চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪

কিডনি রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর ৮ম প্রধান কারণ

১৪ মার্চ, ২০২৪ | ১২:০৬ অপরাহ্ণ

আজ ১৯তম বিশ্ব কিডনি দিবস। ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছর মার্চ মাসের ২য় বৃহস্পতিবারে এ দিবস পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘‘কিডনি স্বাস্থ্য সবার জন্য, বৃদ্ধি পাচ্ছে ন্যায়সংগত সেবার সমান সুযোগ আর নিরাপদ ও সর্বোত্তম ঔষধের অনুশীলন’’।

সারা বিশ্বে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন লোক দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে ভুগছেন। ২০১৯ সালে এই কারণে প্রায় ৩১ লক্ষ লোক মারা গেছেন। বর্তমানে বিশ্বে কিডনি রোগ মৃত্যুর অষ্টম প্রধান কারণ এবং বলা হচ্ছে যে এই রোগের বিস্তার রোধ করতে না পারলে এটি ২০৪০ সাল নাগাদ পঞ্চম বৃহত্তম কারণ হয়ে দাঁড়াবে। গত তিন যুগ ধরে সবচেষ্টা করা হয়েছে কিভাবে এই রোগের চিকিৎসা, যেমন ডায়ালাইসিস এবং কিডনি প্রতিস্থাপন আরও বাড়ানো যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সকল গবেষণা এই রোগকে কিভাবে প্রতিরোধ করা বা কমপক্ষে রোগের অগ্রগতি রোধ করা অথবা এই রোগের বিভিন্ন জটিলতা যেমন কার্ডিওভাস্কুলার এবং কিডনি ফেইলিউর হতে না দেওয়া যায় তাকে ঘিরে হয়েছে। এতে অন্তত এ রোগের রোগীর সংখ্যা কমে যাবে এবং কিডনি রোগীদের প্রাত্যহিক জীবনের গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে।

 

এইবার কিডনি দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো এইসব কিডনি রোগী, উচ্চ আয় বা নিম্ন আয়ের দেশ যেখানেই বাস করুক না কেনো এইসব আধুনিক গবেষণালব্ধ চিকিৎসার সুযোগ থেকে যেনো বঞ্চিত না হয়। এইজন্য চিকিৎসা সেবা দানকারী সংশ্লিষ্ট সকলের কিডনি রোগ সম্বন্ধে অসচেতনতা, জ্ঞানের অপ্রতুলতা এবং নতুন থেরাপি সম্বন্ধে আত্মবিশ^াসের ঘাটতি যেনো চিকিৎসায় কোন ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। তাছাড়া কিডনি বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ এইসব রোগীদের উপর যেনো বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় তার জন্য দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার ধারণক্ষমতা বাড়ানোসহ বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা গড়ে তোলাই এই কিডনি দিবসের লক্ষ্য।

 

সর্বোত্তম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন রকমের বাধাগুলোকে অতিক্রম করা। এই বাধাগুলো হলো যেমন দ্রুত রোগ নিরূপণের অভাব, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বা ইন্স্যুরেন্স কভারেজের অপ্রতুলতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঝে কম সচেতনতা এবং অত্যাধুনিক সব ধরনের ওষুধের অপ্রাপ্যতা। তাই কিডনি, হার্ট এবং জীবন বাঁচাতে হলে একটা সমন্বিত ব্যাপক কৌশলের দরকার :

 

১) স্বাস্থ্য পলিসির আধুনিকায়ন : কিডনি রোগ প্রতিরোধকল্পে স্বাস্থ্য পলিসি এমন হওয়া উচিত যাতে কিডনির প্রাথমিক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাকে বিদ্যমান স্বাস্থ্য পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, কিডনি চিকিৎসার জন্য আলাদা তহবিলের ব্যবস্থা করা যায় এবং সকল স্বাস্থ্যকর্মী ও জনগণের মাঝে কিডনি স্বাস্থ্য সম্পর্ক সম্যক জ্ঞান প্রচার করা যায়। প্রতিটি রোগীকে যদি স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা যায়, দ্রুত রোগ নিরূপণের সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় এবং গুণগত চিকিৎসা সেবা দীর্ঘস্থায়ী টেকসই করতে পারলেই কিডনি রোগ প্রতিরোধ বা এর বিস্তার বন্ধ করা যাবে।

২) সর্বোত্তম স্বাস্থ্যসেবা প্রদান : সর্বোত্তম কিডনি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান সম্ভব হবে না যদি পলিসি সীমিত থাকে, রোগী এবং সেবাদানকারীর শিক্ষার অভাব থাকে, গুণগত চিকিৎসা সেবার জন্য সম্পদের অভাব হয় এবং সকল ওষুধ সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া না যায়। তাই একটা ব্যাপক রোগী কেন্দ্রীভূত এবং স্থানীয়ভাবে সম্ভব বিভিন্ন প্রতিকার ব্যবস্থা সমন্বিত আইন করতে হবে।

 

৩) কিডনি বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দানকারী ডাক্তারদের সংখ্যা বাড়ানো : বিশেষজ্ঞ কিডনি ডাক্তারদের উচ্চতর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা, প্রাথমিক চিকিৎসা দানকারী চিকিৎসক, নার্স এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা দানকারীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করা যাতে তারা এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে না যায়, এদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রত্যেকটা কিডনি রোগের জন্য আলাদা গাইডলাইন এবং নিরাপদ চিকিৎসা কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। কিডনি রোগ দ্রুত নির্ণয় এবং নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির (ওষুধ নির্ভর ও ওষুধ ছাড়া) উদ্ভাবন স্থানীয়ভাবে করার জন্য উৎসাহ প্রদান করতে হবে। বিশেষজ্ঞ এবং অবিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের মাঝে যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে।

 

৪) রোগী এবং সমাজকর্মীদের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি : চিকিৎসার উচ্চমূল্য এবং চিকিৎসা সম্বন্ধে ভুল তথ্য রোগীদের মাঝে চিকিৎসার প্রতি অনিহা সৃষ্টি করে। এছাড়া কিডনি রোগের ঝুঁকিগুলো যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং স্থূলতা সম্বন্ধে জ্ঞান, রোগীদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় নিজস্ব কেয়ারের ভূমিকা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সম্পৃক্ত থাকার কৌশলই ফলপ্রসূ চিকিৎসা মূলমন্ত্র যা রোগীদেরকে যদি বিভিন্ন এডভোকেসি অরগানাইজেশন এবং সামাজিক প্রকল্পে জড়িত করা যায়। যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়, তবেই কিডনি রোগের চিকিৎসায় সম্ভাব্য ভালো ফলাফল আশা করা যায়।।

লেখক : কিডনি ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট