চট্টগ্রাম সোমবার, ২৪ জুন, ২০২৪

ভয়াবহ পাহাড়ধসের ১৭ বছর আজ

৩৬ সুপারিশ এখনও কাগজ-কলমে বন্দী

নিজস্ব প্রতিবেদক 

১১ জুন, ২০২৪ | ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

২০০৭ সালের ১১ জুন লালখানবাজার মতিঝর্ণা এলাকায় স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে মারা গিয়েছিলেন ১২৭ জন। একইদিন নগরের আরও আট স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছিল।সেই বিভীষিকাময় দিনটি এখনও ভুলতে পারেননি চট্টগ্রামবাসী। ওই ঘটনার পর পাহাড়ধসরোধে ৩৬ সুপারিশ প্রদান করেছিল বিশেষজ্ঞ ও তদন্ত কমিটি। কিন্তু বিস্ময়কর যে, ১৭ বছর পর একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো পাহাড় কাটা, পাহাড় দখল ও ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কয়েক গুণ বেড়েছে।
গতবছরের ১৯ অক্টোবর চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা ও পাহাড়ধস নিয়ে সেমিনারের আয়োজন  করেছিল পরিবেশ আইনবিদ সমিতি- বেলা। সেই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান  ইনস্টিটিউটের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কামাল হোসাইন। এতে বলা হয়, একসময় নগরীতে ছোট-বড় ২০০টি পাহাড় ছিল। ইতোমধ্যে ১২০টি পাহাড় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচটি থানা (বায়েজিদ, খুলশী, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালী ও পাহাড়তলী) এলাকায় পাহাড় ছিল ৩২.৩৭ বর্গকিলোমিটার। ২০০৮ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৪.২ বর্গকিলোমিটারে। গত ৩২ বছরে ১৮.৩৪৪ বর্গকিলোমিটার পাহাড় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে। যা মোট পাহাড়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ।
২০০৭ সালের ১১ জুনের ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠিত হয়েছিল। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) সদস্য সচিব করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এখনও জিইয়ে রয়েছে সেই কমিটি।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে পৃথক দুটি কারিগরি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। এসব কমিটি পাহাড়ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করেছিল এবং পাহাড় সুরক্ষায় ৩৬ সুপারিশ প্রদান করেছিল। পাহাড়ধস রক্ষায় দীর্ঘ, মধ্য ও স্বল্পমেয়াদি সুপারিশ করা হয়। কিন্তু ১৭ বছরে একটি সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সহ-সভাপতি প্রফেসর ড. ইদ্রিস আলী বলেন, ১৭ বছরে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি সভা করে চলেছে। বিভিন্ন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। সরকারি আমলা আসে, আমলা যায়। তাই ১৭ বছরেও ৩৬ দফা সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন করা হয়নি। এই কারণে চট্টগ্রামে পাহাড়ধস ও হতাহতের ঘটনা লেগেই রয়েছে।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির বিভিন্ন সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ সভায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, পাহাড় কাটা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমনকি ৩৬ দফা সুপারিশ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নেরও সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সরেজিমনে দেখা যায়, মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, আকবরশাহ, অক্সিজেনসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে পাহাড় কাটার উৎসব চলে আসছে। এসব এলাকায় প্রতিনিয়ত পাহাড় কেটে গড়ে উঠছে নানা ধরনের স্থাপনা, বাড়ছে বসতি। অধিকাংশ পাহাড়ে রয়েছে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অবৈধ সংযোগ। জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা জড়িত থাকায় পাহাড় দখল ও পাহাড় কাটা রোধ করা যাচ্ছে না বলে দাবি পরিবেশবাদীদের।
ইতিহাস বলছে, ব্রিটিশ আমল থেকে পাহাড় কাটা শুরু হয়। পাহাড় কেটে বানানো হয় বাংলো, অফিস-আদালত। পাকিস্তান আমলেও পাহাড় কেটে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকেও পাহাড় কাটা থেমে নেই। ৯০’র দশক থেকে পাহাড় কাটা রীতিমতো মহোৎসবে পরিণত হয়েছে।
পাহাড়ধস ঠেকাতে ৩৬ সুপারিশ : ৩৬ সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- পাহাড়ে জরুরিভাবে বনায়ন, গাইডওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা, পাহাড়ের পানি ও বালি অপসারণের ব্যবস্থা করা, বসতি-স্থাপনাসমূহ টেকসই করা, যত্রতত্র পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ করা, পাহাড়ি এলাকার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নিষিদ্ধ করা, ৫ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না দেয়া, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিলের পাদদেশে অবৈধ বস্তি উচ্ছেদ করে পর্যটনস্পট করা, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা, পাহাড় কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের পর থেকে গত ১৭ বছরে পাহাড়ধসে অন্তত দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট