চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৭ মার্চ, ২০২৫

লোহাগাড়া থানার পিস্তল লুট করে বাবুল, বিক্রি করে রিয়াদ-বক্কর

নাজিম মুহাম্মদ

২৪ মার্চ, ২০২৫ | ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ

সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে নিহত নেজাম উদ্দিনের মৃতদেহের পাশে পাওয়া পিস্তলটি সরবরাহ করেননি বলে দাবি করেছেন পুলিশ কনস্টেবল রিয়াদ। লোহাগাড়া থানা থেকে লুট করা ব্রাজিলের তৈরি একটি তরাশ পিস্তল নেজামের কাছে বিক্রির কথাবার্তা বলেছিল। যেটি তার তালতো ভাই আবু বক্করের কাছ থেকে নিয়ে দেয়ার কথা ছিল। একই ধরনের আরেকটি অস্ত্র কাঞ্চনার ফরহাদের কাছে বিক্রি করেছেন। তবে কনস্টেবল রিয়াদ অস্ত্র বেচাকেনার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত ছিল। অস্ত্র বেচাকেনার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে গত ২১ মার্চ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন কনস্টেবল রিয়াদ, আবু বক্কার ও মোস্তাফিজুর রহমান।

 

সাতকানিয়ায় নিহত নেজাম উদ্দিনের মৃতদেহের কাছে যে তরাশ পিস্তলটি পাওয়া গেছে সেটি নগরীর কোতোয়ালী থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু। তবে সেই অস্ত্রটি সাতকানিয়ার নেজামের কাছে কিভাবে গেল তা এখনো জানতে পারেনি পুলিশ।

 

পতেঙ্গা থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, কাটগড় থেকে উদ্ধারকরা পিস্তলটি গত বছর আগস্ট মাসে লোহাগাড়া থানা থেকে লুট হওয়া। উদ্ধার করা হয়েছে ব্রাজিলের তৈরি একটি তরাশ পিস্তল ও পিস্তলের সাত রাউন্ড গুলি।

 

অস্ত্র বিক্রি সম্পর্কে রিয়াদ যা বলেন: পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে কনস্টেবল রিয়াদ জানান, ৫ আগস্টের পর তাকে প্রথমে খুলনা পরে চাঁদপুর বদলি করা হয়। ২/৩ মাস বেতনও পায়নি। আর্থিক সংকট থাকার কারণে তালতো ভাই আবু বক্করের কাছে কিছু টাকা ধার চাইলে তিনি বলেন, একটা কাজ আছে। করে দিলে অনেক টাকা পাবেন। বক্কর একটি অস্ত্র (পিস্তল) বিক্রি করে দিতে বলে।

 

কনস্টেবল রিয়াদ বলেন, অস্ত্রটি বিক্রির জন্য তিনি কাঞ্চনার সন্ত্রাসী নেজামের সাথে কথা বলেন। নেজাম অস্ত্র কিনতে রাজি হন এবং অস্ত্রের ছবি খুঁজে। বক্করের কাছ থেকে অস্ত্রের ছবি নিয়ে তিনি নেজামের কাছে পাঠান। দুই তিন দিন পর রিয়াদ সাতকানিয়া গিয়ে নেজামের সাথে কথা বলেন। নেজাম তাকে (রিয়াদ) বলেন, তার দেয়া দামের চেয়ে আরো কম দামে তিনি অন্য জায়গা থেকে একই ধরনের একটি অস্ত্র কিনেছেন।

 

রিয়াদের দাবি, অস্ত্র কেনা বেচা নিয়ে নেজামের সাথে মুঠোফোনে বলা কথাগুলো জানাজানি হলে তাকে মামলা দেয়া হয়। তবে নেজামের কাছে তিনি কোন অস্ত্র বিক্রি করেননি। নেজামের মরদেহের কাছে যে অস্ত্রটি পাওয়া গেছে সেটি অন্য জায়গা থেকে কেনা।

 

লোহাগাড়া থেকে অস্ত্রটি যেভাবে আসলো নগরে: নগরীর কাটগড় থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে গত ২১ মার্চ পতেঙ্গা থানায় অস্ত্র আইনে একটি মামলা দায়ের করেন কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক মো. আফতাব হোসেন। মামলার আসামিরা হলেন, সাতকানিয়ার কাঞ্চনা ইউনিয়নের মো. সোলাইমানের ছেলে আবদুল গণি (৩৮), সাতকানিয়ার পৌরসভার ছমদর পাড়ার আবু হানিফের ছেলে আবু বক্কর (৩০), মধ্যম কাঞ্চনার মৃত হাজি আব্দুল ছত্তারের ছেলে ফরহাদ হোসেন (৪১), একই এলাকার শফিকুর রহমানের ছেলে পুলিশ কনস্টেবল মো. রিয়াদ (২৯), সাতকানিয়ার পশ্চিম ঢেমশার মৃত আজিজ মিছিরের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান প্রকাশ গুরুজ (৫২) ও রূপকানিয়া গ্রামের মৃত হাকিম আলির ছেলে মো. ইসহাক (৫০)।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট লোহাগাড়া থানা থেকে পিস্তলটি লুট করেন মূলত লোহাগাড়র চুনতি এলাকার বাবুল নামে এক ব্যক্তি। মোস্তাফিজ ও ইসহাক ২০ হাজার টাকার বিনিমিয়ে অস্ত্রটি নগরীতে বক্করের কাছে নিয়ে আসেন। বক্করের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পেতেন আবদুল গণি। মূলত ওই টাকার বিনিময়ে গণি অস্ত্রটি কিনেন।

 

এজাহারে যা বলা হয়েছে: মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, চাঁদপুরে কর্মরত ছিলেন কনস্টেবল রিয়াদ। অস্ত্র বিক্রির অভিযোগ উঠার পর রিয়াদকে চাঁদপুর থেকে নিয়ে আসে নগর পুলিশ। পুলিশের বিভাগীয় অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদে রিয়াদ জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বেচাকেনার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। আবু বক্করের কাছে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে। রিয়াদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৯ মার্চ বাকলিয়া নিরাপদ হাউজিং এলাকা থেকে আবু বক্করকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবু বক্কর জানান, তিনি অস্ত্র বেচাকেনার সাথে জড়িত। ইতিমধ্যে একটি বিদেশি পিস্তল আবদুল গণির কাছে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। আরেকটি অস্ত্র ফরহাদের কাছে এক লাখ ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। বক্করের দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত ২০ মার্চ মধ্যরাতে পতেঙ্গা থানার কাটগড় এলাকায় অভিযান চালিয়ে আবদুল গণিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গণির দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কাটগড় মোড়ের হাজি জালাল টাওয়ারের দ্বিতীয় তলার কাটগড় ডায়াগনস্টিক এন্ড রিসার্চ সেন্টারের অফিসের ভেতর থেকে একটি ব্রাজিলের তৈরি তরাশ পিস্তল ও সাত রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

 

এ সময় বক্কর ও কনস্টেবল রিয়াদ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, আরো অস্ত্র ফরহাদ হোসেনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। উদ্ধার করা অস্ত্রটি মোস্তাফিজ ও ইসহাকের কাছ থেকে নিয়ে গণির কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। পরে গণি, বক্কর ও রিয়াদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০ মার্চ সকালে অভিযান চালিয়ে সাতকানিয়া থেকে ফরহাদ, মোস্তাফিজ ও ইসহাককে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

পূর্বকোণ/ইব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট