোগ প্রতিরোধে শিশুদের গরম কাপড় পরানো, মাথা ঢেকে রাখা, কুসুম গরম পানি পান করানো এবং অহেতুক বাইরে না নেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। ঠান্ডা লাগলে বা কাশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এন্টিবায়োটিক সেবন করানো উচিত নয়। পাশাপাশি যাদের শ্বাসকষ্ট বা এজমার সমস্যা রয়েছে, বিশেষ করে ২ বছরের বেশি বয়সী শিশু ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, তীব্র শীতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্করা নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে বেশি আক্রান্ত হয়।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট