চট্টগ্রাম বুধবার, ২২ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

মন্তব্য প্রতিবেদন

কারোরই যেন দায় নেই

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী

৯ মে, ২০২৪ | ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ষোলশহর ২ নম্বর গেট মোড়। সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় উৎপাত বেড়েছে ড্যান্ডিসেবীদের। তারা নারী পথচারীদের নানা কায়দায় উত্যক্ত করছে। ছোঁ মেরে ব্যাগ টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনতাই করছে। পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে চুরির নিশানা বানাচ্ছে। কেউ বাধা দিলে হাতে রাখা ব্লেড-রড নিয়ে তেড়ে আসছে।

দুই নম্বর গেট পুলিশ বক্সের সামনেই দিনের পর দিন এই অনাচার চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। নগরীর বিভিন্ন মোড়ে যেখানে সাধারণত গাড়ির গতি কমিয়ে আনতে হয় সেসব মোড়ে এরা দলবেঁধে অবস্থান নেয়। দৈনিক পূর্বকোণ এ নিয়ে একাধিক সংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারের পর পুলিশ দু’দফা অভিযান চালিয়ে কিছু ড্যান্ডিসেবীকে আটক করেছে। তবে জটিলতা রয়েছে দাবি করে আইনি পদক্ষেপ নেয়নি তারা।

 

পুলিশের এই অভিযানকে সংশ্লিষ্টরা লোক দেখানো অভিযান হিসেবে অভিহিত করে সমালোচনা করছেন। পুলিশের কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, শিশু-কিশোরদের ব্যাপারে তারা সংবেদনশীল। চাইলেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া যায় না। এক্ষেত্রে মানবাধিকার সংগঠনগুলোরও চাপ থাকে বলে জানিয়েছেন পুলিশ একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

 

পুলিশ ছাড়াও ড্যান্ডিসেবনকারী শিশু-কিশোরদের বিষয়ে অভিভাবকত্ব দেখানোর দায়িত্ব রয়েছে সরকারের সমাজসেবা বিভাগের। দায়িত্ব রয়েছে সিটি কর্পোরেশন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরেরও। গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশের পরও পুলিশ ছাড়া অন্য কোন সংস্থা এদের বিষয়ে আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে, এমন পদক্ষেপের কথা কখনো শোনা যায় নি।

 

প্রশ্ন হচ্ছে, ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকা ছাড়াও নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাদকাসক্ত অর্ধ শতাধিক ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের পুনর্বাসনে এই যে এতোগুলো সরকারি সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে- তারা কি কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে? তাদের কারোরই কি কোনো দায় নেই? আর কত পথচারী হেনস্থার শিকার হলে, চুরি-ছিনতাইয়ের কবলে পড়লে তাদের টনক নড়বে?

 

এই যে শিশুরা মাদক গ্রহণ করে দিনভর বুঁদ হয়ে থাকছে, আর সুযোগ পেলেই ছিনতাই, পণ্যলুট করার মতো অপরাধ করে যাচ্ছে, আপাতদৃষ্টিতে কেউ কেউ একে ছোট অপরাধমূলক কাজ বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু মাদক সেবন করে অপ্রকৃতস্থ হয়ে এই শিশুরাই রাতের আঁধারে লোকজনের উপর ছোরা কিংবা রড নিয়ে হামলা করে ছিনতাই করছে। পথচারীদের আহত করছে।

 

এভাবেই সাহস বেড়ে এক সময় তারা বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়বে। অল্প বয়স আর মাদকসেবী হওয়ায় যে কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো টাকার বিনিময়ে এসব পথশিশুকে সহজে ব্যবহার করে ফেলবে। মানুষ মারতে এদেরকে ভাড়ায় নিয় যাবে। আবার এদের কেউ কেউ হয়তো কিশোর গ্যাং লিডার হয়ে পুরো নগরীর জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়াবে।

 

আরেকটি বিষয় যাদের দেখার দায়িত্ব, তাদের চোখে পড়ছে না। সেটি হচ্ছে, হিজড়ারা। এদেরকে দিয়ে আজকাল জায়গা কিংবা বাড়ি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক পরিবহন, এমন সব অপরাধমূলক কাজ করা হচ্ছে। চাঁদার জন্য তারা অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল এমনকি নগ্ন হয়ে অশালীন আচরণ করতেও দ্বিধা করে না। হিজড়াদের উৎপাত থেকেও নগরবাসীকে বাঁচাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল ভ‚মিকা নিতে হবে।

 

বেদে সম্প্রদায়ের উৎপাতও পথচারীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে। সাপ দেখিয়ে তারা পথেঘাটে লোকজন থেকে টাকা আদায় করে। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। কেউ যদি স্বাচ্ছন্দ্যে ফুটপাতে হাঁটতে না পারে, সড়কে নিরাপদে চলাফেরা করতে না পারে- শুধু এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলের মতো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কি নিজের শহরে নাগরিকদের নিরাপদ ভাবতে সাহায্য করবে?

 

বিপথগামী ছিন্নমূল এই শিশু-কিশোরদের অপরাধকে ছোট গণ্য করে এড়িয়ে না গিয়ে এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে, ছোট অপরাধগুলো বড় অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। শুরুতেই যদি এদের সমূলে উৎপাটন করা না যায়, এটিই এক সময় বড় আপদ হয়ে দাঁড়াবে। কি করা দরকার, এখনই ভাবুন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট