চট্টগ্রাম বুধবার, ২২ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

বাদল-বাহারের চোখ চন্দ্রনগরের পাহাড়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

১১ মে, ২০২৪ | ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় পাহাড় কাটছে একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন একাধিক মামলার আসামি বাহার উদ্দিন ও সামশুদ্দিন বাদল। এর মধ্যে বাহার উদ্দিনের নামে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। বায়েজিদ এলাকায় পাহাড় কাটার কারণে তার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরই একাধিক মামলা দায়ের করেছে। তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের লাল মিয়ার ছেলে। মামলা রয়েছে বাহারের সঙ্গী সামশুদ্দিন বাদলের নামেও। তিনি স্থানীয় আশরাফ উদ্দিনের ছেলে।

সূত্র জানায়, বাহার ও বাদল গত ১১ বছর ধরে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় ‘রাম রাজত্ব’ কায়েম করেছেন। ২০০৩ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় বাহার উদ্দিন যুবদলের সন্ত্রাসী পেটকাটা বাবরের সহযোগী ছিলেন। র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে পেটকাটা বাবর নিহত হওয়ার পর এই বাহার-বাদল এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে বাহার লেবাস পাল্টে যুবদল থেকে যুবলীগে যোগ দেন। বায়েজিদ চন্দ্রনগর এলাকায় পাহাড় কাটার নেতৃত্ব দেয় বাহার-বাদল সিন্ডিকেট।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বাহার উদ্দিন জানান, আমার জমিটি ২০১৮ সাল থেকে সমতল। পাহাড় কাটার সাথে আমি জড়িত নই। যারা প্রকৃত পাহাড় কাটছে তাদের নাম বললে আমি এলাকায় থাকতে পারবো না। এলাকায় রাজনীতি করি। আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।

 

সামশুদ্দিন বাদলের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।মামলা ১৮ জনের বিরুদ্ধে : নগরীর চন্দ্রনগর গ্রিনভিউ আবাসিক এলাকায় প্রায় ১৬ একর আয়তনের একটি পাহাড় কাটার অভিযোগে সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর বায়েজিদ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে বাহার-বাদলসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে। এরইমধ্যে পাহাড়ের দশমিক ৭ একর কেটে সমান করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এখানকার মাটি দিয়ে পাশের নিচু জমি ভরাটের পর ঘর করে সেখানে পাহাড়টি দেখভালে বিউটি বেগম নামে এক ছিন্নমূল নারীকে রেখেছেন অভিযুক্তরা। সরেজমিন তদন্তে পাহাড় কাটার প্রমাণ পেয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বায়েজিদ থানায় গত ৩০ জানুয়ারি মামলাটি দায়ের করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

পাহাড় কাটায় অভিযুক্তরা হলেন- চন্দ্রনগরের বাসিন্দা মনির হোসেন, জান্নাতুন নিসা ঝুম্পা, ইমতিয়াজুর রহমান, সামশুদ্দিন বাদল, শামসুন নাহার, মহিন উদ্দীন, বদরুল অলম রাশেদ, বাহার উদ্দিন, আফরোজা বেগম, রিনা আক্তার, রতন মিয়া, মো. খালেদ, মো. ইলিয়াছ, জহির উদ্দীন, লোকমান হোসেন, মো. মানিক, মো. সোহেল ও মোহাম্মদ শামীম। তাদের মধ্যে বাহার ও সামশুদ্দিনের বিরুদ্ধে অতীতেও পাহাড় কাটার ঘটনায় মামলা হয়েছে।

 

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মনির হোসেন বলেন, নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার চন্দ্রনগর এলাকায় অনুমতি ছাড়া একটি বিশাল পাহাড়ের পাঁচটি স্পটের মাটি কেটে সাবাড় করেছে সংঘবদ্ধ চক্র। এ ঘটনায় ১৮ জনের বিরুদ্ধে বায়েজিদ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

মামলার এজাহারে বলা হয়, চন্দ্রনগরে আস্ত পাহাড় কেটে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ের পশ্চিমাংশে ১৫ ফুট উঁচু, ১০ ফুট প্রস্থ ও ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে তিন হাজার ঘনফুট, মাঝখানে ১০ ফুট উঁচু, ১০ ফুট প্রস্থ ও ২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে দুই হাজার ঘনফুট, উত্তরে ১০ ফুট উঁচু, ১০ ফুট প্রস্থ ও ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যরে আড়াই হাজার ঘনফুট, রাস্তার পাশে ৩ ফুট উঁচু, ২৫ ফুট প্রস্থ ও ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যরে দুই হাজার ২৫০ ঘনফুট এবং পাহাড়ের উপরের অংশে দুই ফুট উঁচু, ২০ ফুট প্রস্থ ও ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যরে এক হাজার ঘনফুট এরইমধ্যে কাটা হয়েছে।

 

তবে আরেক অংশ অক্ষত রয়েছে এবং সেটিকে আড়াল করতে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আবার পাহাড়ের উপরিভাগে কলাগাছও লাগানো হয়েছে। কাটা পাহাড়ে ঢুকতেই একটি টিনের ঘর। সেখানে বসে আছে বৃদ্ধা বিউটি বেগম। তিনি জানান, কিছুদিন আগে পাহাড়টি কাটা হয়েছে। কারা কেটেছে দেখেননি, এমনকি কিছু জানেনও না তিনি। তবে এখানে ঘর করে দিয়ে বিউটিকে থাকতে দিয়েছেন মানিক নামে একজন।

 

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, পাঁচলাইশ পূর্ব নাসিরাবাদ মৌজার বিএস ২৮১ দাগের ১৬ দশমিক ১১ একর জমিতে পাহাড়টির মূল মালিক মোহাম্মদ সোলাইমান চৌধুরী, আমীর আকবর চৌধুরী গং। পরে খরিদসূত্রে এটির মালিক হন অভিযুক্ত ১৮ জন। তারাই এখন আইন উপেক্ষা করে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে পাহাড়টি কাটছেন। মূলত এখানে সমতল ভূমি বানিয়ে বাড়িঘর তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

 

এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাহারের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটার অপরাধে বায়েজিদ থানায় মামলা দায়ের করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। একই বছরের ৮ এপ্রিল ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হয়। এছাড়া বাদল ও বাহারের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ১৬ আগস্ট আরও একটি মামলা দায়ের করে পরিবেশ অধিদপ্তর।

 

পাহাড় কাটার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় বাদল ও বাহারের বিরুদ্ধে জনপ্রতি ছয় লাখ করে ১২ লাখ টাকা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে দুইজনেই পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে আপিল করেন। আপিল কর্তৃপক্ষ দুইজনের আপিল আবেদন নামঞ্জুর করেন। কিন্ত অদ্যাবধি তারা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধ করেননি। তবে বাদল জানান, ক্ষতিপূরণের কিছু টাকা তারা দিয়েছেন।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট