চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৪

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আবারও চট্টগ্রামমুখী হবেন ব্যবসায়ীরা

খায়রুল আলম সুজন

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১২:১৪ অপরাহ্ণ

বিশ্বের বন্দর কেন্দ্রিক শহরগুলি বেশিরভাগই দৃষ্টিনন্দন, নয়নাভিরাম ও সাজানো গুছানো। এর অন্যতম কারণ বাণিজ্যকে ঘিরে এসব শহরে সমাগম ঘটে জাহাজের নাবিক, ব্যবসায়ী, পর্যটকসহ দেশি-বিদেশি নানা শ্রেণির মানুষের।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন চট্টগ্রাম বন্দর। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসকের হাতে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এই বন্দর। ষোড়শ শতকের দিকে পর্তুগিজরা চট্টগ্রাম শহরের কর্তৃত্ব নিয়ে ‘পোর্ত গ্রান্ডে’ নামে পরিচিতি পায় চট্টগ্রাম বন্দর। পর্তুগিজদের পর এটি মুঘল সা¤্রাজ্যের অধীনে আসে এবং এর নাম হয় ইসলামাবাদ। পলাশি যুদ্ধের পর ১৭৬০ সালে চলে যায় ইস্ট ইন্ডিয়ার অধীনে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৭ সালে ‘চিটাগং পোর্ট কমিশনার অ্যাক্ট’ রচিত হয়। এই সময় পর্যন্ত এটি ছিলো পোতাশ্রয়। চট্টগ্রাম বন্দরে প্রথম বড় ধরনের বিনিয়োগ করে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি লিমিটেড। ১৮৮৯ সালে তারা জেটি নির্মাণ ও রেললাইন স্থাপন করে যোগাযোগ মাধ্যম সম্প্রসারণ করে। এর পরেই দ্বৈত শাসনের অধীনে আসে চট্টগ্রাম বন্দর। ১৮৮৭ সালের পোর্ট কমিশনার অ্যাক্টের অধীনে চ্যানেল থেকে জাহাজ জেটিতে ভিড়ানো পর্যাপ্ত কাজ করতো পোর্ট কমিশনার। আর জেটি থেকে পণ্য হ্যান্ডেলিংয়ের কাজ করতো আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত দ্বৈত শাসনে চলতো চট্টগ্রাম বন্দর। একই বছর গঠিত হয় চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট। বর্তমানে ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ’র আলোকে পরিচালিত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। আমদানি রপ্তানির ৮০ শতাংশ পরিবহন হয় এই বন্দর দিয়ে। দেশের অর্থনীতি দিন দিন বড় হচ্ছে। আমাদের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ৪০ বিলিয়ন ছেড়ে ৮০ বিলিয়ন ডলারের দিকে এগুচ্ছে।

 

চট্টগ্রাম শুধু বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, ভৌগলিকভাবে এই অঞ্চলে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম। সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার পরও তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামে বড় বিনিয়োগ হয়নি। চট্টগ্রামের অবকাঠামো উন্নয়ন বলতে গত এক দশকের কথা বলতে হয়। এ সময় চট্টগ্রাম ঘিরে নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। লজিস্টিকস খাতের ব্যবসায়ী হিসেবে আমি ভবিষ্যৎ চট্টগ্রামের নতুন সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। গভীর সমুদ্র বন্দর না হওয়ার যে দীর্ঘ আক্ষেপ ছিল তা মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে পূরণ হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্প ঘিরেই আমি স্বপ্ন দেখছি। কারণ মাতারবাড়ি হবে এই অঞ্চলের সি বর্ণ ট্রেডের বড় হাব। আবার বে টার্মিনালও এই স্বপ্নকে আরও বড় করবে।  এই দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জাহাজ ভিড়ানোর জন্য আর জোয়ারের অপেক্ষা করতে হবে না। মাতারবাড়ি থেকে ইউরোপ-আমেরিকার সাথে সরাসরি কনটেইনার সার্ভিস চালু হবে। বড় জাহাজে বিদেশ থেকে আনা পণ্য সাগর ও নৌপথে চট্টগ্রাম বন্দরের মূল জেটি, পায়রা ও মোংলায় সহজে পরিবহন করা সম্ভব হবে। বায়ারের হাতে গার্মেন্টস পণ্য তুলে দিতে সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া বা কলম্বোর ওপর নির্ভরতা কমবে। সরকার বন্দরকেন্দ্রিক এই দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও হিন্টারল্যান্ড উন্নত না করলে সুফল পাওয়া যাবে না। যেমন কর্ণফুলীতে যে টানেল হয়েছে তা দিয়ে মাতারবাড়ি থেকে সারাদেশে পণ্য আনা নেওয়া করা যাবে। তবে উপকূল ধরে মেরিন ড্রাইভ না করলে এই সুফল সহজে পাওয়া যাবে না। যতকুটু জানি, সরকার পরিকল্পনা করছে মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করার। এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের জন্য নদীপথে ড্রেজিং করতে হবে। সড়কপথে বেশি পণ্য আনা-নেওয়া হয়। মাতারবাড়ি, বে টার্মিনাল ও বন্দরের মূল জেটিতে যে কার্গো হ্যান্ডলিং হবে তার বড় অংশই যাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক হয়ে সারাদেশে। কিন্তু বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, কিছু বাস্তবায়নের পথে। চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী বলা হলেও চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক বড় ব্যবসায়ীরা রাজধানী ঢাকামুখী, তার অন্যতম কারণ ব্যবসায়ী কার্যক্রম পরিচালনার প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের প্রধান দপ্তর ঢাকায়। এতে ভোগান্তির শিকার হন এখানকার ব্যবসায়ীরা। শ্রীহীন চট্টগ্রাম শহরকে শ্রীযুক্ত করতে নানান পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলেও, পরিকল্পনায় কোথাও যেন অসংগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাণিজ্যে গতিশীলতা আনতে বে টার্মিনালকে ঘিরে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম সোহায়েল ১১.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন। সেই সাথে ব্যবসায়ীদের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, সুযোগ সুবিধাগুলো সহজীকরণের নিশ্চয়তা পেলে ব্যবসায়ীদের আবার চট্টগ্রামমুখী করবে। চট্টগ্রাম আবার ফিরে পাবে হারানো গৌরব।

লেখক : সহ-সভাপতি : বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স এসোসিয়েশন(বাফা),পরিচালক : বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস’ এসোসিয়েশন এবং কো-চেয়ারম্যান-এসসি-পোর্ট এন্ড শিপিং- এফবিসিসিআই ।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট