চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসের অংশ

ড. প্রকৌশলী শাফায়াত হোসেন খান

২৫ এপ্রিল, ২০২৪ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বন্দরে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। তার দুঃসাহসী অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দর ফিরে পায় প্রায় দু’হাজার কোটি টাকার ভ‚মিসম্পদ ও রাজস্ব। বাংলাদেশের প্রশাসনে মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার সততা, সাহসিকতা, কর্মদক্ষতা এবং দেশপ্রেম অতুলনীয়। তাকে নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। এমন একজন প্রচন্ড দেশপ্রেমিক ও সৎ অফিসার বাংলাদেশের জন্য অনন্য সম্পদ।

 

আজ ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের ১৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ দিবস উপলক্ষে তাকে স্মরণ করছি। আমি যখন চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেছি, তখন তাকে দেখেছি কী দুর্দান্ত সাহস নিয়ে তিনি ভূমিদস্যু, অপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। উপরের মহলের অন্যায় চাপ, হুমকি কিংবা দুর্নীতিবাজদের রক্তচক্ষুকে তিনি পরোয়া করতেন না। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বাংলাদেশের মোবাইল কোর্টের ইতিহাসে এমন ম্যাজিস্ট্রেসি দুর্লভ।

 

মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী এক কিংবদন্তি, হাজার হাজার সফল অভিযানের তিনি মহানায়ক। এত দুঃসাহসী ও আপসহীন অভিযান আমার চোখে পড়েনি। তার অতি স্বাধীনচেতা ভ‚মিকার কারণে তিনি বহু অসাধ্য সাধন করেছেন। চট্টগ্রাম বন্দরকে তিনি তার একক ভ‚মিকায় অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পদ-পদবি বিবেচনায় একজন ম্যাজিস্ট্রেট, অথচ সমগ্র বন্দরজুড়ে মুনীর চৌধুরী ছিলেন এক আতংক। তার দুঃসাহসী অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দর ফিরে পায় প্রায় দু’হাজার কোটি টাকার ভূমিসম্পদ ও রাজস্ব।

 

রাত-দিন ক্লান্তিহীনভাবে তাকে দেখা যেতো বন্দরের জল বা স্থলসীমায়। বঙ্গোপসাগর কিংবা কর্ণফুলী নদীতে অতি প্রত্যূষে নেমে পড়তেন পরিবেশ দূষণকারী, শুল্ক ফাঁকি দেয়া অথবা বন্দর আইন লঙ্ঘনকারী দেশি-বিদেশি শত শত জাহাজ আটক করে ফেলতে। গভীর রাতে বা প্রচন্ড ঝড়-তুফানের মধ্যেও সমুদ্রে অভিযান চালাতেন। বিশাল বুলডোজার নিয়ে অবৈধ বহুতল ভবন, ডকইয়ার্ড, গোডাউন কিংবা নদীপাড়ের অবৈধ স্থাপনা মুহূর্তে ভেঙে ফেলতেন। কারও সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতেন না।

 

 

সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা বন্ধের মধ্যেও তার অভিযানের বিরতি ছিল না। এভাবে উদ্ধার করা বহু জমি চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে ও সম্প্রসারণে কাজে লেগেছে। তার অসীম সাহসী ব্যক্তিত্বের কাছে সন্ত্রাসী ও ভ‚মিদস্যুরা দুর্বল হয়ে যেতো। রাডারের মতো বন্দরের জল ও স্থলসীমা পাহারা দিয়ে রাখতেন। তার পেছনে অনেক ভয়ংকর শত্রু ছিল, অনেক হুমকি ছিল; কিন্তু কখনও মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না।

 

শুধু চট্টগ্রাম বন্দর নয়, সমগ্র চট্টগ্রাম জুড়ে তার অভিযানের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল। খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল, গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ চুরি, অবৈধ যান চলাচল, পরিবেশ দূষণ, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, অবৈধ পণ্য মজুত, অনৈতিক ব্যবসা, হাসপাতাল-ক্লিনিকে অপচিকিৎসাসহ অসংখ্য বড় বড় দুর্নীতি ও অপরাধের মূলোৎপাটন করেছেন মুনীর চৌধুরী।

 

 

চট্টগ্রামে শক্ত হাতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সাবেক মেয়র শ্রদ্ধেয় মহিউদ্দিন চৌধুরী সাহেব তাকে ‘টাইগার অফ চিটাগং’ নামে অভিহিত করতেন। বহু বড় বড় ব্যবসায়ী তার হাতে গ্রেপ্তার হয়। বন্দর ও ওয়াসার শত শত কোটি টাকার জমি উদ্ধার করেছেন। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ে বড় বড় কর্পোরেট গ্রুপের অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিয়েছিলেন। তাকে ঢাকার মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়ে আসা হলে তিনি ওই সময় ডিজি শিপিং অফিসের বড় বড় দুর্নীতি ধরে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে দেন।

 

মুনীর চৌধুরী বাংলাদেশের পরিবেশ সেক্টরেও বিপ্লব ঘটিয়েছেন। বহু ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার এবং অসংখ্য দূষণকারী অবৈধ কারখানা উচ্ছেদ করে তিনি বাংলাদেশে দূষণের ভয়াবহতা কমিয়েছেন। প্রায় কোটি টাকা জরিমানা আদায় এবং ৫ হাজার টন দূষণকারী সামগ্রী জব্দ করে তিনি বাংলাদেশে প্রথম পরিবেশ আইন প্রয়োগে বিপ্লব ঘটান। এর আগে পরিবেশ অধিদপ্তর ছিল ঠুঁটো জগন্নাথ। যে সংস্থায় কাজ করেছেন, সে সংস্থায় কঠিন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বহু দৃষ্টান্ত মুনীর চৌধুরীর হাতে ঘটেছে। অথচ তার ভাগ্যে কখনও জোটেনি স্বাধীনতা পদক, পরিবেশ পদক, একুশে পদক কিংবা জনপ্রশাসন পদক।

 

তার নির্লোভ জীবন এ যুগে বিরল। তার বিদেশ ভ্রমণের লোভ ছিল না। একবার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বহু অনুরোধে তাকে বিদেশ পাঠানোর পর তিনি ফিরে এসে ভ্রমণের উদ্বৃত্ত টাকা বন্দর তহবিলে জমা দেন। এমনকি বন্দরে শত শত কিলোমিটার নৌ বা স্থল অভিযানের ভ্রমণ বিলের অর্থ তিনি কখনও তোলেননি। নিজেকে নিঃস্ব করে এমন ত্যাগের দৃষ্টান্ত এ যুগে বিরল। অথচ তার সততার স্বীকৃতি তিনি পাননি! কিন্তু এতে কখনও তিনি থেমে থাকেননি। অত্যন্ত নীরবে ও নিভৃতে রাষ্ট্র ও জনকল্যাণে অনেক বড়মাপের কাজ করেছেন।

 

বড় বড় দুর্নীতি উদঘাটন এবং রাঘব বোয়াল ধরেছেন। বহু অবৈধ অর্থ আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন। যেসব সরকারি অফিস বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, সেসব অফিস তার ভয়ে আতংকিত ছিল। বহু দপ্তরে এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালানোয় তিনি দুর্নীতিবাজদের চক্ষুশূল এবং সৎ কর্মকর্তাদের প্রিয়পাত্র হন। দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি প্রকৃতই একজন যোদ্ধা।

 

দুর্নীতির জাল ছিন্নভিন্ন করতে মুনীর চৌধুরী অসাধারণ দক্ষ এক কর্মকর্তা। যে প্রতিষ্ঠানেই হাত দিয়েছেন, সে প্রতিষ্ঠান তার স্পর্শে প্রচন্ড শক্তিশালী হয়েছে। তার প্রমাণ ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নামক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের লোপাট হওয়া ১২শ কোটি টাকা উদ্ধার, মিল্ক ভিটা নামক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ৩৩৮ কোটি টাকা থেকে ৪৬৮ কোটি টাকায় বৃদ্ধি, চট্টগ্রাম ওয়াসার লোকসান কাটিয়ে ৩৪ কোটি টাকা বকেয়া আদায় করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।

 

আমার বিশ্বাস, শুধু সততাই সম্বল নয়, সততার সাথে প্রয়োজন মুনীর চৌধুরীর মতো অসাধারণ সাহস, কর্মদক্ষতা তাৎক্ষণিক কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ার মানসিকতা ও সর্বোপরি গভীর দেশপ্রেম।

ড. প্রকৌশলী শাফায়াত হোসেন খান প্রাক্তন সদস্য (প্রকৌশল) ও প্রধান প্রকৌশলী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ; বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী।

পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট