চট্টগ্রাম রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

ছবির ভুবন ‘ফটোব্যাংক’

মিজানুর রহমান

১৩ মার্চ, ২০২৪ | ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ

স্বচ্ছ কাচে ঘেরা পাশাপাশি তিনটি দোকান। সাড়ে ৬০০ বর্গফুটের ছোট এ জায়গার দেয়াল, মেঝে, চলন্ত তাকে শোভা পাচ্ছে হাজার খানেক ছবি। এর কোনোটি নেদারল্যান্ডের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো বা লন্ডনের পিংক লেডি ফুড ফটোগ্রাফারের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিযোগিতায় পুরস্কার জয়ী, কোনো কোনোটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য, উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার চিত্র।  এক পলকেই মনের গহীনে প্রশান্তির পরশ এনে দেয়া এ ছবির ভুবনের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘ফটোব্যাংক গ্যালারি’। নগরীর জিইসি মোড় থেকে জাকির হোসেন সড়ক ধরে এক কিলোমিটার সামনে গেলেই হাতের বাম পাশে কনকর্ড খুলশী টাউন সেন্টার। অত্যাধুনিক ভবনটির ৩য় তলায় আন্তর্জাতিকমানের আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকী নান্দনিক এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন।

 

ফটোব্যাংক গ্যালারির জন্য ছবি তোলা, সম্পাদনা থেকে শুরু করে আধুনিক রূচিসম্মত দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোতে উপস্থাপন-সবই করেন শোয়েব নিজে। বয়সে কিছুটা প্রবীণ হলেও মনের দিক থেকে তরুণ এ আলোকচিত্রীর ‘সৃষ্টি’ ফটোব্যাংক গ্যালারিতে গিয়ে বিনামূল্যে ছবি দেখা, আড্ডা দেয়ার পাশাপাশি রয়েছে পছন্দের ছবিটি পছন্দের কাঠামোতে বাঁধাই করে কেনার সুযোগও।

 

ফটোব্যাংক প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্প:

শোয়েব ফারুকীর বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মিয়া আবু মোহাম্মদ ফারুকী। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হয়েও কেন তিনি ফটোগ্রাফিতে এলেন, ফটোব্যাংক প্রতিষ্ঠা করলেন- তা শোনা যাক শোয়েবের মুখেই। তার ভাষায়, ‘বাবা ভালো ছবি তুলতেন। তার তোলা ছবির অ্যালবাম আমাকে টানত। ফটোগ্রাফার হওয়ার ইচ্ছেটা সেখান থেকেই এসেছে।’

 

তবে ফটোগ্রাফার হয়ে উঠার শুরুটা সংগ্রামের ছিল জানিয়ে শোয়েব বলেন, আশির দশকে বোন জামাইয়ের ক্যামেরা ধার নিয়েই ছবি তোলার শুরু। তখন ছবি প্রিন্ট ব্যয়বহুল ছিল। কষ্টে টাকা জমিয়ে কাজ করতে থাকি। একদিন গ্রামের সূর্যোদয়ের একটি ছবি তুলি। প্রিন্টের সময় দোকানি খুব প্রশংসা করলেন। তার প্রশংসা আমার কাজের উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দেয়।

 

নিজের তোলা ছবি সংরক্ষণ এবং স্থানীয় শিল্পীদের কাজের সুযোগ করে দিতে দুই দশক আগে নগরীর সার্সন রোডে ফটোব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শোয়েব। ধীরে ধীরে তা দেশি-বিদেশি নামি শিল্পীদের আড্ডার জায়গায় পরিণত হয়েছে। নবীন শিল্পীরা পান ঘরের কাছেই বিশ্বমানের ফটোগ্রাফি শেখার সুযোগ। করোনার সময় প্রতিষ্ঠানটি সার্সন রোড থেকে খুলশীতে স্থানান্তরিত হয়।

 

শোয়েবের ঝুলিতে শতাধিক পুরস্কার:

ফটোগ্রাফিকেই নিজের ধ্যান-জ্ঞান বানানো শোয়ব ফারুকী নব্বই দশক থেকে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নানা প্রতিযোগিতায় ছবি পাঠাতে থাকেন। আর পেতে থাকেন একের পর এক পুরস্কার। চন্দনাইশের পাগলা গারদে তোলা একটি ছবির কারণে আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় বিশ্বের সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো প্রতিযোগিতায় জিতে হইচই ফেলে দেন তিনি।

 

এরপর একে একে কুয়েত গ্র্যান্ড, এমিরেটস ফটো কনটেস্ট, পিংক লেডি ফুড ফটোগ্রাফার প্রতিযোগিতাসহ শতাধিক পুরস্কার জিতেছেন বিশ্ব ফটোগ্রাফিতে বাংলাদেশের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য, উন্নয়ন-অগ্রযাত্রার চিত্র, সংস্কৃতি-জীবনযাপনের ছবি তুলে ধরা চাটগাঁর ছেলে শোয়েব ফারুকী। এখন আলোকচিত্রই তার প্রকাশের ভাষা। আলোকচিত্রই যেন তার নিশ্বাস-প্রশ্বাস।

 

ছবিতেই সাজবে প্রতিটি ঘর:

এক সময় ঘর সাজাতে পেইন্টিং বা আর্ট ওয়ার্ক ব্যবহার হলেও এখন নান্দনিক ফ্রেমে বাঁধাই ছবি দিয়েও অনেকে ঘর সাজাচ্ছেন। এখানেই বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির বড় সম্ভাবনা দেখেন শোয়েব ফারুকী। তিনি বলেন, ভালো ছবি প্রেজেন্টেবল করতে পারলে মানুষ ঘর সাজাতে এসবই ব্যবহার করবেন। তরুণ ফটোগ্রাফাররা এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ফটোগ্রাফিতে এগিয়ে যাবেন।

 

অনেক শৌখিন মানুষ ঘর সাজাতে ফটোব্যাংক গ্যালারির ছবি সংগ্রহ করছেন জানিয়ে শোয়েব বলেন, যে কেউ, যে কোনো ডিজাইনে, যে কোনো আকারের ছবির ফ্রেম তৈরি করে দিতে বললে আমরা করে দিই। এতে ফটোগ্রাফি যেমন প্রমোট হচ্ছে- তেমনি আর্থিকভাবে আমরা লাভবান হচ্ছি। শুধু ব্যক্তি নয়, নামি-দামি হোটেল, অফিস সাজাতেও আমাদের ছবি ব্যবহৃত হচ্ছে। 

 

কাজ করতে হবে দেশের জন্য:

ছবি তোলা, পুরস্কার জেতাই একজন ভালো ফটোগ্রাফারের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন শোয়েব ফারুকী। তিনি বলেন, তিন যুগেরও বেশি সময়ের ফটোগ্রাফিতে আমি সব সময় দেশ, পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েছি। আমার ছবির কারণে অনেক জায়গায় পাহাড় কাটা, নদী দখল, বন নিধন বন্ধ হয়েছে। ফটোগ্রাফারদের পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে হবে। বাঁচার জন্য এটি জরুরি।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন