চট্টগ্রাম রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

মহানগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা : সমস্যা ও করণীয়

অপরিকল্পিত নগরায়ন ও যানবাহনের আধিক্যে শৃঙ্খলা ফিরছে না সড়কে

২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ | ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। প্রাচ্যের রাণি। সেই সাথে বাণিজ্যিক রাজধানীও বটে। বলা হচ্ছে এই শহর এশিয়ায় ৭ম আর গোটা দুনিয়ায় ১০ম দ্রুততর ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির শহর। আর চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরেই দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে। দেশের মূল আমদানি-রপ্তানির দ্বার এই বন্দরনগরী। দেশের মোট জিডিপি’তে চট্টগ্রামের অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। অর্থনীতিতে শিল্পক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ, বৈদেশিক রপ্তানির ৮০ শতাংশ এবং রেভিনিউর ৫০ শতাংশের যোগান দেয় বন্দরনগরী। প্রায় ৩০৪.৬৬ বর্গকিলোমিটারজুড়ে এ শহরের ব্যাপ্তি। লোকের বসবাস ৬০ লক্ষের অধিক। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ১৯৮০০ জনের বাস। প্রতিদিন কাজের জন্যে আশপাশ থেকে এসে জড়ো হয় আরো ২০ হাজারের মতো লোক। যদিও এরা কাজ শেষে আবার ফিরে যায়, কিন্তু নগর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে যায়।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য এই নগরীতে কাঁচা পাকা মিলিয়ে সর্বমোট রাস্তা আছে ১২৪৮৫ কিলোমিটার। ট্রাফিক বিভাগ মোট রাস্তার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা করে আসছে। এই কাজে ট্রাফিকের কর্মরত জনবলের সংখ্যা মাত্র ৯০০ জন। ছুটি অসুস্থতা বাদ দিয়ে মোটের উপর ৮০০ জনের মতো ট্রাফিক পুলিশ দুই শিফটে পালাক্রমে কাজ করছে।

 

অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং যানবাহনের আধিক্যের কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে নগর ট্রাফিক পুলিশকে। নগরীর ট্রাফিকের কার্যক্রম বুঝতে হলে সামগ্রিক কিছু বিষয়ও জানতে হবে।

 

নগরীর বিদ্যমান রোড নেটওয়ার্ক ও যানবাহন : নগরীর মোট রাস্তার মধ্যে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় রাস্তা প্রায় ১১৫০ কিলোমিটার। কার্পেটিং রাস্তা ৬০০ কিলোমিটার, সিসি ( কংক্রিট) ২০০ কিলোমিটার ব্রিক সলিং ২০০ কিলোমিটার এবং কাঁচা রাস্তার পরিমান ১৫০ কিলোমিটার। অসংখ্য রোড জংশন রয়েছে এই নগরীতে। অধিকাংশই দুই রাস্তার সংযোগ। ১০১ টির মতো সড়ক সংযোগ নগরীর ট্রাফিক ব্যাবস্থাপনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। তাছাড়া অনেকগুলো ক্রসিং আছে। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ৮৭টি বড় চৌরাস্তা ক্রসিং, ১১টি মাঝারি চৌরাস্তা ক্রসিং এবং ৩৫টি তিন রাস্তার ক্রসিং। গুরুত্বপূর্ণ এসব ক্রসিংসমূহে ট্রাফিক বিভাগকে সিংহভাগ শক্তি খরচ করতে হয় ।

 

নগরীর সড়কগুলোর কিছু অংশ ৮ লেনের হলেও বেশির ভাগ সড়কই ৪ লেনের। ট্রাফিক ব্যাবস্থাপনায় ৬ লেনের সড়ক আদর্শ বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এতে প্রয়োজন হলে কম গতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন চালু করা সহজ হয় ।

 

কালুরঘাট ব্রিজ হতে পতেঙ্গা পর্যন্ত ২৮.৪ কিমি রাস্তাটি মূলত মেট্রোপলিটন ট্রাফিকের লাইফলাইন বলা যায়। এই সড়ককে কেন্দ্র করেই মহানগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তাছাড়া বন্দর আর পতেঙ্গা কর্ণফুলী টানেলকে ঘিরে চালু হওয়া আউটার রিং রোডও এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। কর্ণফুলী টানেল পুরোপুরি চালু হলে এই সড়কটি ট্রাফিক বিভাগের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে এটি শতভাগ নিশ্চিত। তার উপর বে-টার্মিনাল চালু হলেতো কথায় নেই। তাই রিং রোডের ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনি ভাবতে হবে ।

 

নগরীতে পিকআওয়ার ও অফ-পিকআওয়ার দুইক্ষেত্রে অধিকাংশ গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানসমূহের চলাচল উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগের এলাকায়। বন্দর কেন্দ্রিক কন্টেইনারবাহী লং ভেহিক্যাল, ট্রাক, কাভার্ডভ্যানের চলাচল সাগরিকা রোড ও রিংরোড কেন্দ্রিক। নগরীতে চলাচলরত গণপরিবহনের মধ্যে বাস, হিউম্যান হলার, টেম্পো, সিএনজি ট্যা´ি, ম্যাক্সিমা, আবার নন মোটরাইজড ভেহিকেলের মধ্যে থ্রি হুইলার ও রিকশার আধিক্য বেশি।

 

বিআরটিসির তথ্য অনুযায়ী নগরীতে বাসের মোট ১৭টি রুট রয়েছে। বিআরটিএ প্রদত্ত অনুমোদিত সিলিং সংখ্যা ১,১৯১টি হলেও সম্প্রতি করা এক জরিপে দেখা গেছে রাস্তায় ফিটনেস আছে এমন বাসের সংখ্যা অনেক কম। অপরদিকে হিউম্যান হলারের ১৮টি রুটের অনুমোদিত ১০৪৮ সিলিংয়ের বেশির ভাগ গাড়ির অবস্থা ভালো নয়। অটো টেম্পোর রুট আছে ২১টি অনুমোদিত সংখ্যা ২২৪০ হলেও রাস্তায় চলছে অনেক বেশি। মূলত: সিলিংয়ের বাইরেও যানবাহনের প্রকৃত সংখ্যা অত্যাধিক বৃদ্ধি পেয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ।

 

নগরীর ট্রাফিক : মহানগরীর ট্রাফিককে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। এক. সিটি ট্রাফিক (নন মোটরাইজড যান, ব্যক্তিগত, গণ ও পণ্য পরিবহন যানসমূহ ও দুই. পোর্ট ট্রাফিক (আমদানি ও রপ্তানি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত যানসমূহ)। এই কাজে নগর ট্রাফিকের চারটি বিভাগ নিরলসভাবে কাজ করছে। মূলত: পশ্চিম ও বন্দর বিভাগ পোর্ট ট্রাফিক এবং উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগে সিটি ট্রাফিকের আধিক্য লক্ষ্য করা যায় ।

 

নগরীর সড়কের সিংহভাগ প্রায় ২৯% জায়গা দখল করে রাখে ব্যক্তিগত গাড়ি। যারা মাত্র ১৩% যাত্রী পরিবহন করে। অপরদিকে বাস মাত্র ১৭% জায়গা দখল করে ৪৮% যাত্রী পরিবহন করে। সিএনজি ট্যাক্সি/ রিকশা ২৭% জায়গা দখল করে ১৬% যাত্রী পরিবহন করে। টেম্পো/হিউম্যান হলার ৭% জায়গা দখল করে যাত্রী পরিবহন করছে ১০% থেকে ১২%।

 

এতে প্রতীয়মান হচ্ছে গণপরিবহন হিসেবে বাস সার্ভিস ভালো। বিশেষ করে কাউন্টার ভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করা এখন সময়ের দাবি। সোনার বাংলা, মেট্রো প্রভাতী বাস সার্ভিস এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে।

 

এই শহরে যানবাহনের গড় গতিসীমা ১০.০৪ কিলোমিটার/ঘণ্টা। ঢাকায় গড় গতিসীমা ৬.৫ কিলোমিটার/ ঘণ্টা। যদিও ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকাংশে ভালো হলেও বর্তমানে রিকশার আধিক্যের কারণে গতিসীমা কমে যাচ্ছে। নগরীর পরিবহন ব্যবস্থার জন্য এককভাবে ট্রাফিক বিভাগকে দোষারোপ করা হয়। কিন্তু নগরীতে রিকশা/ভ্যান অনুমোদন কারা দেয়? পরিবহন থামবে কোথায়, রাস্তা তৈরির সময় বাসস্ট্যান্ড রাখা হয়নি কেন? গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের চারপাশে পর্যাপ্ত জায়গা নেই কেন? রাস্তা পারাপারের জেব্রা ক্রসিং কোথায়? সঠিক স্থানে ফুটওভার ব্রিজ নেই কেন? করবে কারা? ফুটপাত পথচারীদের চলাচল উপযোগি করা হয়না কেন? ফুটপাত ঘেঁষে স্লাব ঢালু করে পার্কিং স্পেস তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে কর্পোরেশনের ভূমিকা কি? রাস্তার পাশের মার্কেট, ক্লিনিক, হাসপাতাল, বহুতল ভবনের পার্কিং স্পেস কোথায়? থাকলেও কি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে? পার্কিং স্পেস অন্যকাজে ব্যবহার করে নির্মাণ শর্ত ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে সিডিএ’র অবস্থান কি?

 

নগরীর রেল ক্রসিংসমূহের আন্ডারপাস কোথায়? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত গাডির পার্কিং কোথায়? বাধ্যতামূলক স্কুল বাস সার্ভিস চালু করা হয় না কেন? সিটি কর্পোরেশন ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম সচলের ব্যবস্থা নেয় না কেন? নগরীতে স্থায়ী বাস টার্মিনাল কোথায়? দূরপাল্লার পরিবহনের টার্মিনাল কোথায়? পরিকল্পনা আছে কি? বন্দরের কন্টেইনার, পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাক, লং ভেহিকেল, কাভার্ডভ্যানসমূহের টার্মিনাল বা দাঁড়ানোর জায়গা কোথায়? সর্বোপরি ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক আটককৃত অবৈধ যানবাহন রাখার স্থায়ী ডাম্পিং স্থান কোথায়? নগরীতে এত ফিটনেসবিহীন গাডি, পারমিটবিহীন গাড়ি আসে কোথা থেকে? বিআরটিএ’র ভূমিকা কি? নগরীতে বিদ্যমান যানবাহনের সঠিক সংখ্যা কত? এরকম হাজারো প্রশ্নের কোন উত্তর নেই।

 

নগরীর গোটা ট্রাফিক ব্যস্থাপনার দায়ভার এককভাবে ট্রাফিক বিভাগের নয়। নগরীর সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশই কেবল দেখাশুনা করে ট্রাফিক পুলিশ। ট্রাফিকের কাজ রাস্তায় সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা রিমুভ করে চলাচলের গতি ঠিক রাখা। এক্ষেত্রে আইন ভঙ্গকারী যানবাহন ও ব্যাক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনে প্রসিকিউশন দেয়া।

 

সীমিত জনবলের ওপর ভর করে ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি রোদ-ঝড় মাথায় নিয়ে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে অমানবিকভাবে হাত পা নেড়ে আপনাকে আমাকে সঠিক ও নিরাপদে কাজে কিংবা বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দিচ্ছে।

 

এই কাজ করতে করতে গিয়ে অনেকের ভাল লাগছে না। কেউ কেউ তখন ট্রাফিক পুলিশের চৌদ্দ গোষ্ঠী ধরে গালি দিচ্ছি। আমরা বস্তুত সবার দায় দায়িত্বগুলি এককভাবে ট্রাফিক পুলিশের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ভারমুক্ত থাকতে চাইছি। ট্রাফিক পুলিশ সবসময় সঠিক কাজটি যে করতে পারছে, তা বলছিনা । তবে তাদের কায়িক পরিশ্রম থেকে নিস্তার নেই।

 

পুলিশ কমিশনারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নগরীর চারটি ভাগে বিভক্ত গোটা ট্রাফিক বিভাগের দেখভাল করেন। আমার গাড়ি নিরাপদ কার্যক্রম চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ট্রাফিক বিভাগের একটি যুগান্তরকারী উদ্যোগ। সিএমপির ‘আইচ অব সিএমপি’ নামক এপসের একটি অংশ ‘আমার গাড়ি নিরাপদ’। এই কার্যক্রমের আওতায় নগরীর সকল বৈধ সিএনজি অটোরিকশা, তাদের মালিক ও চালকদের যাবতীয় তথ্যাদি ডাটা এন্ট্রি করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সংরক্ষিত তথ্য কিউআর কোড সম্বলিত স্টিকার আকারে গাড়িতে লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে যাত্রী গাড়িতে ফেলে যাওয়া মূল্যবান মালামাল, স্বর্ণালংকার, ডকুমেন্টস ফেরত পেতে শুরু করেছে। চুরি যাওয়া গাড়ি উদ্ধার এবং ছিনতাইকারী ও অপরাধী শনাক্ত হচ্ছে। মূল কাজের অংশ না হলেও যাত্রী সাধারণের উপকারে ট্রাফিক বিভাগের এই উদ্যোগ ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

 

এছাড়া নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, মোড় ও জনবহুল রাস্তায় বিভিন্ন নির্দেশনা সম্বলিত সাইন স্থাপন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করে যথাসম্ভব যানজটমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রোড ডাইভারশন দিয়ে যান চলাচল সচল রাখা হচ্ছে। মূল সড়কে হকার বসলে তা নিয়মিতভাবে উচ্ছেদ করছে। নিয়মিতভাবে পরিবহন মালিক, শ্রমিক, ড্রাইভার ও হেলপারদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি পথচারী ও যাত্রীদের মাঝে সচেতনতামূলক ট্রাফিক নির্দেশনা সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করে তাদের সচেতন করার চেষ্টা করছে ।

 

যানজটের ভোগান্তিতে নগরবাসীকে নাকাল হতে হয় তার কিছু কারণ আলোচনা করা দরকার। ট্রাফিকের কাজের ক্ষেত্রেও এসব সমানভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

 

অপ্রতুল ও অপ্রশস্ত অপরিকল্পিত সড়ক। গুরুত্বপূণ মোড়সমূহে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়নি উপরন্তু বেশিরভাগ সড়কের বেহাল দশা। সড়কের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যান চলাচল। সমন্বয়হীন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম শুরু করা। পথচারী পারাপারের জন্য নির্ধারিত স্থান/জেব্রা ক্রসিং চিহ্নিত নেই। যত্রতত্র পারাপারের কারণে যান চলাচলে গতি হারায়। গুরুত্বপূণ মোড় ও জংশনগুলোতে ফুটওভার ব্রিজ নেই। আটককৃত যানবাহন রাখার স্থায়ী কোন ডাম্পিং স্টেশন নেই। নগরীতে রেল ক্রসিংসমূহে আন্ডারপাস না থাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
নগরীর বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের নিজস্ব পার্কিং ব্যাবস্থা নেই। সিংহভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্কুল বাস সার্ভিস নেই। বিপণি বিতান, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ভবন সমূহের নিজস্ব অপ্রতুল পার্কিং ব্যবস্থা ও পার্কিং স্থান ভিন্ন কাজে ব্যবহার করার প্রবণতা। অপরিকল্পিত গোলচত্বর ও রোড ডিভাইডার স্থাপন। নির্ধারিত পার্কিং না থাকায় যত্রতত্র পার্কিং করার প্রবণতা। বেশিরভাগ ফুটপাত হকারের দখলে থাকায় পথচারীদের মূল সড়কে চলাচল। বন্দরের লং ও হেভি ভেহিকেলগুলোর কোন টার্মিনাল না থাকায় মূল সড়কে অবস্থান।

 

রিকশা, ভ্যান, থ্রি হুইলার, ছোট যানবাহন ও প্রাইভেট গাড়ির আধিক্য। গণ পরিবহনগুলোর মোড়ে দাঁড়ানোর প্রবণতা। চালকদের মাঝে যাত্রী ওঠানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। চালকদের আইন না মানার প্রবণতা। শহরে শিল্প কারখানার অবস্থান। দূরপাল্লার যানবাহনের স্থায়ী টার্মিনালের অভাব। অকেজো ট্রাফিক সিগন্যাল সিস্টেম। সর্বোপরি ট্রাফিক বিভাগের সীমিত জনবল ও অপ্রতুল লজিস্টিক সাপোর্ট।

 

নগরীর চিরাচরিত এ সমস্যা হতে আশু উত্তরণের উপায় জটিল। উত্তরণের উপায়কে দুইভাগে ভাগ করা যায়। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকার ও স্বল্পমেয়াদি প্রতিকার।

 

দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকার পেতে হলে সময়ের সাথে সাথে প্রয়োজনের নিরিখে পরিকল্পিত ট্রাফিক সহায়ক নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ করা। বিদ্যমান রাস্তা যথাসম্ভব প্রশস্ত করা। নগর পরিকল্পনায় ট্রাফিক বিভাগের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং যুগোপযোগী নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করা। শহরের প্রবেশমুখে স্থায়ী বাস ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করা। নগরীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান বাস টার্মিনালসমূহ ক্রমান্বয়ে নগরীর পাশের স্থানে সরিয়ে নেয়া। নগরীর অভ্যন্তরে যানবাহনের চাপ কমানোর জন্য বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা। নগরীতে মেট্রোরেল সার্ভিস চালুর ব্যবস্থা করা। বিদ্যমান রেল ক্রসিংসমূহে আন্ডারপাস চালু করা।

 

নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জংশন ও মোড়ে বহুমুখী ফুটওভার ব্রিজ চালু করা এবং এর শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা। নগরীর ট্রাফিক সিস্টেম পরিপূর্ণভাবে অটোমেশনের আওতায় নিয়ে এসে এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ট্রাফিক বিভাগের কাছে ন্যস্ত করা। বন্দর কেন্দ্রিক বিকল্প রাস্তার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল শিল্প কারখানাগুলো ক্রমান্বয়ে শহরের আশপাশে সরিয়ে নেয়া। আটককৃত যানবাহনগুলোর জন্য নগরীর আশপাশে ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা। ব্যক্তিগত যানবাহন নিরুৎসাহিত করে আরামদায়ক গণপরিবহন/সিটি সার্ভিস চালু করা। গুরুত্বপূর্ণ জংশনে প্রয়োজনে ইউলুপ তৈরি করা। বন্দর কেন্দ্রিক কন্টেইনার ডিপোগুলোকে শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া।

 

স্বল্পমেয়াদি প্রতিকার পেতে হলে গাড়ি দাঁড়ানোর স্থান নির্ধারণ করে দেয়া। জরুরি ভিত্তিতে পার্কিং স্থান নির্ধারণ করে তা অবিলম্বে চালু করা। ফুটপাত হতে সকল প্রকার হকার উচ্ছেদ করে তাদের জন্য হলিডে মার্কেট চালু করে ফুটপাতে পথচারীদের চলাচল বান্ধব করে দেয়া। ফুটপাতের নির্দিষ্ট উচ্চতা বজায় রাখা। ছোট নন মোটরাইজড গাড়ির জন্য পৃথক লেন চালু করা। পুরাতন লক্কর ঝক্কর ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি দ্রুত রাস্তা থেকে উঠিয়ে নেয়া। সকল প্রকার বাস কোম্পানির অধীনে কাউন্টার সার্ভিসে রুপান্তর করা। রাস্তার উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে ট্রাফিক বিভাগের সাথে সমন্বয় রেখে চলা। প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব পরিবহন সার্ভিস চালু করতে বাধ্য করা। মার্কেট, বিপণিবিতান, ক্লিনিক সমূহের নিজস্ব পার্কিং ব্যবহার করতে বাধ্য করা। সড়কে রোড সাইন ও জেব্রা ক্রসিং চালু করা। নগরীতে দিনের বেলায় ভারী যানবাহন প্রবেশ নিষিদ্ধ করা। লাইসেন্সবিহীন অথবা ভুয়া লাইসেন্সধারী চালকদের তাৎক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের মুখোমুখি করে শাস্তির ব্যাবস্থা করা। অবৈধ যানবাহন আটকের সাথে সাথে তা তাৎক্ষণিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া চালু করা। পরিবহন মালিক, চালক ও শ্রমিকদের বিআরটিএ কর্তৃক বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণের ব্যবস্থা করা

 

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রাফিক আওয়ারের সাথে সমন্বয় করে শিফটিং চালু অথবা সিডিউল নির্ধারণ করা।

পার্কিং এরিয়া নিশ্চিত করেই কেবল ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র দেয়া এবং এক্ষেত্রে ট্রাফিক বিভাগ হতে পার্কিং ছাড়পত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা। নগরীর নদীপথে ওয়াটার বাস সার্ভিস চালু করে বিকল্প যাতায়াতের পথ নিশ্চিত রাখা। রাস্তায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশদের জন্য প্রযোজ্য স্থানে আধুনিক টয়লেট সুবিধা সম্বলিত আধুনিক ট্রাফিক বক্স স্থাপন করা এবং ট্রাফিক সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

লেখক : উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) ও এডিশনাল ডিআইজি, সিএমপি, চট্টগ্রাম

শেয়ার করুন