চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

খাদ্য বিভাগের হ্যান্ডলিং টেন্ডার

অবাস্তব সেই শর্ত স্থগিত

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

২৮ এপ্রিল, ২০২৪ | ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পাঁচ ক্যাটাগরিতে ১০০ নম্বরের অবাস্তব পদ্ধতি চালু করেছিল খাদ্য অধিদপ্তর। এই পদ্ধতি নিয়ে সারাদেশে সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ উঠে, পুরোনো সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দিতে মনগড়া এমন শর্ত আবিষ্কার করা হয়েছিল। শর্তের ফাঁদে পড়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলার হ্যান্ডলিং ঠিকাদারের কাজ ভাগিয়ে নেয় ৬ জনের ঠিকাদারি একটি সিন্ডিকেট।

 

এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার প্রেক্ষিতে অবশেষে হাইকোর্ট সেই এসটিডি পদ্ধতি (১০০ নম্বর) স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাইকোর্টের সেই আদেশ প্রতিপালনের জন্য গত ২৪ এপ্রিল দেশের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও সাইলো অধীক্ষকদের কাছে চিঠি দেয় খাদ্য অধিদপ্তর।

 

এর আগে (গত ২৫ মার্চ) টেন্ডারে ১০০ নম্বরের সংযোজন বিধিসম্মত হয়নি বলে মতামত দিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির রিভিউ প্যানেল। রায়ে বলা হয়েছে, বিধি-বহির্ভূতভাবে আদর্শ দরপত্রের শর্ত পরিবর্তন করে টেন্ডার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাকে ‘সর্তক’ করা হয়েছে।

 

খাদ্য অধিদপ্তর হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডি, জেলার ১৬ এলএসডি, কক্সবাজার ১০টি এলএসডি ও পার্বত্য জেলার খাদ্য গুদামের শ্রম ও হস্তার্পণ (হ্যান্ডলিং) ঠিকাদার আহ্বান করে খাদ্য অধিদপ্তর। প্রথমবারের মতো এসটিডি পদ্ধতিতে ১০০ নাম্বারের তুঘলকি শর্তে এসব টেন্ডার করা হয়।

 

খাদ্য অধিদপ্তর ও ঠিকাদার সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ২১ আগস্ট এই পদ্ধতিতে টেন্ডার করা হয় বান্দরবানের সাত এলএসডি গুদামের। অভিযোগ ছিল, ১০০ নাম্বারের শর্তের ভিত্তিতে একটি সিন্ডিকেট টেন্ডার হাতিয়ে নেয়। সমঝোতার ভিত্তির টেন্ডারবাজিতে টনপ্রতি পণ্য উঠানো-নামানোর দর ৪০.৫০ টাকা থেকে এক লাফেই ১২৮ টাকা দেওয়া হয়। এতে সরকারের বড় ধরনের ক্ষতির অভিযোগ উঠেছিল।

 

ওই বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর এয়ার মোহাম্মদ এন্ড ব্রাদার্স খাদ্য সচিবসহ ৬ জনকে বিবাদী করে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে। ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক এয়ার মোহাম্মদ গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘কথিত ১০০ নম্বর প্রক্রিয়া বাতিল করার জন্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলাম। আদালত প্রথম দফায় তিন মাস ও পরের ধাপে ৬ মাসের জন্য ওই পদ্ধতিতে টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিত করেছিলেন। এখন খাদ্য অধিদপ্তর সারাদেশের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আদালতের নির্দেশ প্রতিপালনের নির্দেশনা জারি করেছে।’ এখন এলএসডি (১০০ নম্বর) পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হওয়া টেন্ডারের আর বৈধতা নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এসএম কায়সার আলী পূর্বকোণকে বলেন, ‘এ সংক্রান্ত চিঠি এখনো পাইনি। তবে এলএসডি পদ্ধতি বাতিল করে টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত করার লক্ষ্যে কাজ করছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। কারণ এই পদ্ধতিতে একটি অংশ বেশি কাজ পাচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারে সবাই যেন কাজ পায় সেভাবে ফর্মূলা প্রণয়ন করা হচ্ছে।’

 

টেন্ডারে জালিয়াতি ও মূলনীতি বদল :
গত ২০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার ১৬ এলএসডি খাদ্য গুদামের শ্রম ও হস্তার্পণ (হ্যান্ডলিং) টেন্ডার আহ্বান করা হয়। এতে ১১৬ জন ঠিকাদার অংশ নেন। এরমধ্যে ৪৯ দরপত্র যোগ্য ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ ছিল, খাদ্য কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে একটি সিন্ডিকেটকে বিশেষ সুবিধা দিতে মনগড়া শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। এতে ৮২ ঠিকাদার খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে এই অভিযোগ করেছিলেন।

 

অভিযোগ ছিল, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীন ২৫ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদেশ সফরে ছিলেন। একই সময়ে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের ১২ জন কর্মকর্তা বেলজিয়ামের ব্রাসেলস এবং জার্মানির বার্লিন সফরে ছিলেন। বিদেশে অবস্থানকালে ৩১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ১৬ খাদ্য গুদামের টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুমোদন দেন। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে তড়িঘড়ি করে বিদেশ সফরে থাকাকালীন টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করেন।

 

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পিপিএ, পিপিআর ও আদর্শ দরপত্রের কোনো তোয়াক্কা না করে অবাস্তব শর্তের মাধ্যমে টেন্ডার আহ্বান এবং টেন্ডার অনুমোদন করা হয়েছে বলে রায় দেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির রিভিউ প্যানেল। গত ২৫ মার্চ এই রায় দেন চার সদস্যের বিচারক প্যানেল। ১০০ নাম্বারের ভিত্তির সংযোজন বিধিসম্মত হয়নি বলে মতামত দিয়েছেন রিচারক প্যানেল। রায়ে বলা হয়েছে, আদর্শ দরপত্রের অপরিবর্তনশীল শর্ত পরিবর্তন করে নতুন করে ১৩ শর্তবিশিষ্ট নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে। নিজের মতো করে শর্তযুক্ত করায় টিডিএস ও আদর্শ দরপত্রের মূলনীতি বদলে গেছে। এই ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীনকে ‘সর্তক’ করা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও অভিযোগের মুখে পড়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুমাইয়া নাজনীনকে ২৫ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) চট্টগ্রাম থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক পদে বদলি করা হয়েছে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট