চট্টগ্রাম সোমবার, ২৭ মে, ২০২৪

মন্তব্য প্রতিবেদন

কিশোর গ্যাং কি অপ্রতিরোধ্য?

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী

১৮ এপ্রিল, ২০২৪ | ৪:৫১ পূর্বাহ্ণ

বাসা থেকে ইফতার কিনতে বের হয়েছিলেন আলী রেজা নামের এক তরুণ। তাকে একা পেয়ে মারধর শুরু করে একদল কিশোর। খবর পেয়ে ছুটে যান রেজার বাবা কোরবান আলী। সেটাই কাল হয় তার জন্য। ছেলেকে বাঁচাতে যাওয়ার ‘অপরাধে’ ইট দিয়ে একের পর এক আঘাত করা হয় এই চিকিৎসককে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে পাঁচদিন পর হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান তিনি।
গত ৫ এপ্রিল নগরীর আকবর শাহ থানার ফিরোজ শাহ হাউজিং এলাকায় ঘটা এই ঘটনা কী মর্মান্তিক! কী হৃদয়বিদারক! একদল কিশোর মিলে হত্যা করল একজন চিকিৎসককে! গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে- শুধু চিকিৎসক কোরবান আলীই নন- কিশোর গ্যাংয়ের হাতে গত ছয় বছরে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৫ জন খুন হয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে সংঘটিত ৫৪৮টি অপরাধের ঘটনায় কিশোর গ্যাং জড়িত।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদন অনুযায়ী- নগরীতে এখন ২শ কিশোর গ্যাং সক্রিয়। বায়েজিদ, কোতোয়ালী, চান্দগাঁও এলাকায় তাদের দাপট বেশি। কিশোর গ্যাং সদস্যদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন জনপ্রতিনিধিসহ ৬৪ জন ‘বড়ভাই’। তাদের ইশারাতেই খুনোখুনি, দখল, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।
প্রশ্ন হচ্ছে- যে বয়সে বল নিয়ে মাঠে যাওয়া বা সৃজনশীল কোন কাজে ব্যস্ত থাকার কথা, ওই বয়সে কিশোরদের একটি অংশ কেন ‘গ্যাং কালচারে’ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে? বয়স ২০ হওয়ার আগেই তারা কীভাবে অস্ত্র চালনায় পারদর্শী হয়ে উঠছে? কারা তাদের মন ও মনন থেকে কৈশোরের সরলতা সরিয়ে ফেলে তাদেরকে বয়সের চেয়েও বয়সী বানিয়ে দিচ্ছে? কোন প্রক্রিয়ায়, কার স্বার্থে?
কীভাবে আমাদের কিশোররা ‘গ্যাং’-এ ঢুকে যাচ্ছে, কীভাবে আমাদের চোখের সামনে একটি বিপজ্জনক প্রজন্ম গড়ে উঠছে, তা কি আমরা ভাবছি? অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে- একটি ঘটনা ঘটলে কয়েকদিন আমরা শোরগোল করি। এরপর চুপচাপ হয়ে যাই। ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কোন ব্যবস্থা নিই না।
নাহয় দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান বা ছাত্রলীগ নেতা আসকারকে একদল কিশোর প্রকাশ্যে হত্যা করার পরও কেন আমরা কিশোর গ্যাং কালচার থামাতে পারলাম না? এতদিনেও কেন কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদার ‘বড়ভাইদের’ আইনের আওতায় আনা গেলো না?
অন্ধকার শেষে যেমন আলো আসে, তেমনি সামাজিক অবক্ষয়ের মতো এমন ঘোর অমানিশার মধ্যে আশার আলো হয়েই যেন এসেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কঠোর এক বার্তা। গত মঙ্গলবার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান কিশোর গ্যাং নিয়ে প্রশাসনের শক্ত বার্তা দিয়েছেন। কিশোর গ্যাংয়ের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। যা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার পেয়েছে।
আমি বিশ্বাস করি- জেলা প্রশাসকের এই বার্তা শুধু চিকিৎসক কোরবান আলী হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষিতে নয়; সত্যিকার অর্থে চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং রুখতে একটি আন্তরিক উদ্যোগের শুরু। এখন আমাদের সবাইকে মিলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে- অর্থাৎ, কিশোর গ্যাং কালচারের মতো সামাজিক ব্যাধির স্থায়ী সমাধানে একটি রূপরেখা ঠিক করা জরুরি। অবশ্য এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন।
আমার প্রস্তাব হচ্ছে- দ্রুত প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজসহ সব অংশীজনকে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক করা। কিশোর গ্যাং রুখতে একটি রূপরেখা ঠিক করা। সেটি বাস্তবায়নে সময় নির্ধারণ করে একটি সমন্বিত ও কার্যকর কর্মসূচি শুরু করা। যারা কিশোরদের হাতে অস্ত্র, মাদক তুলে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
এই কাজে যদি গণমাধ্যমের সহায়তার প্রয়োজন হয়- আমরা কথা দিচ্ছি, অতীতের মতো চট্টগ্রামের, চট্টগ্রামের মানুষের জন্য যেকোন ভালো কাজে আমরা পাশে থাকবো। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে যেকোন মূল্যে কিশোর গ্যাং কালচার থামাতেই হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচাতে এর কোন বিকল্প নেই।

 

সম্পাদক, দৈনিক পূর্বকোণ

 

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট