চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

৩৩ বছরেও অরক্ষিত উপকূল

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

২৯ এপ্রিল, ২০২৪ | ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ

১৯৯১ এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। পানিতে ভেসে যায় হাজার হাজার মানুষ, ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয় সন্দ্বীপ, বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপকূল অঞ্চল। ওই এলাকার মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা।

‘৯১-এর সেই ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যায় উপকূলীয় বেড়িবাঁধ। সেই ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ‘৯৬ এর ঘূর্ণিঝড়ে বিলীন হয়ে যায় বাঁধের ধ্বংসাবশেষও। ভাগ্য-বিড়ম্বিত উপকূলীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ৩৩ বছর ধরে চলছে কানামাছি খেলা। সুরক্ষিত হয়নি উপকূল। এখনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটান বাসিন্দারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ১৯৬০ সালে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৮ সালে নারগিস, ২০০৯ সালের আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ে বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সালে বাঁধের সংস্কার করা হয়। পরবর্তীতে সিসি ব্লক ঢালাই ও মাটির বাঁধ দিয়ে মেরামত করা হয়। ব্যয় করা হয় কোটি কোটি টাকা।

 

তারপরও ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ার-ভাটার কারণে বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে সীতাকু- উপকূলীয় এলাকার বেশির ভাগ অংশ এখনো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। সীতাকু- ও মিরসরাই উপজেলায় উপকূলীয় এলাকা ৭০ কিলোমিটার। এরমধ্যে মিরসরাই অর্থনৈতিক জোন নির্মাণে বেশির ভাগ এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করে সুরক্ষা করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সীতাকু-ের ২৮ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে জাহাজ ভাঙা শিল্প এলাকাসহ বেশির ভাগই অরক্ষিত।

 

বাঁশখালী: বঙ্গোপসাগর, সাঙ্গু নদী ও জলকদর খালবেষ্টিত বাঁশখালীর মানুষ এখনো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সাগর উপকূলীয় ৩৬ কিলোমিটারের মধ্যে সিসি ব্লক ঢালাই বেড়িবাঁধ রয়েছে ১০ কিলোমিটার। বাকি ২৬ কিলোমিটার এখনো অরক্ষিত। ৩৬ কিলোমিটার সাগর উপকূল ছাড়াও সাঙ্গু ও জলকদর খাল মিলে অভ্যন্তরীণ উপকূল রয়েছে ১০৬ কিলোমিটার। ‘৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৪২ হাজার মানুষ মারা যায় বলে দাবি স্থানীয়দের। সাগর উপকূলের ৬ ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়াও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
২০১৬ সালে বাঁশখালী উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রকল্প নেয় পাউবো। ২০৯ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ২৯৩ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও কাজের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ২০২২ সালে শেষ হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ট্রাস্কফোর্স কমিটির তদন্তেও প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছিল। এরফলে প্রকল্পের সুফল নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দেবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খ ম জুলফিকার তারেক বলেন, ‘১৯৭৪-৭৫ সালের সার্ভে মতে সেই প্রকল্পের ডিজাইন করা হয়েছিল। আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পানি সামাল দেওয়া। সেটি হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেখানে বাঁধ দেবে যাচ্ছে, সেখানে জরুরিভিত্তিতে মেরামত করা হচ্ছে। এছাড়াও বাঁধটিকে টেকসই করার লক্ষ্যে নতুন করে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।’

আনোয়ারা : আনোয়ারা সাগর উপকূল রয়েছে ১৩ কিলোমিটার। এরমধ্যে সাগর ঘেঁষা ৮ কিলোমিটারের মধ্যে রায়পুর ইউনিয়নের রাইগ্যারঘাট ও সিপাতলীঘাট অংশে প্রায় তিন কিলোমিটার এখনো অরক্ষিত রয়েছে। এছাড়াও সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রায় ৬ কিলোমিটার অংশে ভাঙন রয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-১) শওকত ইবনে সাহীদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘সাগর তীরের ২ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার এবং সাঙ্গু নদী তীরবর্তী জুঁইদ-ী ও রায়পুরে ২৪শ মিটার অংশে বেড়িবাঁধ ও ব্লক বসানোর জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।

ভাঙনরোধ প্রকল্প নিয়ে নয়-ছয়ের অভিযোগ :

আনোয়ারা উপকূলীয় বাঁধ সুরক্ষায় ২০১৬ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শুরু থেকেই প্রকল্পটি নিয়ে নয়-ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক দফায় ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়ও বেড়ে ২০২৪ সাল পর্যন্ত করা হয়। ৩২০ কোটি টাকার প্রকল্প বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭৭ কোটি টাকা। প্রকল্পের শুরু থেকে কাজের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিল এলাকাবাসী। এ অভিযোগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছে তারা। রায়পুর ইউনিয়নের পরুয়া পাড়া, গলাকাটার ঘাট, বাই¹্যার ঘাট, বার আউলিয়া, ফকির হাট ও সরেঙ্গা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এসব এলাকার অধিকাংশ বেড়িবাঁধ দেবে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের পওর-১ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শাহীদ বলেন, ‘৫২ প্যাকেজের মধ্যে ৪৩ প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৯ প্যাকেজের কাজ ইতিমধ্যেই শেষের দিকে। মোট প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

সন্দ্বীপ: ৭৬২ দশমিক ৪২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলার পুরোটায় সাগরঘেরা। ১৯৬০ সালে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় বেড়িবাঁধের। ৯১-এর ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছে বলে বেসরকারি হিসাবে দাবি করা হয়েছে। এছাড়াও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের, ৫৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ১০ কিলোমিটার অংশে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি ৪৫ কিলোমিটারে মাটির বাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে ২৫ কিলোমিটার বাঁধ ভালো অবস্থায় রয়েছে। বাকি অংশের মধ্যে প্রায় তিন কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খ ম জুলফিকার তারেক বলেন, ‘সন্দ্বীপের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে সন্দ্বীপ অনেকটা রক্ষা হবে।’

সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প :

‘৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় এলাকায় চালু হয়েছিল সবুজ বেষ্টনী প্রকল্প। বন বিভাগ থেকে উপকূলীয় বন বিভাগ চালু হয়েছিল। উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনীর আওতায় গাছ লাগানো হয়। কিন্তু দেখভালোর অভাবে গাছ কেটে উজাড় করে ফেলে বনখেকোরা। এছাড়াও শিল্পোদ্যোক্তারা উপকূলীয় বনাঞ্চল দখল ও গাছ কেটে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলেন। এতে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় এলাকা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট